এত কাছে লুকিয়ে ছিল ‘জঙ্গিরা’ জানতেন না স্থানীয়রা

কামাল মৃধা, নাটোর ২২:০৫ , মার্চ ১৩ , ২০১৮

পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান (ছবি- প্রতিনিধি)

নাটোর সদর উপজেলা থেকে আটক হওয়া চার ‘জঙ্গি’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। উপজেলার দিঘাপতিয়া এলাকার উত্তরা গণভবনের পাশের একটি ভাড়াবাড়িতে থেকে আটককৃত চার জনের লুকিয়ে ‘জঙ্গিবাদী কার্যক্রম’ চালানো প্রসঙ্গে স্থানীয়দের ভাষ্য, পাশের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকলেও রাস্তাঘাট বা বাজারে খুব একটা তাদের (‘জঙ্গি’) দেখা যেতো না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উত্তরা গণভবনের পাশ দিয়ে চলে গেছে ফিডার রোড। এ রোডের উত্তর-দক্ষিণ অংশে ‘জঙ্গি আস্তানা’টির অবস্থান। ফিডার রোডটি কিছুটা সরু। এ রাস্তা স্থানীয় চকফুলবাড়ি রোড হয়ে নাটোরের মিনি কক্সবাজার এলাকার পাশ দিয়ে নলডাঙ্গা উপজেলায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে প্রায় সবসময়ই আশেপাশের ১০ গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করে যানবাহনও।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ‘জঙ্গি আস্তানা’টির পূর্ব দিকে বড় পুকুর রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণে রয়েছে ফাঁকা জায়গা। অবস্থানগত দিক থেকে বাড়িটি ‘জঙ্গিদের’ জন্য নিরাপদই ছিল। বাড়িটিতে প্রবেশের দু’টি গেট রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তর দিকের গেটটি সবসময়ই বন্ধ থাকে। এটি প্রাচীরঘেরা বাড়িটির প্রধান গেট, যা বেশ প্রশস্ত। তবে এই গেটটিই সবসময় তালাবদ্ধ থাকে। আস্তানার ৫০ গজের মধ্যেই রয়েছে একটি মুদি দোকান। এই দোকান থেকেই স্থানীয়রা নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য কেনেন।

পুলিশের জঙ্গিবিরোধী অভিযান (ছবি- প্রতিনিধি)

ওই দোকানের মালিক মকছেদ আলী জানান, বাড়িটিতে কিছু দিন পর পরই নতুন নতুন ভাড়াটিয়া আসে। এর আগে যত ভাড়াটিয়া এসেছিল, প্রায় সবাই তার দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনতো। কিন্তু আটক হওয়া চার জন তার দোকান থেকে কোনও কিছু কিনতো না। মকছেদ আলী বলেন, ‘দোকান থেকে জিনিস কিনবে কি, ওরা তো দোকানেই আসতো না।’ বাড়িটিতে কয়জন মানুষ ভাড়া থাকতো, আজকের আগে তাও জানতেন না বলে জানান মকছেদ আলী।

এক প্রশ্নের জবাবে মকছেদ ও তার স্ত্রী জানান, রাতে বাড়িটিতে একটি বাল্ব জ্বলতে দেখা যেতো। তবে ভেতরে কয়জন আছে বা তারা কী কাজ করছে, তা আন্দাজ করা যেতো না।’

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মকছেদ দাবি করেন, ‘প্রায় একমাস আগে এক বিকালে আমি ওই বাড়ি থেকে ২৫-২৬ বছর বয়সী এক ছেলেকে বের হতে দেখেছি। ওই রাতেই আবার আমি বাড়িটির ভেতরে ছেলেটিকে ঢুকতে দেখেছি।’

জঙ্গি সন্দেহে আটক আরও একজন (ছবি- প্রতিনিধি)

মকছেদ ও তার স্ত্রী জানান, সোমবার রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ আস্তানাটি ঘিরে ফেলে। ওই আস্তানা থেকে বাড়ি কাছে হওয়ায় মানুষের কথার শব্দে মকছেদ ও তার স্ত্রী বাইরে বের হয়ে আসেন। ওই সময় পুলিশ তাদের বাড়ির ভেতর চলে যেতে বলে। এরপর তারা ভোর রাতের দিকে প্রায় ৮-৯টি গুলির শব্দ শুনতে পান। শেষমেশ সকালে চার জনকে আটকের খবর পান।

