একটি সর্বস্বান্ত গ্রামের কাহিনি

মোহাম্মদ নূর উদ্দিন, হবিগঞ্জ ১৪:০২ , সেপ্টেম্বর ১৩ , ২০১৮

প্রতিহিংসার বলি খাগাউড়া গ্রামের মানুষহবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার সীমান্তবর্তী খাগাউড়া গ্রাম। গ্রামটিতে রয়েছে একাধিক জলমহাল। এসব জলমহাল থেকে উপার্জিত অর্থ গ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। অর্থ আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখেন গ্রামবাসীই। তবে জলমহালে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই গ্রুপে বিভক্ত গ্রামের বাসিন্দারা। সম্প্রতি দুপক্ষের সংঘর্ষে জুনায়েদ মিয়া নামে একজন নিহত হন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে জুনায়েদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এদিকে জুনায়েদ হত্যা মামলার আসামিদের বাড়িছাড়া হওয়ার সুযোগ নিয়ে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করছে সুযোগসন্ধানীরা। হত্যা, হামলা-মামলা আর লুটপাটের ঘটনায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে খাগাউড়া গ্রামের লোকজন। সরেজমিন খাগাউড়া গ্রামে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কৃষি অধ্যুষিত খাগাউড়া গ্রামের চারপাশে হাওর। পাশেই রয়েছে জলমহাল, বিল ও ছোট নদী। গ্রামের রাস্তাঘাটগুলোর বেশিভাগেরই ভগ্নদশা। পৌঁছায়নি বিদ্যুতের আলো। এই পরিস্থিতিতে বিল ও জলাশয় থেকে পাওয়া আয়ের টাকা ব্যয় করা হয় গ্রাম উন্নয়নের কাজে। গ্রাম থেকে মনোনীত ব্যক্তিরা এ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। শাহ গেদা মিয়া নামে একজনকে ক্যশিয়ারের দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করেন গ্রামের লোকজন। তার সঙ্গে থাকেন গ্রামের প্রতি পঞ্চায়েত থেকে একজন করে। সবার সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই ওই টাকা দিয়ে গ্রামের রাস্তাঘাট, কালভার্ট উন্নয়নকাজ করা হয়। বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হয়। এর প্রতি দৃষ্টি সবার। জলাশয় পরিচালনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে বছরের পর বছর। এই বিরোধের জের ধরে একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে দায়ের করেন মামলা।

সূত্রমতে, গত বৈশাখ মাসে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুর রহিমের গোষ্ঠীর একজন রুহুল আমিনের সঙ্গে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে গ্রামের দরা মিয়ার পক্ষের লোক বদরু মিয়ার ছেলে জসিমের ঝগড়া হয়। এর জের ধরে গত রমজান মাসে তারাবির নামাজে যাওয়ার পথে দরা মিয়ার লোকজন প্রতিপক্ষ ইউপি সদস্য আব্দুর রহিমের পক্ষের আলী মিয়াকে মারধর করেন। এ নিয়ে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নেন গ্রামের মাতব্বর শাহ শওকত মিয়া ও তার লোকজন। ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম অভিযোগ করেন, সমস্যা সমাধানের কথা বলে শওকত ও তার লোকেরা ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন তার কাছে। এতে রাজি হননি আব্দুর রহিম ও তার গোষ্ঠীর লোকজন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ বাড়ে।

প্রতিহিংসার বলি খাগাউড়া গ্রামের মানুষ

জানা যায়, এরই অংশ হিসেবে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জসীম উদ্দিনের কাছে গ্রামের শাহ শওকত আলী, শাহ ইয়াকুত মিয়া, শাহ গেদা মিয়া, তজম্মুল আলী, আব্দুস শহীদ, নুরুল ইসলাম, খালু মিয়া, আজম মিয়া, খেছলি মিয়া, হাবিজ মিয়া ও সেকেন মিয়া অর্থাৎ ১১ মাতব্বরের বিরুদ্ধে রহিম মেম্বারের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজি, গ্রামের টাকা আত্মসাৎ, স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে প্রতিকারের দাবি জানানো হয়। এরপরই ওই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাগাউড়া গ্রামের স্কুল মাঠে গত ১১ জুলাই বৈঠক আহ্বান করেন। ওই বৈঠকে বাহুবল উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হাই, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে অভিযুক্ত ১১ জন উপস্থিত হননি। বৈঠকে আব্দুর রহিম মেম্বারের পক্ষের লোকজন শওকত ও তার লোকদের বিরুদ্ধে একতরফা অভিযোগ করেন। পরদিন ১২ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জসীম উদ্দিন এক নোটিশের মাধ্যমে অভিযুক্ত ১১ জনকে ১৭ জুলাই তার কার্যালয়ে শুনানিতে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন। ১৬ জুলাই শওকত ও তার পক্ষের লোকেরা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ডাকা শুনানি আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

