হাকালুকি হাওর ও বাইক্কা বিলে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ছে

সাইফুল ইসলাম, মৌলভীবাজার ১৬:৩০ , জানুয়ারি ১২ , ২০১৯

বাইক্কা বিল

মৌলভীবাজারের বাইক্কাবিল ও হাকালুকি হাওরজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অস্থায়ী হাঁসের বসতি এবং গরু-মহিষের বাথান। শীতের কারণে বেড়েছে হরেক রকমের অতিথি পাখির আনাগোণা। আর সেই পাখি দেখার জন্য আসতে শুরু করেছেন দেশি ও বিদেশি পর্যটকরা। শীতের শুরুতে নির্বাচনের কারণে পর্যটকের উপস্থিতি কম হলেও এখন জমে উঠতে শুরু করেছে ট্যুরিস্ট স্পটগুলো। মনোরম শান্ত প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছেন সৌন্দর্য পিপাসুরা। 

স্থানীয়রা জানান, হাওরে ও বিলে ভরা বর্ষার থই থই দৃশ্য এখন নেই। শুষ্ক মৌসুম চলছে। তাই বদলে গেছে হাওরের চিরচেনা দৃশ্য। হাওরের মাঝখানে ও দুই পাড়ের সবুজ অরণ্যজুড়ে ভিড় করতে শুরু করেছে পরিযায়ী পাখির দল। হাইল হাওর ও বাইক্কা বিলজুড়ে এখন মনোরম প্রকৃতিক সৌর্ন্দের হাতছানি। জলজ আর উভয়চর প্রাণীর আবাসস্থলের জন্য যেমন হাকালুকি হাওর, তেমনি দেশীয় নানা জাতের মাছ ও পাখির অভয়ারণ্য বাইক্কা বিল। শীত আর গ্রীষ্ম দুই মৌসুমেই এই দুটি স্থানের প্রকৃতির সৌন্দর্য ফুটে ওঠে নতুন রূপে। তবে সারা বছরই পর্যটকদের মুগ্ধ করতে প্রস্তুত থাকে হাকালুকি হাওর আর বাইক্কা বিল। বর্ষায় চারপাশে থই থই পানি। বিশাল জলরাশির মধ্যখানে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে জেগে ওঠা হিজল, করচ, কলমি আর নয়নকাড়া সবুজ জলজ বনের রাজ্য। আর শীত মৌসুমে দুচোখজুড়ে শুধু সবুজ ঘাসের মাঠ, পুরো হাওরজুড়ে গরু-মহিষের বাথান। আর হাওরের বিলে খাদ্যের সন্ধানে অবাধ বিচরণ নানা জাতের দেশি ও বিদেশি অতিথি পাখির। তাই সকাল ও সন্ধ্যায় পাখি দেখতে স্থান দুটিতে সমাগম ঘটে পাখিপ্রেমী পর্যটকের। তাই প্রকৃতির টানে এসব স্থানে ছুটে আসেন সৌর্ন্দয পিপাসুরা।

বাইক্কা বিল

জানা যায়, হাকালুকি হাওরের আয়তন প্রায় ২০ হাজার চারশ’ হেক্টর। কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ এবং গোলাপগঞ্জ এই ৫টি উপজেলা জুড়ে ২৩৮টি বিল নিয়ে এই হাওর। নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে থাকা হাকালুকি এখনও কোনোরকমে তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। একটু উষ্ণতা আর খাবারের সন্ধানে পুরো শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখির দল দাপিয়ে বেড়ায় হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন বিলে। গোধূলিলগ্নে পাখিদের ওড়াউড়ি, ডুবসাঁতার, জলকেলি, খুনসুটি, রোদে পালক পোহানো আর খাবার নিয়ে ঝগড়া কিংবা খাবার সংগ্রহের মনোহর দৃশ্য এখন হাকালুকি হাওরে।

হাকালুকি হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানালেন, হাওরের পিংলা, চাতলা, চৌকিয়া, হাওর খাল, মালাম, গৌড়কুড়ী, নাগুয়া, তুরল, কালাপানি, ফোয়ালা, বালিজুড়ী, কাংলি ও ফুটবিলে এখন অতিথি পাখির হাকডাক।

বাইক্কা বিল: অতিথি আর দেশীয় পাখির কলকাকলিতে মুখরিত ৪২৫ দশমিক ১৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাইক্কা বিল। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, মাছ ও পাখি; এছাড়াও বিলের পাড়ে ঘন সবুজ বন। এমন দৃশ্য খোলা চোখে দেখতে কাদামাটির ভাঙাচোরা রাস্তা মাড়িয়ে ওখানে ছুটে আসেন পর্যটকরা।

