থানায় ডেকে এনে রক্তাক্ত জখম, চার পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

বগুড়া প্রতিনিধি ২০:১৫ , জুন ১৫ , ২০১৯

সোহান বাবু আদর বগুড়া সদর থানা পুলিশের চার সদস্যের বিরুদ্ধে এক তরুণকে থানায় এনে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। তার নাম সোহান বাবু আদর (৩২)। বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) রাত ১১টায় থানায় ডেকে শুক্রবার (১৪ জুন) রাত ১২টায় তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদিকে এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরে তাদের পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করা হয়। শনিবার (১৫ জুন) সন্ধ্যায় পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সোহান বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক)  হাসপাতালের সার্জারি (পুরুষ) বিভাগে চিকিৎসাধীন। তিনি বগুড়া শহরের সুলতানগঞ্জপাড়া উটের মোড় এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে।

সোহান বাবু আদরের অভিযোগ, কনস্টেবল এনামুল ১৩ জুন রাত ১১টার দিকে ফোন দিয়ে তাকে থানায় যেতে বলেন। থানায় গেলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও চড়থাপ্পড় দিয়ে লকআপে ঢোকানো হয়। ১৪ জুন দুপুর ১২টার দিকে তাকে অফিসারদের কক্ষে নেওয়া হয়। পিলারের সঙ্গে হ্যান্ডকাপ দিয়ে হাত বেঁধে ফেলা হয়। হাতে যাতে কোনও দাগ না পড়ে, সেজন্য হ্যান্ডকাপের নিচে তুলা দেওয়া হয়। এরপর এসআই জব্বার, এএসআই এরশাদ আলী ও মুন্সী (কনস্টেবল) এনামুল লাঠি দিয়ে তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত এক ঘণ্টা ধরে মারধর করেন। এ সময় তার শ্বাসকষ্ট হলেও ইনহেলার নিতে দেওয়া হয়নি। মারধরের একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর তাকে মেঝেতে চিৎ করে শুইয়ে রাখা হয়। পরে কিছুটা সুস্থ হলে তাকে লকআপে ঢোকানো হয়। খবর পেয়ে তার বাবা সাইদুর রহমান, স্ত্রী পাপিয়া ও বোন শম্পা এলে মুক্তির বিনিময়ে এসআই জাব্বার ২০ হাজার টাকা দাবি করেন।

সোহান বাবু আদরের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হয়ে পুলিশকে নগদ ১০ হাজার টাকা দেন ও একজনকে ১০ হাজার টাকা জামিনদার করেন। এরপর আদর সুস্থ আছেন মর্মে বাবা, স্ত্রী ও বোনের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ১৪ জুন রাত ১২টার দিকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। স্বজনরা রাত ১টা ৫৫ মিনিটে তাকে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের তৃতীয় তলায় সার্জারি বিভাগে ভর্তি করান।

সোহান জানান, শহরের কাটনারপাড়া আলোরমেলা স্কুল লেনের সাথী বানুর (৪৮) সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি তাকে ধর্মের ছেলে করেন। একই এলাকার তার বন্ধু বাপ্পী (৩১) রমজানের আগে সাথী বানুকে বিয়ে করেন। বন্ধু তার ধর্ম মাকে বিয়ে করায় তিনি মেনে নিতে পারেননি। এতে তাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এ কারণে বাপ্পী ও সাথী তার ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সদর থানার মুন্সী কনস্টেবল এনামুলের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্নভাবে সাথীর সু-সম্পর্ক রয়েছে। এ সুযোগে সাথী ও বাপ্পী তার (আদর) বিরুদ্ধে সদর থানায় ১১ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ ও সাথীর মেয়ে সুচনাকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ দেন।

সোহান আগে ইলেকট্রিক সামগ্রীর ব্যবসা করতেন। পরে ধর্ম মা সাথী ও বন্ধু বাপ্পীকে নিয়ে শহরের গোয়ালগাড়ি এলাকায় আলফালা বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি ঋণদান সমিতি শুরু করেন। এখানে আদর ৪০ শতাংশ, সাথী ৩০ শতাংশ ও বাপ্পী ৩০ শতাংশের অংশীদার। আদর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে সাথীকে কয়েকটি চেকও দেন।

বগুড়া সদর থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান জানান, তিনি ঘটনাটি মীমাংসা করে দিয়েছেন, তবে কাউকে মারধরের ঘটনা তার জানা নেই।

সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘জরুরি কাজে এসপি রাজশাহী আছেন। তিনি এলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সদর থানার এসআই আবদুল জব্বার জানান, তিনি ঘটনার সময় থানায় ছিলেন না। তাই আদর নামে কাউকে নির্যাতনের প্রশ্নই ওঠে না।

এএসআই এরশাদ আলী জানান, তিনি একই রুমে বসলেও ঘটনার সময় ছিলেন না। তাই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সত্য নয়।

মুন্সী কনস্টেবল এনামুল হক জানান, সোহান বাবু আদরের বিরুদ্ধে ১১ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ ও সাথী বানুর মেয়েকে শ্লীলতাহানির লিখিত অভিযোগ আছে। তিনি আদরকে ফোনে থানায় ডেকে আনলেও শুধু চড় থাপ্পড় দিয়েছেন।

এএসআই নিয়ামত উল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাশেদ আহমেদ বাপ্পী জানান, আদর তার বন্ধু হয়। তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু, তাকে থানায় নিয়ে নির্যাতনের বিষয়ে কিছু জানা নেই।

আদর ও তার পরিবারের সদস্যরা জড়িত পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।

এদিকে এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরে তাদের পুলিশ লাইন্সে ক্লোজ করা হয়। শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বরখাস্ত পুলিশ সদস্যরা হলো- বগুড়া সদর থানার এসআই আবদুল জব্বার, এএসআই এরশাদ আলী, এএসআই নিয়ামত উল্লাহ ও মুন্সী (কনস্টেবল) এনামুল হক।

বগুড়া সদর থানার ওসি এসএম বদিউজ্জামান জানান, প্রাথমিক তদন্তে থানায় এক যুবককে নির্যাতনের সত্যতা পাওয়া গেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে এর দায় এড়াতে পারিনা। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করি। এ ঘটনায় জড়িত চার জনের নাম আসায় পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজের নির্দেশ দেন।

 

/এনআই/

x