যে কারণে হাওরে ধান কাটার শ্রমিক সংকট

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ ১১:৪৩ , এপ্রিল ২১ , ২০১৯

হাওরের ধান ক্ষেতসুনামগঞ্জের হাওরে চলছে বোরো ধান কাটা। তবে ধান ঘরে তোলার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক নেই হাওরাঞ্চলে। শ্রমিক সংকটের কারণে বেকায়দায় পড়ছেন কৃষকরা। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাজনার হাওরের শ্রমিকরাই সংকটের কারণ জানিয়েছেন। তারা জানায়,হাওরের ডুবন্ত সড়ক না থাকা, কম মুজুরি, ব্রজপাত আতঙ্ক, স্বল্পমেয়াদী কর্মসংস্থান, বালিপাথর মহালে লাভজনক মুজুরি,হাওরে সারাবছর কাজ না পাওয়ায় হাওরের শ্রমজীবীরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করতে চলে যায়। এছাড়া হাওর এলাকা শ্রমিকদের একটি বিশাল অংশ সুনামগঞ্জের ধোপাজান, ফাজিলপুর বালি মহাল ও সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি পাথর কোয়ারিতে কাজ করেন তাই এসময় শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দেয়।

তাহিরপুর  উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের লাউড়েরগড় গ্রামের শ্রমিক সর্দার আমির হোসেন বলেন, ‘ফাল্গুন মাসে হরিপুর গ্রামের দুইজন বড় গিরস্থ তাদেরকে ধান কাটার জন্য বায়না (অগ্রিম টাকা) দিয়েছিলেন। কথা ছিল ৩০ জন শ্রমিক নিয়ে ওই দুই কৃষকের ধান কেটে দেবেন। কিন্তু অনেক কষ্ট করে মাত্র ১৭ জন শ্রমিক যোগাড় করতে পেরেছেন। বালুমহালে মজুরি বেশি থাকায় গ্রামের বেশিরভাগ যুবক সেখানে কাজ করতে যায়। তাই ধান কাটার শ্রমিক সংকট।’

হাওরের শ্রমিক সংকটখাদিমপাড়া এলাকার নবী হোসেন বলেন,‘জমির ধান কেটে দুই মাইল পথ মাথায় করে ধান নিয়ে আসতে হয়। এতে পরিশ্রম বেশি হয়। হাওরের ধান পরিবহনের রাস্তা না থাকায় শ্রমিকরা পথে পড়ে গিয়ে আহত হন। তাই এলাকার যুবকরা ধান কাটেতে আগ্রহী নয়।’

হরিপুর গ্রামের প্রবীণ কৃষক আফতাব উদ্দিন বলেন,‘২০/ ২৫ বছর আগে জমি থেকে ধান আনতে কোনও সমস্যা হতো না। খাড়া দিয়ে নৌকায় করে ধান মাড়াই খলায় নিয়ে আসা যেতো।  এখন কোন হাওরে খাড়া নেই সড়কও নেই। শ্রমিকরা কাদাপানি ভেঙে মাথায় করে ধান নিয়ে আসে। এতে তাদের কষ্ট অনেক বেড়ে যায়। তাই শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।’

হাওরের শ্রমিক সংকটএকই গ্রামের কৃষক জায়েদ মিয়া বলেন,‘হাওরের লাখ লাখ টন ধান উৎপাদন করে কৃষক মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়। কিন্তু এত বৎসর পরও হাওরের অভ্যন্তরে ধান পরিবহনের জন্য কোনও সরকার সড়ক তৈরি করেনি।’ 

আফরিদ মিয়া বলেন,‘এখন মানুষের আগের মতো গরু-মহিষ নেই। এলাকা বড়বড় কৃষকের গরু-মহিষ আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের গোসম্পদ নেই বললেই চলে। তারা গাভী পালন করেন। তাই ধান পরিবহনে গরুর গাড়ির চল এখন ওঠে গেছে। কৃষক এখন ট্রাক্টরের ট্রলি দিয়ে ধান পরিবহন করেন সেখানে সমস্যা সড়ক না থাকায় ট্রলিও চালানো যায় না।’

রহিম আলী বলেন,‘হাওরের এখন এমন একটা অবস্থা নাও চলে না গাড়িও চলে না। মাথায় বোঝা নিয়ে ধান পরিবহন করতে হয়। শ্রমিকরা সারাদিন জমিতে ধান কেটে ক্লান্ত থাকেন তারা কেউ নেহাত প্রয়োজন ছাড়া মাথায় করে ধানের মুঠ নিতে চান না।’

হাওরের শ্রমিক সংকটসাফিজুল ইসলাম বলেন,‘হাওর এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ও দেশের অন্যান্য জায়গায় যুবকরা কাজ করতে যায়। সেখানে তারা সারা বছর কাজ পায় দুই এক মাসের জন্য স্থায়ী কাজ বাদ দিয়ে ধান কাটতে আসতে চায় না তারা।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মেডিসিন ও বাতরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ বলেন,গোটা হাওর এলাকা থেকে বছরের এসময় স্পন্ডেলাইটিস  ও মেরুদন্ডজনিত সমস্যা নিয়ে অনেক রোগী আসেন। তাদের অনেকেই ঘাড়ের আঘাতজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। দীর্ঘ সময় মাথায় ভারী বোঝা বহনের করতে তারা এরোগে আক্রান্ত হয়। হাওর এলাকায় কোনও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় মাথায় করে ধান পরিবহনের কারণে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ও ঘাড়ে ব্যাথা পান। অনেক সময় হাত-পা ভেঙে যায় এতে দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা নিতে হয় তাদের।

হাওরের শ্রমিক সংকটসুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু শ্রমিকদের কথার সঙ্গে একমত হয়ে বলেন,জমির ধান পরিবহনের জন্য হাওরের ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ করতে হবে। শ্রমিকরা জমি থেকে ধান কেটে মাথায় করে মাড়াই খলায় নিয়ে আসে। এত দূর পর্যন্ত মাথায় ধান নিয়ে আসা কষ্টসাধ্য কাজ। তাই যুবকরা অন্য কর্মক্ষেত্র বেছে নেয়। যেখানে তারা সারাবছর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

জেলা কৃষি-সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বশির আহম্মেদ সরকার বলেন,‘ডুবন্ত সড়ক নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বাস্তাবায়ন করার বিষয়টি তাদের ওপর নির্ভর করে।’

হাওরের শ্রমিক সংকট

সুনামগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় হুইপ অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন,‘হাওরের ধান পরিবহনের জন্য ডুবন্ত সড়ক নির্মাণের বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করছেন। বিশাল হাওর এলাকায় ডুবন্ত সড়ক নির্মাণ করা অনেক সময়ের ব্যাপার ও ব্যয় বহুল পরিকল্পনা। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তা  করেছে।’  

 

 

/এসটি/

x