হাকালুকি হাওর

জানা গেছে, বাইক্কা বিলে ৮০ প্রজাতির মাছ ও শতাধিক প্রজাতির পাখির অভয়াশ্রম। বাইক্কা বিল শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের প্রায় ১শ’ হেক্টর আয়তনের একটি জলাভূমি। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এই বিলকে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত অনেক রকম অতিথি পাখি আর দেশীয় নানা জাতের ছোট-বড় মাছ ও পাখির নিরাপদ আবাসস্থল এটি। বিলের পাড় ও তীর ঘেঁষে হিজল, করচ, নল খাগরা, ঢোল কলমি আর ফুল ও লতাগুল্মর ছড়াছড়ি। বিলের পানিতে ভাসমান পানা, শাপলা ও পদ্ম, সিংড়া, মাখনা।

বাইক্কা বিলে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ নানা জাতের পাখি। এদের মধ্যে-পানকৌড়ি, কানিবক, ডাহুক, জল মোরগ, ধলাবক, ধুপনি বক, রাঙ্গা বক, মাছরাঙা, গোবক, শঙ্খচিল, ভুবন চিল, পালাসী কুড়া, ঈগল, গুটি ঈগল অন্যতম। কালো লেজ জৌরালি ও দাগিলেজ জৌরালি, লম্বা পায়ের পাখি দলপিপি, নেউপিপি, কুট, পান মুরগি ও বেগুনি কালেম, কালামাথা কাস্তেচরা, গেওয়ালা বাটান, মেটেমাথা টিটি, কালাপাখ ঠেঙ্গী- এই বিলের নিয়মিত অতিথি পাখি। বিপন্ন তালিকায় থাকা পালাশী, কুড়া ঈগল; অন্যান্য পাখির মধ্যে দাগি রাজহাঁস, খয়রা চখাচখি, ল্যাঞ্জাহাঁস, পাকড়া কোকিল, নীললেজ সুইচোর, পাতি আবাবিল, দাগি ঘাসপাখি, সরালি, মরচেরং ভুঁতি হাঁস, গিরিয়া হাঁস, পাতিচ্যাগা উল্লেখযোগ্য। আর মাছের মধ্যে আছে আইড়, মেনি, কাখলে, কই, ফলি, মলা, টেংরা, পুটি, দাড়কিনা, কাশখয়রা, পাবদা, মাগুর, শিং, টাকি, চিতল, কাতলা, বোয়াল, রুই ও গজার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

হাকালুকি হাওর

ওয়াচ টাওয়ারের তদারকির দ্বায়িত্বে নিয়োজিত আহসান হাবিব ও রাজু আহমদ বলেন, ‘পাখি ও মাছের নিরাপদ আবাসস্থলের কারণে এখন পর্যটকদের কাছে প্রধান আর্কষণ বাইক্কা বিল।’

তারা জানান, সপ্তাহে শুক্র ও শনিবার এই দুদিন পর্যটক বেশি আসেন। তারা আরও জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে গত দুই মাস কোনও পর্যটক দেখা মেলেনি। তবে এখন আবারও ভিড় বাড়তে শুরু করেছে পর্যটকের।

বাইক্কা বিলে দেখা হয় ঢাকার খিলক্ষেত থেকে বেড়াতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিউটিফুল মাইন্ড-এর সিনিয়র স্পেশাল এডুকেটর সাবরিনা মুস্তারি ও তার স্কুল পড়ুয়া মেয়ে সৃজিতার সঙ্গে। তারা জানান, হরেক রকম পরিযায়ী পাখির মেলা দেখে উৎফুল্ল তারা।

এছাড়াও কথা হয় হবিগঞ্জের ব্যাংক কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম ও স্ত্রী সায়েলা সুলতানার সঙ্গে। এক সঙ্গে এতো পাখি আর সবুজ প্রকৃতি দেখে মুগ্ধতার কথা জানালেন তারা।  

বাইক্কা বিলের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকা সমাজ ভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংগঠন বড়গাঙ্গিনার সম্পাদক মিন্নত আলী বলেন, ‘হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হাওরে মাছ বৃদ্ধির জন্য বেশি করে গভীর অভয়াশ্রম তৈরি ও পাখির নিরাপদ নিবাসের জন্য বনায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।’

 

 

/এএইচ/

x