বিপদ পিছু ছাড়ছে না সুন্দরবনের!

আবুল হাসান, মোংলা ১৩:২৮ , এপ্রিল ১৭ , ২০১৮

সুন্দরবনে কার্গোডুবিবিপন যেন পিছু ছাড়ছে না সুন্দরবনের। নিয়মিত বিরতিতে সুন্দরবন সংলগ্ন নদীতে তেল, কয়লা, সিমেন্টের ক্লিংকারবাহী কার্গো জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে বনের ওপর। মানুষকে রক্ষা করছে যে বন, সেই মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনায় হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবন। এজন্য মানুষের অসচেতনতা ও বন বিভাগের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সুন্দরবন রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান দিলিপ কুমার দত্ত এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু মানব সৃষ্ট দুর্যোগ ঠেকাতে হবে। মানব সৃষ্ট বিপদ সুন্দরবনের পিছু ছাড়ছে না।’

সুন্দরবনে কার্গোডুবি

তিনি বলেন, ‘শর্তসাপেক্ষে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তারা সে শর্ত মানছে না। ফিটনেসবিহীন জাহাজ অহরহ চলছে। এ নিয়ে উৎকণ্ঠা রয়েছে। এরই মধ্যে রবিবার (১৫ এপ্রিল) আবারও সুন্দরবনের কাছে হারবারিয়া এলাকায় কয়লাবাহী কার্গো জাহাজডুবির ঘটনা ঘটলো।’ 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কয়লার ক্ষতি প্রাথমিকভাবে চোখে ধরা পড়ছে না। তবে কয়লার সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন প্রভৃতি সুন্দরবনের পানি, জীব ও পরিবেশকে দূষিত করবে। যার ফলে নদীতে মাছের বংশবিস্তারে সমস্যা হবে। দূষিত পানি ব্যবহার করে স্থানীয়দের নানা ধরনের রোগ হতে পারে।’ 

কয়লামোংলা বন্দরের হারবার সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি এক হাজার মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই লাইটারেজ জাহাজ এমভি আইচগাতি ডুবে যায়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ শ্যালা নদীর ধানসাগর এলাকায় এক হাজার ২৩৫ টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় কার্গো জাহাজ এমভি জাবালে নূর, ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর ৫১০ মেট্রিক টন  কয়লা নিয়ে পশুর নদীর চিলা এলাকায় খাদ্য গুদামের (সাইলো) কাছে ডুবে যায় কার্গো জাহাজ এমভি জিয়ারাজ। একই বছর পশুর নদীর হারবারিয়া এলাকায় সিমেন্ট  তৈরির কাঁচামাল জিপসাম নিয়ে ডুবে গিয়েছিল এমভি সি হর্স।

বড় বিপর্যয় ঘটে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বরে। এদিন চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যায়। এতে তেল ধীরে ধীরে সুন্দরবনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। এতে বনের জীববৈচিত্র্য ও মাছের উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

সুন্দরবনে কার্গোডুবিমোংলা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আল আমিন সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করেন। তার মতো শ’দুয়েক জেলে পরিবার তিন দশকের বেশি সময় ধরে সুন্দরবন এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা চালাচ্ছেন। ৪ বছর আগেও প্রতি গোনে (আমাবস্যা-পূর্ণিমা মৌসুম) ১৫ হাজার মাছ ধরা পড়তো তাদের জালে। ২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির পর তিন থেকে চার হাজারের বেশি মাছ পাচ্ছেন না তারা।

জাহাজডুবির ঘটনার পর সরকার ও বন বিভাগ সুন্দরবনের ক্ষতির আশঙ্কায় মামলা এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না।

২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকার থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ে

গত বছরের ২৭ অক্টোবর এম ভি জিয়ারাজ নামে কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজটি সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের পশুর নদীতে ডুবে যায়।

এ ব্যাপরে চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক শাহিন কবির জানান, ৫ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কায় সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ কার্গো মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মোংলা থানায় একটি মামলা করা হয়। এছাড়া বন বিভাগ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

২০১৪ সালে শ্যালা নদীতে ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকার থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ে

পশুর নদী ‘ওয়াটারকিপার’ নুর আলম শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুন্দরবনে একের পর এক জাহাজডুবির ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। বনের ভেতর দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলার কথা না। তারপরও তেলের ট্যাংকারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল করছে।’

প্রসঙ্গত, ১৫ এপ্রিল মোংলা বন্দর থেকে ১০ নটিক্যাল মাইল দূরে হারবারিয়া এলাকায় এমভি বিলাস নামে কয়লাবাহী একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। কার্গোটি একটি বিদেশি জাহাজ থেকে কয়লা খালাস করে চরে আটকে গেলে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। 

 

আরও পড়ুন:

পশুর নদীতে কার্গোডুবি: পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

 

ডুবে যাওয়া কার্গো উদ্ধারে আসছে দুই উদ্ধারকারী জাহাজ, পানির নমুনা সংগ্রহ
 মোংলার পশুর নদীতে কার্গো ডুবির ঘটনায় দুটি জিডি

/এসটি/চেক-এমওএফ/

x