যেভাবে বিচারকের সামনে আসামিকে হত্যা

মাসুদ আলম, কুমিল্লা ১৯:২৯ , জুলাই ১৫ , ২০১৯

হত্যাকারী হাসানঅন্যান্য দিনের মতোই কাজ শুরু হয়েছিল কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। শুনানির তারিখ অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (তৃতীয়) আদালতে ছয় বছর আগের একটি হত্যা মামলার জামিনে থাকা তিন আসামি হাজির হয়। সোমবার (১৫ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে বিচারক এজলাসে আসেন। চেয়ারে বসে মামলার কাগজপত্র হাতে নেন। ঠিক ওই সময় মামলার চার নম্বর আসামি ফারুককে ছুরিকাঘাত করে ছয় নম্বর আসামি হাসান। জীবন বাঁচাতে ফারুক এজলাসে উঠে পড়েন, বিচারকসহ আইনজীবীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। দৌড়াতে থাকে ফারুকও। বিচারকের খাস কামরার দিকে ছুটে যান তিনি। পেছন পেছনে দৌড়ে আসে হাসানও। এসে ফারুককে বিচারকের টেবিলের ওপর ফেলেই ছুরিকাঘাতে হত্যা করে হাসান। আদালতে অন্য একটি মামলার হাজিরা দিতে আসা কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ এগিয়ে গিয়ে হাসানকে আটক করেন। এভাবেই পুরো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিলেন কুমিল্লার অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) নুরুল ইসলাম।

এই ঘটনার পর বিচারক, আইনজীবী, আদালতপাড়াসহ পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানান এপিপি। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।    বিচারকের এই টেবিলেই আসামিকে হত্যা করা হয়হত্যাকারী হাসান ও নিহত ফারুক একই মামলার আসামি ও  সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। নিহত ফারুক কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের অহিদ উল্লাহর ছেলে। ঘাতক হাসান কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার ভোজপাড়া গ্রামের শহিদ উল্লাহর ছেলে।

এপিপি নুরুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দি গ্রামে হাজী আবদুল করিম হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার ওই মামলার জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার দিন ধার্য ছিল। এ মামলার ফারুক ও হাসানসহ তিন আসামি আদালতে হাজির হয়। বাকি পাঁচ আসামি পলাতক। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী না থাকায় সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। তবে, বিচারক কাজ শুরুর আগেই চোখের পলকে হত্যাকাণ্ড ঘটে যায়। তিনি বলেন, ‘আদালতের ভেতরে থাকা দুই-তিনজন পুলিশ চেষ্টা করলে অভিযুক্তকে আটকাতে পারতেন। কিন্তু তাদের কোনও ভূমিকাই ছিল না।’ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার

কী কারণে হত্যা

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ নেওয়াজ সুলতানা বলেন, ‘সম্পত্তির বিরোধ নিয়ে ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দি গ্রামে হাজী আবদুল করিমকে হত্যা করা হয়। আবদুল করিম আসামি হাসানের নানা। নিহত ফারুকের দাদা। হত্যাকাণ্ডের পরই একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলার চার নম্বর আসামি ছিল ফারুক। ২০১৫ সালে মামলার চার্জশিট হওয়ার সময় ফারুকের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হাসানের নাম ওঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ওই মামলায় হাসানকে ছয় নম্বর আসামি করা হয়।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘ফারুকের উদ্দেশে হাসান বলে, তোর কারণে আসামি হয়েছি। এ কথা বলার পরই ফারুককে ছুরিকাঘাত করে হাসান। এতে বোঝা যায়, ফারুক কেন জবানবন্দিতে হাসানের নাম বলেছে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রতি হাজিরায় দেখতাম তারা একসঙ্গে এসে হাজিরা দিয়ে আবার চলে যায়। কখনও এমন বিরোধের কথা শুনিনি। তাদের মধ্যে অন্য কোনও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কিনা, আমি বলতে পারবো না।’

কুমিল্লা আদালতে আসামিকে হত্যা

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা

কাঠগড়া ও এজলাস অতিক্রম করে বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে আসামি হত্যার ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি অভিযোগ উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও। এ প্রসঙ্গে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতে বিচারপ্রার্থীসহ সবার নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকে। জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে শুরু করে ১৭ উপজেলার পৃথক প্রত্যেকটি আদালতে দুই থেকে তিন জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। আসামি আনা-নেওয়াই তাদের কাজ। আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করে। সবার নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের জনবল সংকট রয়েছে।’

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সমস্যা রয়েছে। সেই বিষয়গুলোসহ অন্যান্য সমস্যা জেলা জজের সঙ্গে বসে মীমাংসা করা হবে। এছাড়া, আদালতে কীভাবে আরও নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, সেই বিষয়েও কথা হবে।’ কুমিল্লা আদালতে আসামিকে হত্যা

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে বিচারকও

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে খোদ বিচারকের মনেও। এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো আমি খাস কামরা থেকে এজলাসে উঠে বিচার কাজ পরিচালনা করি। আজ সকাল ১১টায় এজলাসে উঠে আমি ওই হত্যা মামলাটির কাগজপত্র হাতে নিই। ঠিক ওই সময় চিৎকার শুরু হয় বাঁচাও বাঁচাও করে। এমন সময় দেখতে পেলাম একজন অন্যজনকে ধাওয়া করছে। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীসহ সবার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এরপর দেখলাম আমার খাস কামরায় ঢুকে এক আসামি অন্য আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করছে। এই হত্যার শিকার আমি, আমার কোনও সহযোগী বা কোনও আইনজীবীও হতে পারতেন। আমরা আসলেই নিরাপত্তায়হীনতায় আছি। আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’

কুমিল্লা আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘বিচারকের খাস কামরায় গিয়ে এক আসামিকে অন্য আসামির ছুরিকাঘাতে হত্যার বিষয়টিকে দুর্ঘটনাই মনে করি। আগে এ ধরনের কোনও কর্মকাণ্ড কুমিল্লা আদালতে ঘটেনি। তবে হঠাৎ করে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলবো কীভাবে আদালত প্রাঙ্গনে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো যায়।’

পুলিশের কমিটি

এই হত্যাকাণ্ড খতিয়ে দেখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের এই তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. সাখাওয়াত হোসেনকে। অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমন এবং ডিআইও-১ মাহবুব মোর্শেদ।

আরও পড়ুন- খাস কামরায় বিচারকের সামনে আসামিকে হত্যা

/এফএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

x