‘জঙ্গি আস্তানা’ থেকে খানিকটা দূরে থাকেন আলী ড্রাইভার। তিনি জানান, বাড়িটির মূল মালিক ইকবাল সিকদার প্রবাসে থাকেন। বাড়িটি দেখাশোনা করেন ইকবালের চাচাতো ভাই রফিকুল সিকদার। দুই থেকে তিন মাস পর পর ওই বাড়িতে নতুন ভাড়াটিয়া দেখা যায়। তবে সর্বশেষ কারা ভাড়া থাকতো তা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, ‘আগে যারা ভাড়া থাকতো তাদের রাস্তাঘাট বা দোকানে দেখেছি। কিন্তু এবার যারা ছিল, তাদের কখনও দেখিনি।’

অভিযানের পর পুলিশের পিছু নিয়ে বাড়িটিতে ঢুকেছিলেন বলে দাবি করেন সেলিম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘আসামিদের আটকের পর আমি পুলিশের পেছনে পেছনে বাড়িটির মধ্যে গিয়েছিলাম।’

এক প্রশ্নের জবাবে সেলিম জানান, বাড়ির ভেতরে ৪টি কক্ষ ও একটি রান্নাঘর আছে। রান্নাঘরে রান্নার কিছু সামগ্রী দেখা গেছে। বাড়ির ভেতরের পশ্চিম দিকের রুমে একটি মশারি টাঙানো ছিল। আর উত্তরের দিকের কক্ষে অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যগুলো যত্রতত্র পরে থাকতে দেখা গেছে।’

জঙ্গি সন্দেহে আটককৃতদের একজন (ছবি- প্রতিনিধি)

অভিযানের পর পরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ি দেখভালের দায়িত্বে থাকা রফিকুল সিকদারকে আটক করেছে পুলিশ। রফিক সিকদারেরর ছোট ভাই সাইফুল সিকদার দাবি করেন, ‘বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন আমির হামজা নামে এক ছাত্র। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় আমির হামজা জানায়, তার বাড়ি নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা চাঁদপুর গ্রামে। সে স্থানীয় এমকে কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। স্কাউটের সঙ্গেও যুক্ত। কয়েকদিন আগে হঠাৎ তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি মাইক্রোবাসে কয়েকজন মানুষ এসে পুলিশ পরিচয় দিয়ে হামজাকে নিয়ে যায়। এরপরই হামজার সঙ্গী অন্যান্যদের বাড়ি থেকে চলে যেতে বলে বাড়িটি তালা দেন রফিকুল সিকদার।’

সাইফুল সিকদার আরও বলেন, ‘সোমবার সন্ধ্যার দিকে হামজার সঙ্গীরা এসে তাদের জিনিসপত্র নিয়ে যাবে বললে রফিকুল তাদের একজনের হাতে চাবি দেন। এরপর রাতেই ওই চার জনকে জঙ্গি সন্দেহে আটক করে পুলিশ।’

এক প্রশ্নের জবাবে সাইফুল দাবি করেন, ‘রফিকুল বা আমার পরিবারের অন্য কোনও সদস্য ভাবতেও পারেননি, ভাড়াটিয়ারা জঙ্গি। বিষয়টি জানার পর আমরা যতটা না অবাক হয়েছি, ভয় পেয়েছি তারচেয়ে বেশি।’

সদর থানার ওসি মশিউর রহমান জানান, ‘জঙ্গি’ আটকের ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। আর রফিকুল সিকদারকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

রফিকুল সিকদারকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তার আরেক ভাই আতিক শিকদার।

আজ (মঙ্গলবার) ভোররাতের দিকে উত্তরা গণভবনের পাশের একটি ভাড়াবাড়ি ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে ঘিরে রাখে পুলিশ। পরে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ জঙ্গিকে আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলো– সিংড়া উপজেলার আরকান্দি পশ্চিমপাড়া গ্রামের ইউনুস আলী মিয়ার ছেলে আনিছুর রহমান আনিছ (৪০), বাগাতিপাড়া উপজেলার চাপাপুকুর গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪২), একই গ্রামের উত্তরপাড়ার মৃত ভিকু মণ্ডলের ছেলে ফজলুর রহমান ফজলু (৩৮) এবং নলডাঙ্গা উপজেলার খোলাবাড়িয়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের ফোজলার রহমানের ছেলে জাকির হোসেন ওরফে জাকির মাস্টার(৩৮)।

 

/এমএ/

x