চাঁদরাতে গ্রামের বাড়িতে ফোন করেছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম

তৌহিদ জামান, যশোর ১৮:৩১ , জুন ১০ , ২০১৯

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের যশোরের পৈত্রিক বাড়ি। ঝিনাইদহে আদি নিবাস হলেও সেখানে এখন পরিবারের কেউ থাকেন না।

নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে চাঁদরাতেও যশোরে গ্রামের বাড়িতে ফোন করেছিলেন বহুল সমালোচিত ফেনীর সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। রংপুর থেকে করা সেই ফোনের পর পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেননি তিনি। ওসি মোয়াজ্জেমকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না–স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর রবিবার ( ৯ জুন) বিকালে যশোর শহরের চাঁচড়া ডালমিল রায়পাড়ায় তার পৈত্রিক বাড়িতে খোঁজ নিতে গেলে এ তথ্য জানান তার তৃতীয় ভাইয়ের স্ত্রী রেকসোনা খাতুন। তিনি আরও জানান, মাস ছয়েক আগে বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর পর আর বাড়িতে আসেননি মোয়াজ্জেম।

দ্বিতল এই বাড়িটিতে এখন কারা আছেন জানতে চাইলে রেকসোনা বলেন, ওসি মোয়াজ্জেমের ছোট দুই ভাই ও একমাত্র বিবাহিত বোন বর্তমানে মায়ের সঙ্গে এখানে থাকছেন। এখানে মোয়াজ্জেমের স্ত্রী-সন্তানদের কেউ থাকেন না।

তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ওসি মোয়াজ্জেমের বাবার নাম খন্দকার আনসার আলী। পাঁচ ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার এক ভাই সৌদি আরবে ও আরেক ভাই আমেরিকা প্রবাসী। মোয়াজ্জেম এই বাড়িতে থেকেই শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন। তবে চাকরিতে প্রবেশের পর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে তার।

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন (ফাইল ছবি)

রেকসোনা আরও জানান,  তার শ্বশুরের আদি বাড়ি ঝিনাইদহে। যশোর সদরের পুলেরহাটেও একটি বাড়ি আছে তাদের। তবে সেটা ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে বিচার প্রত্যাশায় স্থানীয় থানায় গেলে সহযোগিতার বদলে সে ঘটনা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে তাকে হয়রানি করেন ওসি মোয়াজ্জেম। তখন তিনি কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আসামিরা আরও সাহসী হয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করে।

যশোরে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ির সদর দরজা

এছাড়াও নুসরাত অগ্নিদগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন তখনও আসামিদের গ্রেফতার না করে মামলা দায়ের বিলম্বিত করার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে। ৮ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় কোনও আসামি ছাড় পাবে না ঘোষণা দিলে ওসি মোয়াজ্জেমের ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ সামনে চলে আসে। এরপর গত ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা দায়ের করেন। ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

যশোরে ওসি মোয়াজ্জেমের দোতলা এই পৈত্রিক বাড়িতে থাকেন তার পরিবার সদস্যরা

ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের পর আদালতে মামলার বাদী তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘নুসরাত হত্যাকাণ্ড বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন ওই মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। একই অভিযোগে গত ২৭ মার্চ নুসরাতের মা ওই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ওই দিনই সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর নুসরাতকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নুসরাতকে জেরা করাসহ তা ভিডিওতে ধারণ করেন। পরে ওই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সারাবিশ্বের মানুষ দেখেছে। যদি নুসরাত বেঁচে থাকতেন, তাহলে এরকম ঘটনার পর তার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যেতো। থানার একজন ওসির রুমে একজন ভিকটিমকে এভাবে জেরা করা ও ভিডিও ধারণ করে সম্প্রচার করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধ।’

তবে এরপরেও চাকরিতে বহাল ছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম। ফেনীর সোনাগাজী থানা থেকে তাকে প্রত্যাহার করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং রংপুর রেঞ্জে তাকে সংযুক্ত করা হয়। রংপুর রেঞ্জে যোগ দিলেও ঈদের পর তাকে আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। 

 

/টিএন/

x