অবশেষে জেল থেকে ছাড়া পেলেন হাসনাত করিম

নুরুজ্জামান লাবু ও রায়হানুল ইসলাম আকন্দ ১৭:০৪ , আগস্ট ০৯ , ২০১৮

হাসনাত করিমদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে জেল থেকে ছাড়া পেলেন গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় গ্রেফতার হওয়া হাসনাত রেজা করিম। বৃহস্পতিবার (৯ আগস্ট) বিকাল সাড়ে চারটায় গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি জেল থেকে মুক্তি পান ব্রিটেন ও বাংলাদেশের এই দ্বৈত নাগরিক। জেল থেকে বেরিয়ে আসার সময় সেখানে তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। হাসনাতের কারামুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে হাই সিকিউরিটি জেলার বিকাশ রায়হান বলেন, ‘হাসনাতকে অব্যাহতি দিয়ে আদালত থেকে যে নির্দেশনা এসেছে, তা যাচাই-বাছাই করার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরদিন থেকেই সন্দেহভাজন হিসেবে প্রথমে আটক ও পরবর্তীতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিলেন তিনি। দুই বছর এক মাস ৯ দিনের মাথায় ঘরে ফিরলেন তিনি।

হাসনাত করিমের স্ত্রী শারমিনা করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা খুশি। অবশেষে হাসনাত জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল সে যেহেতু নির্দোষ, সেহেতু আজ হোক কাল হোক মুক্তি সে পাবেই। কিন্তু এই দুটি বছর আমাদের দুঃসহ জীবন পার করতে হয়েছে।’

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার দুই বছর পর গত ২৩ জুলাই হাসনাত করিমকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় এই মামলার তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি। ২৬ জুলাই ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম নুরুন্নাহার ইয়াসমিন চার্জশিটের নথিতে স্বাক্ষর করে সেটি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে চার্জশিট সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। গত বুধবার (৮ আগস্ট) বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান চার্জশিট গ্রহণ করে হাসনাত করিমকে অব্যাহতির আদেশ এবং পলাতক দুই জঙ্গি মামুনুর রশিদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারি করেন। এর আগে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসনাতকে ৫৪ ধারার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন আদালত।

হাসনাত করিমের পরিবার ও চার্জশিট থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল হাসনাত করিমের মেয়ে শেফা করিমের ১৩তম জন্মদিন। মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে স্ত্রী শারমিনা করিম ও দুই সন্তানকে নিয়ে হাসনাত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে রাতের খাবারের জন্য গিয়েছিলেন। রাত সাড়ে আটটার দিকে তারা ওই রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে খাবারের অর্ডার দিতে না দিতেই জঙ্গিরা সেখানে হামলা করে। রাতভর জঙ্গিদের হাতে জিম্মি ছিলেন তারা। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযান শুরুর আগ মুহূর্তে দেশি-বিদেশি আরও কয়েকজনের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন হাসনাত করিম। এরপর প্রথমে পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ হাসনাতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক মাস রহস্যজনক অবস্থানের পর এবং ঘটনার এক মাস তিন দিন পর ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট হাসনাত করিমকে প্রথমে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ৪ আগস্ট তাকে আদালতে সোপর্দ করে ৮ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। ১৩ আগস্ট রিমান্ড শেষে আদালতে সোপর্দ করার পাশাপাশি গুলশান হামলার মূল মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে দ্বিতীয় দফায় আবারও ৮ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২২ আগস্ট তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তখন থেকেই হাসনাত কারাবন্দি ছিলেন।

হাসনাতের পরিবার ও আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, হাসনাত করিমের জামিনের জন্য একাধিকবার আবেদন করা হলেও বারবার তা নাকচ হয়েছে। এমনকি ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর হাসনাতের বাবা রেজাউল করিম মারা যাওয়ার পর তার জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করলেও তা নাকচ করে দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

যে কারণে হাসনাতের দীর্ঘ কারাবাস

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় অংশ নেওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে হাসনাত করিমের ছবি এবং তার বিরুদ্ধে হিযুবত তাহরিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের কারণেই দীর্ঘ কারাবাসে থাকতে হয়েছে তাকে। তবে মামলার তদন্ত সংস্থা এসব অভিযোগের সত্যতা পায়নি। হাসনাত নিজে এবং ঘটনার সময় জিম্মি হয়ে থাকা অন্যদের ভাষ্য ছিল, জঙ্গিদের অস্ত্রের মুখে ছাদে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন হাসনাত করিম। আর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে সম্পৃক্তার যে অভিযোগ উঠেছিল, তারও কোনও সত্যতা পায়নি পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও কয়েকটি গণমাধ্যমে তার হিযবুত কানেকশন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি এজন্য তাকে বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। তবে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র ঘেঁটে এরকম কোনও তথ্য পায়নি পুলিশের কর্মকর্তারা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় তারা হাসনাতের বিষয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি। বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার পর মামলার চার্জশিট থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

/জেবি/এপিএইচ/এমওএফ/

x