মৌলভীবাজারে চলছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা

সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার ১২:২৮ , জানুয়ারি ১৪ , ২০১৮

মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলামৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা জমে ওঠেছে। প্রায় ২০০ বছর আগে জেলার মনুমুখে শুরু হয় এই মেলা। তবে গত ৮০ বছর ধরে এটি শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীর জুড়ে বসছে। মেলাটি এখন সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। মূল মেলার আগে ও পরে সময় বাড়িয়ে এটিকে তিন দিনের আয়োজনে রূপ দেওয়া হয়েছে।

মাছের মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি অলিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাছ, আসবাবপত্র, খেলনা, মিষ্টি ও অন্যান্য খাবার-দাবারের আয়োজন মিলে তিনদিনের এই মেলায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার বেচাকেনা হবে।’মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা

ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের শেরপুর-মৌলভীবাজার সড়কের পাশে এই মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলা উপলক্ষে আশেপাশের গ্রাম উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এই মেলা আজ রবিবার (১৪ জানুয়ারি) পর্যন্ত চলবে। মাছের মেলায় বাঘাইড়, আইড়, বোয়াল, বাউশ, কালি বাউশ, পাবদা, গুলসা, গলদা চিংড়ি ইত্যাদি মাছ স্থান পেয়েছে। এবছর প্রায় ৫০ জন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী মাছ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছেন।

জানা গেছে, মেলার প্রথমদিন শুক্রবার রাতে একটি বাঘাইড় মাছ ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। শেরপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী মানিক মিয়া সিরাজগঞ্জ থেকে ৪০ কেজি ওজনের এই মাছটি কিনে এনে বিক্রি করেছেন।মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা

আগে এই মাছের মেলায় স্থানীয় বিভিন্ন হাওর-বাওরের, নদ-নদীর মাছ নিয়ে আসতেন জেলেরা। এখন মৎস্য খামারগুলোর মাছও আসে। আসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীদের বিরাট বিরাট চালান। মাছের মেলায় পাঁচ হাজার টাকা মূল্যের কমে চাহিদার মাছ কেনা যায় না। কারণ মাছের মেলা বলে কথা। বড় ব্যবসায়ীরা সপ্তাহখানেক আগেই বড় বড় মাছ সংগ্রহ করতে থাকেন। সেই অনুযায়ী মাছের দাম হাঁকা হয়।

মাছের মেলায় আসা ক্রেতা মুজাহিদ খান বলেন, ‘মেলায় বড় বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উঠেছে। মাছের দাম এ বছর কিছুটা কম থাকায় আমি ৪০ হাজার টাকায় দুটি বোয়াল মাছ কিনেছি।’মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা

মাছ ক্রেতা সৈয়দ তানভির হোসাইন ও জুবায়ের আহমদ জানান, হাওর ও নদী থেকে আসা তরতাজা মাছ কিনতে প্রতি বছর মাছের মেলায় আসেন তারা।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মাছ বিক্রেতা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘যমুনা নদী থেকে ধরা বাঘাইড়, বোয়াল মাছ ও আইড় মাছ মিলে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মাছ মেলায় নিয়ে এসেছি। মেলার প্রথম দিন রাতে ১০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছি।’

মাছ বিক্রেতা মো. ইমরান মিয়া বলেন, ‘হাওর ও নদীতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠা মাছ সাধারণত এই মেলায় নিয়ে আসি। মেলা উপলক্ষে মাছের চাহিদাও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ বছর টানা বৃষ্টিতে হাওর ও নদীতে মাছের উৎপাদন বেড়েছে। এতে কম দামে বিল থেকে মাছ সংগ্রহ করায় ক্রেতাদের মাঝেও কমদামে বিক্রি করতে পারছি।’মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা

মেলার আয়োজক সূত্র জানায়, এই মেলাটি প্রথম অনুষ্ঠিত হতো সদর উপজেলার মনু নদীর মনুমুখ এলাকায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এখন হয় শেরপুরে। মেলাস্থল শেরপুর হলো মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার একেবারে শেষ প্রান্তে। পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলা, উত্তরে কুশিয়ারা নদী। নদী পেরোলেই সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলা শুরু। হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার এই তিনটি জেলার মাঝখানে শেরপুর।

মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা এটি। এটি যদিও মাছের মেলা নামে পরিচিত। তবে মাছ ছাড়াও বিভিন্ন পসরার কয়েক হাজার দোকান বসে। মেলায় এখন মাছ ছাড়াও ফার্নিচার, গৃহস্থালী সামগ্রী, খেলনা, নানা জাতের দেশীয় খাবারের দোকানসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দোকান স্থান পায়। এছাড়া শিশুসহ সব শ্রেণির মানুষকে মাতিয়ে তোলার জন্য রয়েছে বায়োস্কোপ ও চরকি খেলা।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মো. মোতালিব মিয়াসহ অনেকেই মেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকে এই মাছের মেলা দেখে আসছি। তবে কিভাবে মেলা শুরু হয়েছিল কেউই তার সঠিক ইতিহাস জানে না।’মৌলভীবাজারের শেরপুরে মাছের মেলা

সিলেটের কুশিয়ারা নদী, সুরমা নদী, মনু নদী, হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, কাওয়াদিঘি হাওর, হাইল হাওরসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা বাঘাইড়, রুই, কাতলা, বোয়াল, গজার, আইড়সহ বিশাল বিশাল মাছ নিয়ে আসেন। মূলত এই মেলা অগ্রহায়ণের ধান কাটা শেষে পৌষ সংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসবে আয়োজন করা হতো। গৃহস্থ পরিবারের লোকজন নতুন বিরইন চালের পিঠার সঙ্গে ভাজা মাছ দিয়ে নিজে খেতো এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়ন করা হতো। তারপর প্রায় ৮০ বছর আগে মেলাটি জায়গা স্থানান্তর হয়ে শেরপুর এলাকায় চলে আসে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেলাটি স্থানীয়দের সার্বজনীন উৎসবে রুপ নেয়। সব ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ এই মেলাকে ঘিরে উৎসবে আনন্দে মেতে ওঠে। এছাড়া মেলা উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরাও দেশে এসে থাকেন। সৌখিন ক্রেতারা মেলায় এসে বড় বড় বাঘাইড়, বোয়াল, আইড়, বাউশ ও দেশি বিলুপ্তপ্রায় মাছ কিনে থাকেন।

মেলায় আসা রূপসী বাংলা মাছের দোকানের মালিক নছির আহমদ বলেন, শনিবার ভোরবেলা তিনি একটি বিশাল বাঘাইড় মাছ একজন প্রবাসীর কাছে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এছাড়া তিনি বোয়াল ও আইড় এই দুটি মাছ ২০ হাজার ও ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আলম খান বলেন, 'শেরপুরের মেলায় এবার জুয়া ও অশ্লীলনৃত্য চলবে না। গতবছরও জুয়া ও যাত্রার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। মেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।'

 

/এফএস/

x