ভারতীয় কাস্টমসের নতুন নির্দেশনা, বেনাপোল দিয়ে আমদানি-রফতানিতে ধস নামার শঙ্কা

সেলিম রেজা, বেনাপোল ১৪:০৪ , এপ্রিল ২০ , ২০১৯

বেনাপোল-পেট্রাপোল গেটভারতের কলকাতার প্রধান কাস্টমস কমিশনার স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছে, এখন থেকে ভারত হতে যত পণ্য বাংলাদেশে রফতানি হবে তার প্রতিটি চালান পেট্রাপোল বন্দরে ট্রাক থেকে আনলোড করে শতভাগ পরীক্ষা সম্পন্ন করেই রফতানির অনুমতি দেবেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য রফতানি হবে সেসব পণ্যও ট্রাক থেকে খালাস করে শতভাগ পরীক্ষা করেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। ১৮ এপ্রিল এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনার কারণে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৫শ’ থেকে ৬শ’ পণ্য বোঝাই ট্রাক আমদানি হয় ভারত থেকে। বেনাপোল বন্দর দিয়ে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজসহ বিভিন্ন শিল্প-কলকারখানায় ব্যবহৃত ৮০ ভাগ কাঁচামাল আমদানি হয়ে থাকে। আবার বাংলাদেশ থেকেই প্রায় আড়াইশ ট্রাক ভারতে যায়। ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হঠাৎ করে এ ধরনের নির্দেশনায় আমদানি বাণিজ্য অর্ধেকে নেমে আসবে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ ট্রাকের পণ্য আনলোড করে পরীক্ষা করা অসম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে বিভিন্ন অব্যবস্থাপনায় এমনিতেই একটি পণ্যের চালান ভারত থেকে আমদানি হয়ে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত আসতে কোনও কোনও সময় ১৫ দিন পর্যন্ত লেগে যায়। বর্তমানে ভারতের পেট্রাপোল বন্দর ও কালিতলা পার্কিংয়ে ৫ হাজার পণ্য বোঝাই ট্রাক আটকে আছে যত্রতত্রভাবে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পেট্রাপোল বন্দরে এবার পণ্য চালান শতভাগ পরীক্ষায় এ ভোগান্তি আরও দ্বিগুণ বাড়বে। এতে পণ্য খালাস একদিকে যেমন কঠিন হয়ে পড়বে তেমনি আমদানি খরচও বেড়ে দ্বিগুণ হবে, যার প্রভাব পড়বে দেশীয় বাজারে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।

বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছেন, অফিসিয়ালভাবে তারা এখন পর্যন্ত কোনও চিঠি হাতে পাননি। তবে এ নিয়ম চালুতে দ্রুত আমদানি বাণিজ্য সম্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর আগে পেট্রাপোল বন্দর থেকে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের আগে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ ছাড়া ট্রাক থেকে পণ্য নামিয়ে পরীক্ষা করা হতো না। তবে ব্যবসায়ীদের জানিয়ে দেওয়া হয়, খুব দ্রুত এ সিদ্ধান্ত মেনে ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য সম্পাদন করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য

ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চন্দ্র জানান, ‘কাস্টমসের এই আদেশে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পাদন কঠিন হয়ে যাবে। বিশেষ করে পচনশীল পণ্য চালান রফতানি কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আগে পাস করা হয়েছে এমন পণ্য চালান বন্দরে প্রবেশ করেছে।’

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ল্যান্ডপোর্ট সাব কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান জানান, ‘ভারতীয় পেট্রাপোল কাস্টমস সহ-কমিশনারের স্বাক্ষরিত একটি আদেশ পাওয়া মাত্রই বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার/সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনসহ বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দফতরে অবহিত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনই না বসলে এ বন্দর দিয়ে বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়বে।’

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে প্রতিবছর ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে। প্রতিবছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার কারণে অনেক আগে থেকেই বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাণিজ্যে আগ্রহ বেশি ব্যবসায়ীদের। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বন্দরে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনিক বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা আর ব্যবসায়ী হয়রানির কারণে সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আসছে না।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত ৬ মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে আদায় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৪৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ঘাটতি রয়েছে ৬০৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার আকরাম হোসেন জানান, ‘এ বিষয়ে ভারতীয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আমোদের কোনও চিঠি দেয়নি। তবে ব্যবসায়ী ও চালকদের কাছ থেকে বিষয়টি শুনেছি। এ নিয়ম চালুতে দ্রুত বাণিজ্য সম্পাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে তিনি জানান।’ 

/এফএস/এমএমজে/

x