আইএইচটির ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতাদের যত ‘কীর্তি’

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী ০০:৩২ , ডিসেম্বর ০৮ , ২০১৭

আইএইচটিতে ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা (ফাইল ছবি) ক্যাম্পাসে নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রীদের ওপর হামলা করে আলোচনায় এসেছে রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের অভিযোগ অনেকদিন ধরেই। আইএইচটির নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ছাত্রী জানান,ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত এই গ্রুপটি দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রীদের নানাভাবে হয়রানি করে আসছিল। তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করলে তারা রাস্তাঘাটে ওইসব ছাত্রীদের ধরে ধরে অপমান, মারধর, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে। এমনকি নেতাদের কেউ কেউ ছাত্রীদের হোস্টেলে তাদের রুমে গিয়ে ধর্ষণের হুমকিও দিয়েছে বলে জানান ছাত্রীরা।

হয়রানির শিকার ছাত্রীরা জানান, লাগাতার কয়েকদিন ধরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করছে। একারণেই তারা প্রতিবাদ করেন। বুধবার অধ্যক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে ছাত্রলীগের তুহিন ছাত্রীদের গণধর্ষণের হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তারা ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায়।

বেশ কয়েকজন ছাত্রী জানান, ছাত্রলীগ আইএইচটি শাখার সভাপতি জাহিদুল, সাধারণ সম্পাদক তুহিন, সাজু, আকাশ ও আজমের নেতৃত্বে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি,উত্ত্যক্ত ও হুমকি দিয়ে আসছিল। বুধবার তাদের নেতৃত্বেই এই হামলা হয়। ছাত্রীরা অভিযোগ করেন, ছাত্রলীগের সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক তুহিনের ছাত্রত্ব ২০১২ সালে শেষ হয়ে গেছে। এরপরও তারা ছাত্রলীগের কমিটিতে থেকে এই হামলা চালায়। ওই ছাত্রলীগ নেতারাই মাঝে মাঝে সাধারণ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতো। তারা শিক্ষকদেরও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতো। শিক্ষকদের সঙ্গে কোনও ছাত্রীর ভালো সম্পর্ক থাকলে সেই শিক্ষকের স্ত্রী হিসেবে ওই ছাত্রীকে ক্যাম্পাসে ঘোষণা দিতো। এতে করে ওই ছাত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ত। এভাবেই তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি করতো। এছাড়া তারা ছাত্রী হোস্টেলের ভেতরেও প্রবেশ করে গাছের ফল চুরি করে খেতো।

আইএইচটির কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সহ সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান, ফায়সাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন ছাড়াও কর্মী সাইদ হাসান, মাহমুদ হাসান, জাকির হোসেন, কাইউম, নাহিদসহ আরও কয়েজন নেতাকর্মীর দাপটে অতিষ্ঠ থাকতে হয় শিক্ষকদের। তারা পরীক্ষার হলে নকল করতো প্রকাশ্যে। বাধা দিতে গেলেই প্রভাব বিস্তার করতো। এমনকি ভাইভাতেও প্রভাব বিস্তার করতো। এভাবে শিক্ষকদের হয়রানি করতো। এদের সঙ্গে বহিরাগত কয়েকজন এসে ক্যাম্পাসে আড্ডা দেয় আর প্রভাব বিস্তার করে।

তবে এসব নিয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ আইএইচটির বহিষ্কৃত সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন তুহিন দুজনেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। ছাত্রলীগের আইএইচটি শাখার বহিষ্কৃত সভাপতি জাহিদুল ইসলাম জানান, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে হোস্টেল সুপারের মদদপুষ্ট গুটিকয়েক ছাত্রী যৌন হয়রানির যে অভিযোগ এনেছে তাও সম্পূর্ণ অসত্য ও মিথ্যা। কারণ, ছাত্রলীগ ওই ধরনের কাজ কখনও করতে পারে না। বরং হোস্টেল সুপার মোর্শেদা খাতুন ছাত্রীদের উস্কে দিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামিয়েছে। সাধারণ ছাত্রীরা এই বিষয়ে কিছুই জানে না।

আইএইচটিতে ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা (ফাইল ছবি) হোস্টেল সুপার কেন ছাত্রীদের ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নামাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কারণ হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষের কাছে আমরা অভিযোগ এনেছি। তার চাকরি নিয়ে টানাটানি। তিনি বিএসসি ল্যাব মেডিসিনে পড়া অবস্থায় হোস্টেল সুপারের দায়িত্ব পালন করছেন। যা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। এছাড়া তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তিনি ছাত্রীদের রাত ১০টা, কখনও কখনও রাত ১২টা পর্যন্ত হোস্টেলে ঢোকার অনুমতি দেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে হোস্টেলে ঢোকার নিয়ম থাকলেও হোস্টেল সুপারের ছত্রছায়ায় ছাত্রীরা রাত ১২টায় হোস্টেলে ঢুকতে পারে। এতে আইএইচটির পরিবেশ নোংরা হচ্ছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে এক ছাত্রীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতেরও ঘটনা আছে। এসময় তার চাকরিও চলে যায়। পরে টাকা ফেরত দিয়ে হোস্টেলের ছাত্রীদের হাত করে তিনি চাকরি ফিরে পান।’

এ ব্যাপারে আইএইচটির হোস্টেল সুপার মোর্শেদা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ইনস্টিটিউটের ল্যাব মেডিসিন বিভাগের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বেলালের সঙ্গে ওই বিভাগের এক ছাত্রীর পরকীয়ার সম্পর্ক। ওই শিক্ষক ছুটিতে গিয়েও তার কার্যালয়ে বসে থেকে ছাত্রীর সঙ্গে গল্প করেন। অথচ কোনও ক্লাস নেন না। ছাত্রলীগ এসবের প্রতিবাদ করলে ওই হোস্টেল সুপারের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে তার অনুসারী কিছু ছাত্রীর নেতৃত্বে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। এই ঘটনার পরই ক্যাম্পাসে এই পরিস্থিতি।’

রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) অধ্যক্ষ ডা. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে কী ঘটেছে সেটা বলতে পারবো না। আমার এখানে দায়িত্ব নেওয়ার একমাসও হয়নি, কোনকিছু বুঝে উঠার আগেই এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। আসলে হঠাৎ করেই ছাত্রীদের এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি, এটা অনেক দিনের ক্ষোভ ছিল। আগে থেকে বিষয়গুলো জানতে পারলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।’

অধ্যক্ষ বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইনস্টিটিউটের উদ্ভূত এই পরিস্থিতিকে নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ' নিরাপত্তাজনিত কারণে ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।'

উল্লেখ্য, বুধবার (৬ ডিসেম্বর) সকাল ১০টার দিকে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের কাছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে যান। সেখানে উভয়পক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে ছাত্রীদের ধাওয়া করে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের ধাওয়ায় আতঙ্কিত ছাত্রীরা নিজেদের হোস্টেলে ঢোকার সময় গেটের সামনে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন। এতে পাঁচ জন ছাত্রী আহত হন। এদের মধ্যে তিনজনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আইএইচটি হোস্টেল বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

 

/এসএসএ/এফএস/টিএন/

x