এইচএসসিতে নকলের সুযোগ দিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ

মাদারীপুর প্রতিনিধি ১৬:০৪ , জুলাই ১২ , ২০১৮

শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজমাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সরকারি শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজের ছাত্রীদের কাছ থেকে পরীক্ষায় নকল করার সুযোগ করে দিয়ে  টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই কাজে কলেজের অধ্যক্ষ জাকিয়া সুলতানার স্বামী এবং কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বাবুল এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ফখরুল আলম  জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।  এক চিঠিতে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, কালকিনির ডাসারে সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারি শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ওই কলেজের ছাত্রীনিবাসে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী থাকেন। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন ১ ফেব্রুয়ারির আগের রাতে নকল সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার কথা বলে ছাত্রীনিবাসে অবস্থানরত ছাত্রীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৭০০ টাকা করে আদায় করা হয়। পরে ইংরেজি পরীক্ষা, পদার্থ ও রসায়ন প্রতিটি পরীক্ষার আগের রাতে আরও ১ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়।  এছাড়াও ব্যবহারিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার ৬শ’ টাকা করে আদায় করা হয়। টাকা না দিলে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়-ভীতি দেখানো হয়। এসব অনৈতিক কাজের নেতৃত্বে ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ জাকিয়া সুলতানার স্বামী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বাবুল এবং ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ফখরুল আলম। তাদের সঙ্গে কলেজের চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী লিয়া, মিতু, আজরিন, সুমাইয়া, সাইকা, সুরভীসহ আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী জানান,  কলেজের ডাইনিংয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বিনা রশিদে প্রতিমাসে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা করে আদায় করেন ছাত্রীনিবাসের দায়িত্বরত শিক্ষিকা মার্জিয়া আক্তার। এমনকি ডাইনিংয়ের টাকা থেকেই কলেজের যাবতীয় আপ্যায়ন খরচের ব্যয়ও মেটানোর অভিযোগ উঠেছে। ডাইনিংয়ের টাকা থেকে আপ্যায়ন খরচ মেটানোর ফলে হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীর আলাদা আর্থিক চাপ ও নিম্নমানের খাবার সরবরাহ হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর পরীক্ষার আগে নকল সরবরাহ, পরীক্ষার হলে সবাইকে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে দেওয়া এবং হলে নকলের সুযোগ করে দেওয়ার সুযোগ দিয়ে জনপ্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা আদায় করা হতো। এসব কারণে আগেও সমালোচনার মুখে পড়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। জেলা ও উপজেলা সদর থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে পরীক্ষার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব ছিল না। এই সুযোগে প্রতি বছরই অবৈধ উপায়ে শতভাগ পাসের সুযোগ গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি বছর ৪শ’ থেকে ৬শ’ ছাত্রীর কাছ থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আদায় করে এর একটি অংশ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের দিয়ে তাদের সবার মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।  

অভিভাবকরা জানান, কলেজের অনৈতিক কাজের প্রতিবাদ করায় ইতোপূর্বে একাধিক শিক্ষক তাদের হাতে হেনস্তার শিকার হন। তবে চাকরির স্বার্থে তাদের কেউ নাম প্রকাশ করতে রাজী হননি। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তাদের শতভাগ পাসের সাফল্য দেখিয়ে ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ২০১৫ সালে সরকারিকরণে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করে।

সম্প্রতি দোলোয়ার হোসেন নাম স্বাক্ষরিত একজনের চিঠির মাধ্যমে শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে পারে জেলা প্রশাসন।   একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখার সহকারী কমিশনার হোসনে আরা তান্নি’র অফিসিয়াল নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবিদুর রহমান ইতোমধ্যেই একাধিকবার তদন্ত করেছেন। এই সময় কলেজের পুরনো ছাত্রীদের তালিকা ও মোবাইল নম্বর নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এছাড়া যেসব শিক্ষক ও ছাত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের বক্তব্যও শুনেছেন। তবে জেলা প্রশাসনকে এই তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করতে ও কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য একাধিক প্রভাবশালীমহলের পক্ষ থেকে চাপ প্রয়োগেরও কথাও জানা গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ জাকিয়া সুলতানা বলেন, টকলেজে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদেরসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাকে তদন্তের বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।’

কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, ‘বিষয়টি গভীরভাবে আমলে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট আবিদুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়ার কথা বলে ছাত্রীদের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায়ের সত্যতা পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রশাসনিক কিছু দুর্নীতির তথ্যও জানা গেছে। অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা পাওয়া গেলে কলেজের শিক্ষক হোক বা অধ্যক্ষ হোক তদন্ত রিপোর্টের পর যে কারও বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন- লিটনের ভয় অপপ্রচারে, বুলবুলের প্রশাসনে

/এসএসএ/এফএস/

x