সাপ পালনে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন প্রদীপের

রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর ১০:৪০ , সেপ্টেম্বর ১৪ , ২০১৮

প্রদীপ চন্দ্র দাসের খামারে সাপদুই বছর আগে নিজ বাড়ির পাশেই সাপের খামার গড়ে তোলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার বরুন গ্রামের যুবক প্রদীপ চন্দ্র দাস। খামারে বিষাক্ত গোখরা, পদ্মগোখরা, বালিঘোরা, কেউটে, লাউডগা ও দাঁড়াসসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ পালেন প্রদীপ। সাপ পালনের মাধ্যমেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজের স্নাতকের এই শিক্ষার্থী। নিজ উদ্যোগে সাপ পালনের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু একটা করে দেখাতে চান তিনি। তার স্বপ্নের খামারে আজ ৪৫টি বিষাক্ত সাপ রয়েছে। বরুন গ্রাম ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, ছোট বয়স থেকেই বন্যপ্রাণির প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল বরুন গ্রামের রামলাল রবি দাসের ছেলে প্রদীপের। আট বছর আগে গ্রামের লোকজন একটি মেছো বাঘ ধরে তা মেরে ফেলার উদ্যোগ নেন। কিন্তু প্রদীপ তাতে বাধা দিয়ে বাঘটিকে বনে ছেড়ে দেন। খামার করার আগে গোখরা সাপ ধরে এলাকার লোকজনকে দেখিয়ে আবার তা বনে ছেড়ে দিতেন প্রদীপ।
এরইমধ্যে সাপ ধরার কৌশল কব্জা করে ফেলেছেন প্রদীপ চন্দ্র দাস। যেকোনও বিষাক্ত সাপ খুব সহজেই ধরতে পারেন তিনি। তিনি জানান, লেজে ধরলে সাপ ঝুলন্ত অবস্থায় আক্রমণ করতে পারে না। এই কৌশল রপ্ত করা থেকেই সাপের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। উদ্যোক্তা হয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য একটা কিছু করে দেখাতে চান।

জানা যায়, ২০১৬ সালের জুনে পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সাপের খামার শুরু করেন প্রদীপ। প্রথম দিকে অজগর, দাঁড়াস, কেউটে, গোখরা, বালিঘোরা, লাউডগাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ৩০টি সাপ তার খামারে স্থান পায়। প্রথমদিকে বেদে পরিবারের লোকদের কাছ থেকে সাপগুলো সংগ্রহ করেন তিনি। পরে যেখানেই সাপের খোঁজ পান সেখান থেকে বন্ধুদের নিয়ে সাপ ধরেন। এভাবে তার খামারে সাপের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

প্রদীপ চন্দ্র দাস বলেন, ‘মানুষের জন্য সাপ উপকারী এবং সাপ আয়ের উৎস এমন সব তথ্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করি। এরপর থেকে সাপ পালন শুরু করি। প্রথমত ৩০টি সাপ নিয়ে খামার শুরু করি। একটি সাপ একবারে সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি ডিম দেয়। বন বিভাগ থেকে সাপের খামারের কোনও অনুমোদন পাইনি। তবু প্রাণিপ্রেম ও অর্থনৈতিক বিষয়টি মাথায় রেখে সাপের খামার গড়ে তুলি।’
আবাদি জমিতে দাঁড়াস সাপসহ এমন প্রজাতির সাপ ছেড়ে দিলে ইঁদুরের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। গত প্রায় এক বছর আগে একটি দাঁড়াস সাপ এলাকার আবাদি জমিতে অবমুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, ‘দাঁড়াস সাপের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয় না। এ সাপ পরিবেশবান্ধব। সাপ শুধু পরিবেশ বা আবাদি জমির উপকারী হিসেবেই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য এর বিষ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’

প্রদীপ জানান, সাপের বিষের উপকারিতা, সাপ ধরার কৌশল, খামার তৈরির নিয়মাবলি শেখানোর জন্য উৎসাহী তরুণদের নিয়ে ‘বরুন সাপের খামার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে সমিতি গঠন করেছেন তিনি।

বরুন গ্রামের মাসুদ আলম বলেন, ‘তিনিও প্রদীপের সঙ্গে সাপের খামারে কাজ করেন। সাপ যদিও বিষাক্ত প্রাণী তবু সাপের বিষ উৎপাদন করে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব।’ উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘দেশে কুমিরের চাষ আগে থেকেই হচ্ছে। এটিও বিষাক্ত, মানুষের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও মানুষ সাবধানতা অবলম্বন করে কুমিরের চাষ করছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মাধ্যমে সাপ ধরার কৌশল, বিষ বের করা, সংরক্ষণ করার কৌশল ও রফতানি করার ক্ষেত্রগুলোর সহজ প্রক্রিয়া জানানো হলে সাপের খামারের মাধমে অনেকেই স্বাবলম্বী হতে পারবেন।’

প্রদীপ জানান, সাপের প্রধান খাবার ব্যাঙ, ডিম, ইঁদুর, মুরগির বাচ্চা ইত্যাদি। খাবার জোগাড় করা কষ্টসাধ্য। তাই
খামার থেকে এখন তেমন আয় করা যাচ্ছে না। তাছাড়া সাপ চাষের বিষয়ে সরকারি সহনশীল নীতিমালা থাকলেও পরিবেশ ও বন অধিদফতরের কোনও অনুমোদন পাচ্ছেন না তিনি।

বরুন গ্রামের কৃষক আবুল হাশেম (৫৫) বলেন, ‘সাপ আবাদি জমির ইঁদুর নিধন করে, সাপ পরিবেশবান্ধব প্রাণী, নির্বিচারে সাপ মারা ঠিক নয়। সাপ রক্ষায় অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কাপাসিয়া উন্নয়ন মেলায় প্রদীপের সাপের খামারের স্টল থেকে এসব বিষয়ে জানতে পেরেছি।’

একই এলাকার যুবক ফরিদ আহমেদ (৩৮) বলেন, ‘প্রথমদিকে প্রদীপের খামার প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাধা দিতাম। মনে হয়েছিল বিষধর সাপগুলো খামার থেকে বেরিয়ে মানুষের ক্ষতি করবে। মাস তিনেক পর দেখা গেল সাপগুলো খামারে সংরক্ষিত থাকে। মানুষের ক্ষতি করে না। প্রদীপ কোনও মন্ত্র ছাড়াই সাপ ধরতে পারে। একমাত্র কৌশলই সাপ ধরার উপায়। এসব বিষয় বুঝতে পেরে এখন আর তাকে কেউ বাধা দেয় না। উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রদীপ এখন সাপের খামারের সমিতি করেছে।’

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রদীপের সাপের খামারের বিষয়টি আমার জানা আছে। কয়েকবার পরিদর্শনও করেছি। অনুমোদনের জন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে সাপের খামার করতে উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করা হলে দেশের মুদ্রা সাশ্রয় ও খামারিরা লাভবান হবেন।’

 

 

/আইএ/এমওএফ/

x