ফাঁসির দণ্ড পাওয়া জাহিদ ও শিবলুর উত্থান একরামের ছত্রছায়ায়

ফেনী প্রতিনিধি ০২:৩৮ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

কমিশনার আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু ও আ.লীগ নেতা জাহিদ চৌধুরী ফেনীর আলোচিত একরাম হত্যাকাণ্ডের রায়ে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ চৌধুরী ও কমিশনার আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু। একরামের হাত ধরেই তাদের উত্থান হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মঙ্গলবার রায়ের পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বাংলা ট্রিবিউনের কাছে এই অভিযোগ করেন। একরামুল হক একরাম ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জয়নাল হাজারীর নির্দেশে জাহিদ চৌধুরী ও শিবলুকে দিয়ে যুবলীগ নেতা বসিরকে খুন করান একরামুল হক একরাম। বসির হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই তাদের নাম আলোচনায় আসে। ২০১৪ সালে একরামকে যে জায়গায় পুড়িয়ে মারা হয়, একই জায়গায় তার আগে বসিরকেও খুন করা হয়। ওই ঘটনায় এখন পর্যন্ত বসিরের পরিবার মামলাও করতে পারেনি।

ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হাজারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একরামের হাত ধরে কমিশনার আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু ও বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ওরফে মিনার চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় জাহিদ চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরীর উত্থান। তবে জাহিদ চৌধুরীর সঙ্গে একরামের দ্বন্দ্ব শুরু হয় ফুলগাজী উপজেলার বিভিন্ন কাজের ঠিকাদারি নিয়ে। এলজিইডিসহ অন্যান্য কাজগুলোর পুরো নিয়ন্ত্রণ একরামের হাতে থাকায় জিহাদের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে।’

অভিযোগ রয়েছে, একরামের আশীর্বাদে প্রথমবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হন আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলু ও রতন। পরে ভিপি জয়নাল বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে রতনের মৃত্যু হলে ফেনী রেলক্রসিং থেকে শুরু করে বিরিঞ্চি মাস্টারপাড়াসহ পুরো পৌর এলাকার অপরাধের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় শিবলুর হাতে। এসব এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ যাবতীয় অপরাধের নিয়ন্ত্রক ছিল শিবলু।

বসির হত্যাকাণ্ডের পর শিবলুর বিরুদ্ধে উঠে আসে ১৯৯৯ সালে সংঘটিত দুইটি হত্যাকাণ্ডের দায়। বিএনপির নূর নবী ও বাবলু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শিপলু সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ভাত খাওয়া অবস্থায় বাবলুকে গুলি করে হত্যা করে শিবলু—এমন অভিযোগ স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল নেতাদের।

এছাড়া বিরিঞ্চি ও ফেনী পলিটেকনিক্যাল কলেজের রাজনৈতিক সব সংঘর্ষে শিবলুর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

শিবলুর উত্থান প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘১৯৯৭ কি ১৯৯৮ সালে শিবলু প্রথমবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এলে শিবলু নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের আমলে শিবলু ঢাকায় অবস্থান নেয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শিবলু ফেনীতে ফেরে। দ্বিতীয়বারের মতো পৌর নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তখনকার কাউন্সিলর বিএনপির বাবুল। নির্বাচন থেকে সরে যেতে বাবুলকে হুমকি দেওয়ার পরও কাজ না হওয়ায় শিবলু বাবুলের ছেলেকে অপহরণ করে। পরে নির্বাচনে বসে যাওয়ার শর্তে বাবুলের ছেলেকে ছেড়ে দেয়। দ্বিতীয়বার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার পর শিবলু নিজাম হাজারীর কাছের মানুষে পরিণত হতে থাকে এবং একরামের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে।’

একরাম-শিবলু-জাহিদ চৌধুরীর সাজা নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এ প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করেননি।

অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে খুনিদের কাছে, যারা অপরাজনীতি করে তাদের কাছে রাষ্ট্র এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, খুনিরা খুন করে রেহাই পাবে না।’ 

প্রসঙ্গত, ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যা মামলায় মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) বিকাল সোয়া ৩টার দিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আমিনুল হক এই রায় দেন। রায়ে প্রধান আসামি জেলা তাঁতীদলের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী মিনারসহ ১৬ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। আসামিদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সহকারী সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর মো. আদেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হোসেন চৌধুরী ওরফে জিহাদ চৌধুরী, ফেনী পৌরসভার তৎকালীন ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল্লাহ হিল মাহমুদ শিবলুসহ ৩৯ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।

২০১৪ সালের ২০ মে ফেনী শহরের একাডেমি এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হককে কুপিয়ে ও গুলি করে গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

আরও পড়ুন-
একরাম হত্যা মামলায় ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড
একরাম হত্যা মামলার ২০ আসামিই পলাতক
যে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছিল একরামকে
একরাম হত্যা মামলা: প্রধান আসামি মিনার খালাস, ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড

 

/এনআই/চেক-এমওএফ/

x