রংপুরে বাসে বোমা হামলার তিন বছরেও শেষ হয়নি বিচার কাজ

লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর ১২:০৬ , জানুয়ারি ১৪ , ২০১৮

রংপুরে চলন্ত বাসে পেট্রোল বোমা হামলা (ফাইল ছবি)আজ ১৪ জানুয়ারি। রংপুরে এই দিনটি ‘রংপুর ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৫ সালের এই দিনে জেলার মিঠাপুকুরে যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা মেরে হত্যা করা হয় শিশুসহ ৬ বাস যাত্রীকে। দগ্ধ হয় অন্তত ২৫ জন যাত্রী। এই মর্মান্তিক ঘটনার ৩ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি। বরং আইনের মারপ্যাঁচে মামলার সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই মামলায় ১৩২ আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৬০ আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। যারাও গ্রেফতার হয়েছিলেন তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিহত করার নামে বিএনপি-জামায়াত জোট সারাদেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল তারই প্রথম ঘটনা ঘটে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বাতাসন এলাকায়। কুড়িগ্রামের উলিপুর থেকে ছেড়ে আসা খলিল পরিবহন নামে যাত্রীবাহী বাস ঢাকার উদ্দেশে রওনা করে। বাসটি রংপুরের বাতাসন এলাকায় আসলে ওঁৎ পেতে থাকা জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসীরা চলন্ত বাসে বেশ কয়েকটি পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে পুরো বাসের ভেতরে আগুন ধরে যায়। এসময় বাসের ভেতরে থাকা শিশুসহ ৬ যাত্রী দগ্ধ হয়ে নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ২৫ বাস যাত্রী।

গুরুতর আহত যাত্রীদের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তাদের অনেকেই এখন পঙ্গু।

এ্ ঘটনায় এসআই আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় ৮৭ জন জামায়াত শিবির নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে মিঠাপুকুর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে তদন্ত করে মিঠাপুকুর থানার ওসি (তদন্ত) নজরুল ইসলাম ১৩২ জনের নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। মামলাটির বিচার রংপুরের অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ আদালত-১ এ শুরু হয়।
ইতোমধ্যে ৬০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৪ জনের সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয়েছে। কিন্তু মামলাটি পুলিশের দায়িত্বহীনতার কারণে তদন্তে ত্রুটির সুযোগ নিয়ে আসামি পক্ষ হাইকোর্টে আবেদন করলে মামলাটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে মামলাটি হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৩২ জন আসামির মধ্যে ৬০ জন আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

এ ব্যাপারে মিঠাপুকুর থানার ওসি মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,‘আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।’

৩ বছর পার হলেও কেন মামলার প্রধান আসামি জামায়াতের মিঠাপুকুর উপজেলা সেক্রেটারি এনামুল হকসহ ৬০ পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করা যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘পলাতক সব আসামিকে গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে।’

এ ব্যাপারে সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের মধ্যে অতিরিক্ত পিপি আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মামলাটির বিচার শেষ পর্যায়ে এসে গেছে। কিন্তু আসামি পক্ষ হাইকোর্টে মামলাটি কোয়াশম্যান্ট করার জন্য আবেদন করায় মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।’ তবে শিগগিরই হাইকোর্টে শুনানি শেষ হলে বিচার কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অপরদিকে সরকার পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী প্রধান আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল মালেক বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ৮৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করে মিঠাপুকুর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দায়ের করে।  পরবর্তীকালে তদন্তের সময় আরও অনেকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়ায় ওই ৮৭ জন আসামিসহ ১৩২ জনের নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘মামলাটির তদন্তে ত্রুটি থাকায় সুযোগ নিয়েছে আসামি পক্ষ। তারা হাইকোর্টে মামলাটি খারিজ করার আবেদন জানালে আদালতের নির্দেশে মামলার কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত রয়েছে।’ তবে মামলাটির বিচার কাজ যেহেতু শেষপর্যায়ে সে কারণে দ্রুত হাইকোর্টে শুনানি শেষ হলে বিচার শেষ হতে সময় লাগবে না বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে মামলা পরিচালনার সঙ্গে থাকা সরকার পক্ষের একাধিক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশ নিজেরা বাদী হয়ে জোড়াতালি দিয়ে মামলার এজাহার আর চার্জশিট দিয়েছে। মামলাটিতে তদন্তে ত্রুটি রয়েছে। শুধু তাই নয় এই মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর মামলার বাদী পুলিশ কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ১০ আসামির নামই বলতে পারেননি। অথচ মামলার এজাহার দায়ের করার সময় তিনি ৮৭ জনের নাম উল্লেখ করেই মামলা দায়ের করেছিলেন। বাদী যদি আসামিদের নাম সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলতে না পারেন তাহলে মামলাটির ভবিষ্যৎ কী হবে তা সহজেই বোঝা যায়।

তারা আরও বলেন, মামলার যিনি চার্জশিট দাখিল করেছেন সেই পুলিশ কর্মকর্তা তৎকালীন মিঠাপুকুর থানার ওসি তদন্ত নজরুল ইসলাম ১৩২ জনেরর নাম উল্লেখ করে চার্জশিট দাখিল করলেও কোনও রকমে জোড়াতালি দিয়ে আদালতে দাখিল করেছেন। তাছাড়া চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্তের সময় যেসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সুপারভিশন করেছেন তারাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। বরং এই মামলা নিয়ে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ মিঠাপুকুরের মানুষের মুখে মুখে।


মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা মেরে ৬ যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করার পরেও মামলাটির যদি বিচার না হয়, আইনের মারপ্যাঁচে আটকে যায় তাহলে এ দায় কার?’
অপরদিকে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষারকান্তি মণ্ডল বলেন, ‘এই মামলায় আসামিদের বিচার না হলে এর দায়ভার কে নেবে?’ তিনি দ্রুত মামলাটি বিচার শেষ হবে বলে দাবি জানান।

/এআর/

x