সূত্র আরও জানায়, পরবর্তীতে রহিম মেম্বারের পক্ষের মৃত এখলাছ মিয়ার ছেলে জুনায়েদ আহমদ বাদী হয়ে শাহ শওকত ও তার লোকদের বিরুদ্ধে বিল জলাশয়সহ গ্রাম ফান্ডের প্রায় এক কোটি সাড়ে ২১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে বাহুবল মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আদালতে হাজির হলে বিচারক শাহ শওকত আলী, গেদা মিয়াসহ কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরা জেলে থাকা অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে আরও একটি মামলা করা হয়। গত ঈদুল আজহার আগে ১৯ আগস্ট জেল থেকে শাহ শওকত পক্ষের লোকজন মুক্তি পান। এসব বিষয় নিয়ে দুপক্ষের বিরোধ আরও বেড়ে যায়।জুনায়েদ মিয়া হত্যার বিচার দাবি

এদিকে গত ২৪ আগস্ট সন্ধ্যায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে উভয়পক্ষের প্রায় ৩০ জন আহত হন। এ সময় জুনায়েদ মিয়া নামে গুরুতর আহত একজনকে সিলেটে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। নিহত জুনায়েদ মিয়া একটি ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি ছিলেন।  

নিহত জুনায়েদের বাবা আব্দুল আউয়াল উচা মিয়া বলেন, ‘গ্রামের দুটি পক্ষের মধ্যে ফান্ডের টাকা নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের কোনও কিছুই জুনায়েদ জানতো না। কিন্তু শওকতের লোকেরা  আমার ছেলেকে হত্যা করলো। আমি হত্যার বিচার চাই। ঘাতকদের যেন ফাঁসি নিশ্চিত করা হয়।’

জুনায়েদের মা নেয়া খাতুন বলেন, ‘আমরা ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি। তারা কোনও অন্যায় কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। জুনায়েদ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতো। কিন্তু শওকতের লোকেরা আমার ছেলেকে হত্যা করলো। আমি একজন মা হয়ে ছেলের এ মৃত্যু মেনে নিতে পারি না। আমি আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসি চাই।’

জুনায়েদ খুনের ঘটনায় ৩৮ জনকে আসামি করা হলেও গ্রামের মাতব্বর শাহ শওকত আলী ও তার লোকদের ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষের লোকজন। সব আক্রোশই যেন শওকতের ওপর। খাগাউড়া গ্রামে শওকতসহ তার স্বজনদের বাড়িঘরে এমনভাবে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে, গাছপালা এমনভাবে কেটে ফেলা হয়েছে, দেখে মনে হবে সেখানে আর বসবাস করা আর সম্ভব নয়।জুনায়েদ মিয়া হত্যার বিচার দাবি

শওকত মিয়ার স্ত্রী খালেদা আক্তার বলেন, ‘আব্দুর রহিমের লোকজন আমাদের বাড়িতে দেশি অস্ত্র নিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। হামলাকারীরা আমার ঘর থেকে ৩০০ মণ ধান, নগদ ২০ হাজার টাকা, স্বর্ণালংকারসহ প্রায় চার লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। এমনকি ঘর ভেঙে তারা ইট পর্যন্ত নিয়ে গেছে। বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন করে ফেলায় আমরা আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। গ্রামে সাংবাদিক এসেছেন খবর পেয়ে আমরা বাড়িতে এসেছি।’

শাহ ইয়াকুত মিয়ার স্ত্রী নাজিরা আক্তার জানান, ‘আব্দুর রহিম মেম্বারের পক্ষের লোকজন আমার বাড়িতে প্রবেশ করে আমার এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ের সর্বনাশ করার হুমকি দিয়েছে। আমার ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। হামলাকারীরা আমার ঘর থেকে ২০০ মণ ধানসহ দুই লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এছাড়াও শাহ শওকতের পক্ষের শাহ জমসেদ মিয়া, সাবেক মেম্বার মেহের চান বিবি, কালু মিয়া, ঝানু মিয়া, কনু মিয়া, আবুল হাসান, নুনু মিয়া, মানিক সুত্রধর, গনেশ সুত্রধর, মুকেন সুত্রধর, জিলু মিয়া, চেগেন মিয়া, আব্দুস শহীদ, দিলবর মিয়া, সোহেল মিয়া, শাহমুল, আফিল, মহিবুল হাসানসহ আরও কয়েকজনের বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। দফায় দফায় চালানো হয়েছে হামলা, লুটপাট। অনেকের বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বসতঘর। জনমানবহীন হয়ে পড়েছে এসব বাড়ি।

নবীগঞ্জ ও বাহুবল সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পারভেজ আলম চৌধুরী জানান, ‘হত্যাকাণ্ডের পর আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। এখনও গ্রামটি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। লুটপাটের যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি। এ ব্যাপারেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বাহুবল উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে খাগাউড়া গ্রামের দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। আমরা প্রাণপন চেষ্টা করেও তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারিনি। আমাদের প্রচেষ্টা চলা অবস্থায় হঠাৎ করেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে।’

আরও পড়ুন- ‘বাচ্চা সুস্থ জীবনেও কইছ না, বল্ ইনজেকশন না মারলে শান্তি হইতো না’ (অডিও)

/আইএ/এফএস/এমওএফ/

x