রাজধানীতে নাশকতাই ছিল জঙ্গিদের উদ্দেশ্য

বগুড়া প্রতিনিধি ০৮:২২ , ডিসেম্বর ০৮ , ২০১৭

জঙ্গি (প্রতীকী ছবি)বগুড়ায় গ্রেফতার চার জঙ্গির মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী ঢাকায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করায় পরিকল্পনা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার মো.আসাদুজ্জামান এই তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার চার জঙ্গি রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করায় সে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।’

তিনি আরও জানান, বৃহস্পতিবার জেএমবির চার জঙ্গির মধ্যে তিন জনকে আদালতে হাজির করে সাতদিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়। রিমান্ড শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুল ইসলামের আদালত তিন জনের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর আরও অনেক তথ্য জানা যাবে।

ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, গ্রেফতার চার জঙ্গির মধ্যে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া তিন জঙ্গিরা হলো- নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক প্রধান ও শুরা সদস্য বাবুল আকতার ওরফে বাবুল মাস্টার ওরফে মাস্টার, সক্রিয় সদস্য আলমগীর হোসেন ওরফে আরিফ এবং আফজাল হোসেন ওরফে লিমন।

অপর শুরা সদস্য দেলোয়ার হোসেন ওরফে মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমানকে কেন রিমান্ডে নেওয়া হলো না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তার ব্যাপারে আরও অনেক তথ্য আছে। যা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে। তাকে হাজতে পাঠানো হয়েছে।’

বুধবার (৬ ডিসেম্বর) রাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক শাখার প্রধান সুরা সদস্য বাবুল আকতার ওরফে বাবুল মাস্টারসহ (৪৫) চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 

বগুড়ায় গ্রেফতার চার জঙ্গির পরিকল্পনা

বগুড়ার পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান জানান, গ্রেফতার চার জঙ্গি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্ব প্রস্তুতি নিতে তারা ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকায় কোনও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার জন্য বুধবার রাত ১টার দিকে নব্য জেএমবির শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি বাবুল মাস্টার, মিস্ত্রি, আরিফ ও লিমন শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বাজারের কাছে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। গোপনে সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও বগুড়া জেলা পুলিশ যৌথভাবে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের চারজনকে গ্রেফতার করে।

বগুড়ার শেরপুরের জঙ্গি আস্তানায় যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হতো

দেলোয়ার হোসেন ওরফে মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমান সিএনজি চালক হিসেবে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামে পলি আক্তারের বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে ইউরো বিস্ফোরক জেল, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে এখানে মজুদ করা হতো। মিস্ত্রি নিজে হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম বগুড়া শহরের বিআরটিসি মার্কেটের বিভিন্ন দোকান থেকে সংগ্রহ করতো। পরবর্তীতে মিস্ত্রি, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার জোড়বাড়িয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের ছেলে জেএমবি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক শাখা প্রধান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাইসুল ইসলাম খান ওরফে নোমান ওরফে সকল ওরফে রাসেল ওরফে ফারদিন এবং সিরাজগঞ্জ সদরের জামুয়া গ্রামের মওলানা আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে কুষ্টিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম জুয়েলসহ হ্যান্ড গ্রেনেড তৈরি করে দেশের বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় সরবরাহ করতেন। পাশাপাশি জঙ্গি সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতেন। উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ এ জঙ্গি আস্তানায় নব্য জেএমবির প্রথম সারির নেতা তামিম চৌধুরী, মারজান, সাগর, রাজিব গান্ধী, বাবুল মাস্টার, রিপন ও কাওছার, ওসমান, মমিন ও রজবসহ অনেকে নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন। এই আস্তানা থেকেই ২০১৫-১৬ সালে উত্তরবঙ্গে সংগঠিত বিভিন্ন টার্গেট কিলিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার শিয়া মসজিদে হামলায় ব্যবহৃত একে-২২ রাইফেল ও বিদেশি পিস্তল শেরপুরের আস্তানা থেকে সরবরাহ করা হয়।



বগুড়ার শেরপুরের জঙ্গি আস্তানায় বিস্ফোরণের দিন যা ঘটেছিল

নব্য জেএমবির শুরা সদস্য দেলোয়ার হোসেন ওরফে মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমান বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামে পলি আক্তারের বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে জঙ্গি আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল মাগরিবের নামাজ শেষে জুয়েল ও ফারদিন গ্রেনেড তৈরির কাজ করছিলেন। একটি গ্রেনেড তৈরির পর কালো টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে জুয়েল তা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকেন। তখন দেলোয়ার মিস্ত্রি ও ফারদিনসহ কয়েকজন জঙ্গি ওই কক্ষে বসে গল্প করছিল। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে দেলোয়ার মিস্ত্রি মোমবাতি জ্বালানোর জন্য রুম থেকে বের হন। তখন বিকট শব্দে একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর মিস্ত্রি আহত জুয়েলকে টেনে অন্য রুমে নিয়ে যান। আর ফারদিন ওই রুমেই পড়েছিলেন। পরে দেলোয়ার মিস্ত্রি গ্রেনেড বিস্ফোরণে আহত ফারদিন ও জুয়েলকে ফেলে ব্যাগে একটি একে-২২ রাইফেল, একটি বিদেশি পিস্তল ও কিছু গোলাবারুদ নিয়ে দ্রুত পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় তিনি পার্শ্ববর্তী একটি আমবাগানে ব্যাগটি লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে শাজাহানপুরের জঙ্গি মোমিন ওই রাইফেল এবং কাওসার নামে এক জঙ্গি পিস্তলটি নিয়ে পালিয়ে যান। এছাড়া অন্য জঙ্গিরা যে যার মতো করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বগুড়ার শিবগঞ্জের শিয়া মসজিদে হামলার অন্যতম আসামি কাওসার ২০১৬ সালে বগুড়ায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে মারা যায়। এছাড়া মোমিন ওই অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছে। শিয়া মসজিদে হামলার সময় গুলিতে একজন নিহত এবং তিন জন গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

