নওগাঁয় বাড়ছে আম চাষ, কমছে আবাদি জমি

আব্দুর রউফ পাভেল, নওগাঁ ১১:১০ , জুন ১২ , ২০১৯

নওগাঁয় আম চাষ বাড়ছে

আম চাষের দিক দিয়ে নওগাঁ এরই মধ্যে রাজশাহী বিভাগের অনেক জেলাকে ছাড়িয়ে গেছে। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নওগাঁর জমিগুলো এক ফসলি। শুধু বর্ষায় আমন ধান চাষ করা হয়। বাকি সময় জমিগুলো পতিত থাকে। এ কারণে কৃষকরা ধান চাষের চেয়ে আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। আম চাষ লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আমবাগান করছেন কৃষকরা। অন্যদিকে এঁটেল মাটি হওয়ার কারণে এখানকার আমও সুস্বাদু। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এ বছর জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। এ বছর আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ টন। সাত বছর আগেও নওগাঁয় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। জেলায় নাকফজলি, ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষিরসাপাত, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১ ও গৌড়মতি জাতের আম চাষ করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে নওগাঁর নাকফজলি আম অন্য জেলাতেও পরিচিতি পেয়েছে। নাকফজলি আম বিশেষ করে বদলগাছী, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে। এই আম ১০-১২ বছর আগে প্রথমে বদলগাছীতে চাষ শুরু হলেও বর্তমানে পত্নীতলা ও ধামইরহাটেও চাষ হচ্ছে।

বদলগাছী উপজেলার কোলা গ্রামের আমচাষি আলতাফ হোসেন বলেন, ‘১০-১২ বছর আগে নাকফজলি আম চাষ শুরু করি। দেখতে নাকের মতন বলে এই আমকে নাকফজলি বলা হয়। বাজারে এই আমের দাম ভালো পাওয়া যায়।’

বদলগাছী হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-সহকারী উদ্যান কর্মকর্তা আব্দুল করিম জানান, এই উদ্যানের নাকফজলি, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাংগো, বারি-৪, ১১, থাই-বোরো মাসি, আম্রপালি, চোষা, তোতাকরি, সূর্যমুখী আম উল্লেখযোগ্য। তবে এখানে নাকফজলি আম সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ আম খেতে সুস্বাদু ও আঁশ কম। এছাড়া অন্য আমের তুলনায় কম পচনশীল। বাজারেও চাহিদা বেশি থাকায় চাষিরা নাকফজলি আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

পত্নীতলার আমচাষি সুলতান আলম বলেন, ‘আমি আগে ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করতাম। এখন সেখানে নাকফজলি আমের বাগান করেছি। বাজারে এ আমের চাহিদা বেশি। এ আম মণপ্রতি ২৬০০-২৮০০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় লাভও বেশি হয়।’

নওগাঁ আম চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে

পত্নীতলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘নাকফজলি আমের গুণাগুণের কারণে কৃষকরা এ আম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ আম কম পচনশীল হওয়ায় কৃষকদের ফরমালিন ব্যবহারের ঝুঁকি নিতে হয় না। এছাড়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকেও সহযোগিতা করা হয়। এ কারণে উপজেলার প্রায় ৬শ’ হেক্টর জমিতে নাকফজলি আম চাষ করা হচ্ছে। আগামীতে এই আম চাষের পরিমাণ আরও বাড়বে। জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর,পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলায় অনেক আম বাগান হয়েছে। এসব এলাকার জমিতে বছরের একটি মাত্র ফসল হয়। ফসলের জন্য বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হয়। পানি স্বল্পতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় জমিগুলো পতিত পড়ে থাকে। এছাড়া ধান চাষে খরচও বেশি। অপরদিকে আম চাষে লাভ বেশি, কিন্তু খরচ কম। তাই কৃষকরা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তাই প্রতিবছরই প্রায় ২ হাজার হেক্টর ধানের জমি কমছে।’

নওগাঁর সাপাহার উপজেলার আমচাষি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আমরা আমের নায্য দাম পাচ্ছি না। তাছাড়া আমাদের আমকে তারা নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে আলাদাভাবে নওগাঁর আমের বাজার গড়ে উঠছে না। এ কারণে চাষিরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’

সাপাহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের তছলিম উদ্দীন বলেন, ‘আগে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষিরসাপাত, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ জাতের আম চাষ করতাম। বর্তমানে উন্নত জাতের আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১ জাতের আম চাষ করছি। সাধারণ জাতের চেয়ে আম্রপালি ও বারি-৪ জাতের আম দ্বিগুণ উৎপাদন হয়। দামও বেশি পাওয়া যায়। কোনও ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ছাড়াই আম বাজারজাত করা হয়। তবে এখানে কোনও হিমাগার না থাকায় আমরা আমের নায্যমূল্য পাচ্ছি না।’

সাপাহার উপজেলা আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, ‘সাপাহার বাজারে নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার, পত্নীতলা উপজেলার আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা আম বিক্রি করে থাকেন। চলতি বছর প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হবে। তবে বাইরের ব্যবসায়ীরা এখানকার আমের বাজার অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা নওগাঁর আম বলেই গ্রাহকের কাছে বিক্রি করি।’

সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এই উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান করা হয়েছে। এই আম বাগানে শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আমরা নওগাঁর আমকে সারাদেশে পরিচিতি করানোর চেষ্টা করছি।’

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রঞ্জিত কুমার মল্লিক বলেন, ‘জেলায় প্রতিবছর শত শত টন আম উৎপাদন হলেও পাইকারি বাজার না থাকায় আমচাষিরা কম মূল্যে বিক্রি করে দেন। আমচাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে সব সময় পরামর্শ দেওয়ায় চলতি বছর জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। মাটির কারণে স্বাদে-গুণে নওগাঁর আম, বিশেষ করে পোরশার আমের তুলনা হয় না। যেভাবে আম বাগান গড়ে উঠছে, তাতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলেছে। তবে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় চাষিরা নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

 

/জেবি/এমএমজে/

x