ঘর দেওয়ার কথা বলে ৫৫ পরিবার থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

নড়াইল প্রতিনিধি ১৮:৩২ , সেপ্টেম্বর ১৪ , ২০১৮

আশ্রয়ণ প্রকল্পসরকারি প্রকল্পের বিনা খরচের ঘর দেওয়ার কথা বলে একটি চক্র ৫৫টি পরিবার থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারা সর্বনিম্ন ৫ হাজার ও সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা দিয়েছেন চক্রটিকে। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী ইউনিয়নে এই ঘটনা ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প-২’ এর অধীনে ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তারা এসব টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চাঁচুড়ী ইউনিয়নের ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের কানাই গাজী ও তার ভাতিজা আলমগীর গাজীর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে।

ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের ঋষিপল্লীর বিধবা জোসনা বিশ্বাস (৪৫) বলেন, ‘ আমার স্বামী প্রায় ১৫-১৬ বছর আগে মারা যান। বাঁশ দিয়ে স্বামীর নির্মাণ করা টিনের দু-চালা একটি টিনের ছোট ঘর থাকলেও সংসারের অভাব-অনটনের কারণে ঘরটি কখনও মেরামত করতে পারিনি। গত এক সপ্তাহ আগে একই গ্রামের মৃত আবদুল হামিদ গাজীর ছেলে বিল্লাল গাজী ওরফে কানাই গাজী আমার ঘরে আসে। সে তাকে ১৫ হাজার টাকা দিলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক লাখ টাকা মূল্যের একটি ঘর আগামী দুই মাসের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া হবে বলে জানায়। পরে স্থানীয় দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসিক শতকরা ১০ টাকা হারে ৭ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কানাই গাজীকে দেই।বাকি টাকাও ধার-দেনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’

মাটিকাটা শ্রমিক ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের হাসান শেখের স্ত্রী হালিমা বেগম বলেন, ‘স্বামী-সন্তান নিয়ে টিনের তৈরি একটি কাঁচা ঘরে কোনো রকমে বসবাস করি। ভালো একটি ঘর পাওয়ার আশায় কানাই গাজী ও তার ভাতিজা আলমগীর গাজীকে অগ্রিম ৫ হাজার টাকা দিয়েছি।  বাকি ১০ হাজার টাকা ঘর পাওয়ার পর দেবো বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।’

ঘরের জন্য টাকা দিয়েছেন এসব নারীএছাড়া উপজেলার ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের পিকুল মোল্যার স্ত্রী আনজিরা বেগম, মৃত তালেব শেখের ছেলে মিজান শেখ, মৃত তালেব শিকদারের ছেলে ইলু শিকদার, হাদিস শিকদার, লায়েব শিকদার, মৃত আকুববরের ছেলে রজিবুল শেখ, মকবুল শেখের ছেলে ইসমাইল শেখ, মৃত নয়ন মোল্যার ছেলে আলাউদ্দিন মোল্যা, মৃত আজোয়ার মোল্যার ছেলে আল-আমিন মোল্যা, মৃত আনসার শেখের ছেলে শরিফুল শেখ, সবুর বিশ্বাসের ছেলে লিটু বিশ্বাস, মৃত. কমল বিশ্বাসের ছেলে অশোক বিশ্বাস, শংকর বিশ্বাস, মৃত. লক্ষীকান্তের ছেলে দিলীপ বিশ্বাস, হিরু শেখের ছেলে হাসমত শেখ, লিয়াকত শেখ, মৃত. তোফাজ্জেল মোল্যার ছেলে ওসমান মোল্যা ও মৃত উতার উদ্দিন মোল্যার ছেলে মাসেম মোল্যা, চাঁচুড়ী গ্রামের মৃত. বদিয়ার মোল্যার ছেলে আলমগীর মোল্যা, মৃত. ছলেমান শেখের ছেলে হেমায়েত শেখ, চাঁচুড়ী গ্রামের বেপারী পাড়ার মোন্তাজ খাঁর মেয়ে জাহেদা বেগম ও কৃষ্ণপুর গ্রামের আজিজ শেখের ছেলে নাসির শেখ ও বিধবা রুজিনা বেগমের কাছ থেকে কানাই গাজী ও তার ভাতিজা আলমগীর গাজী ঘর পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ৫ থেকে ৮ হাজার করে সর্বমোট ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

কালিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যাদের জমি আছে, ঘর নেই এ প্রকল্পের আওতায় অসহায় লোকের মধ্যে সরকারিভাবে বিনা খরচে গৃহ নির্মাণের কাজ চলছে। প্রধানমন্ত্রী দফতর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত কোনও বরাদ্দ আসেনি। এ উপজেলায় গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩২টি ঘর বরাদ্দসহ এ প্রকল্পে মোট ১৯৭টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ডহর চাঁচুড়ী গ্রামের খবু গাজীর ছেলে ও দালাল কানাই গাজীর ভাতিজা আলমগীর গাজী টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন,‘আমার চাচার জামাই (চাচাতো বোনের স্বামী) গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার শাহজাহানের ঘর পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়ে ৫৫ জন অগ্রিম বাবদ সর্বনিম্ন ৫ হাজার ও সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আমাদের কাছে জমা দিয়েছেন। আগামী দেড়-দুই মাসের মধ্যে টাকা প্রদানকারীদের চৌদ্দ হাত লম্বা ও ৬ হাত চওড়া সেমি পাকা ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে।’

ঘরের জন্য টাকা দিয়েছেন এসব নারীবিল্লাল ওরফে কানাই গাজী বলেন,‘একটি বাড়ি ও একটি পায়খানা নির্মাণ বাবদ ৪০-৪৫ জনের কাছ থেকে ১৯ বন্দের একটি সেমি পাকা ঘর নির্মাণ বাবদ আমি ১৫ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তিতে নগদ ৫-৬ হাজার টাকা করে অগ্রিম নিয়েছি। আমার মেয়ের দেবর সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা। সচিবালয় থেকে অনুমোদন, গাড়ি ভাড়া ও খরচা-পাতির কারণে প্রতিটি ঘর দেওয়ার বিনিময় হিসেবে অগ্রিম বাবদ এ টাকা নেওয়া হয়েছে।’

অভিযুক্ত শাহজাহান নিজেকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার বাসিন্দা সাজ্জাদ দাবি করে  বলেন,‘মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য খরচ বাবদ কিছু টাকা তোলা হচ্ছে। তবে যারা টাকা দিচ্ছেন, তারা নিশ্চিতভাবে ঘর পাবেন।’

কালিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. নাজমুল হুদা বলেন,‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পে জমি আছে, ঘর নেই আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র মানুষদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের নাম করে যদি কোনও ব্যক্তি টাকা-পয়সা নিয়ে থাকে, সেই বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

/এনআই/

x