বাবুল মাস্টারের জঙ্গি জীবন

ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক প্রধান রাজিব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলম গ্রেফতারের পর বাবুল তার স্থলাভিষিক্ত হন। তার সাংগঠনিক নাম বাবুল মাস্টার। গত ২০০৩ সালে জেএমবিতে যোগদান এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলায় দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। বাবুল ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগদান করেন। সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ হওয়ায় ২০১৭ সালের প্রথমদিকে উত্তরবঙ্গ সামরিক প্রধান হওয়ার পর সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, হামলার টার্গেট নির্ধারণ, অর্থ সংগ্রহ এবং হিজরতকারীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের দায়িত্ব পান। চলতি বছরে মে মাসে নব্য জেএমবির শুরার সদস্য পদ লাভ করেন। ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের কাউনিয়ার খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলার অন্যতম চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিলেন। তিনি ২০১৬ সালের ২৫ মে গাইবাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ বাজারের জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিককে হত্যাকাণ্ডের সময় মোটরবাইকে অস্ত্র সরবরাহ করেন।

দেলোয়ার হোসেন ওরফে মিস্ত্রি ওরফে মিজানুর রহমানের জঙ্গি জীবন

মিস্ত্রির স্ত্রী, চার ভাই, ভাতিজা খায়রুল (বগুড়ায় ধৃত), ভাগ্নে মেহেদীসহ (পলাতক) পরিবারের অন্তত ১০ সদস্য নব্য জেএমবির সঙ্গে জড়িত। বড় ভাই ইউসুফ হাজী গত বছর বগুড়ায় গ্রেফতার হন। তিনি ২০০৫ সালে বড় ভাইয়ের (ইউসুফ হাজী) মাধ্যমে জেএমবিতে যোগদান করেন। ২০১২ সাল পর্যন্ত জেএমবির দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালন করেন। জঙ্গি তামিম চৌধুরীর পর ২০১৩ সালে নতুন জঙ্গি সংগঠন জুনুদ আত তাওহীদ আল খিলাফাহে যোগ দেন। ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগদান এবং বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলার দায়িত্বশীল হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেন। মিস্ত্রি ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর বাগমারায় আহম্মদীয়া মসজিদে দেশে প্রথম আত্মঘাতী হামলার প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন। ওই হামলায় অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন ওরফে নাঈম তার আপন ছোট ভাই। নাঈম ২০১৬ সালে রাজশাহীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হন। অপর ছোট ভাই মোয়াজ্জেম চলতি বছরের ১৬ নভেম্বর নওগাঁর আত্রাই থানায় জঙ্গি বিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের শেষের দিকে বগুড়ার শেরপুরের গাড়িদহ ইউনিয়নের জোয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামে উত্তরবঙ্গে নব্য জেএমবির সর্ববৃহৎ আস্তানা গড়ে তোলে।

আলমগীর হোসেন ওরফে আরিফ

আলমগীর ২০১৬ সালের মাঝামাঝি শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি নেতা সাগরের মাধ্যমে জেএমবিতে যোগ দেয় (হিজরত করেন)।

আফজাল হোসেন ওরফে লিমন

আফজাল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ব্যবসা করতো। ২০১৬ সালের প্রথমদিকে সে তার সকল সহায়-সম্বল বিক্রি করে জেএমবির কাজে ব্যয় করেন। শীর্ষ স্থানীয় জঙ্গি নেতা রাজিব গান্ধীর মাধ্যমে জেএমবিতে হিজরত করে সে।

উল্লেখ্য, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক শাখার প্রধান শুরা সদস্য বাবুল আকতার ওরফে বাবুল মাস্টারসহ (৪৫) চার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, ১৫ রাউন্ড গুলি, একটি ম্যাগাজিন, ৪টি বার্মিজ চাকু ও ১টি চাপাতি উদ্ধার করা হয়। বুধবার রাতে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বাজার এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার হওয়া অন্য সদস্যরা হলো- নব্য জেএমবির সুরা সদস্য দোলোয়ার হোসেন ওরফে মিস্ত্রি মিজান (৩৯), সক্রিয় সদস্য আলমগীর হোসেন ওরফে আরিফ (২৬) ও আফজাল হোসেন ওরফে লিমন (২৮)।

ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী রাজিব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীর আলম গ্রেফতারের পর বাবুল নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক শাখার দায়িত্ব পালন করছিল। তার সাংগঠনিক নাম বাবুল মাস্টার।

আরও পড়ুন-  নব্য জেএমবির উত্তরবঙ্গ সামরিক শাখার প্রধানসহ চার জন গ্রেফতার

 

 

/জেবি/এসএসএ/

x