‘আদালতে কে এলো আর গেলো, পুলিশ তা আমলেই নেয় না’

মাসুদ আলম, কুমিল্লা ০১:৫৫ , জুলাই ১৬ , ২০১৯





বিচারকের এই টেবিলেই আসামিকে হত্যা করা হয়কুমিল্লার আদালত এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। বিচার চলাকালীন এজলাস অতিক্রম করে খাস কামরায় ঢুকে বিচারকের সামনে আসামিকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। তাদের অভিযোগ, আদালতে কে এলো আর কে গেলো, পুলিশ তা আমলেই নেয় না। নিরস্ত্র পুলিশ দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।






আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা জানান, প্রতিদিন ৫ হাজারের অধিক লোকের জনসমাগম হয় কুমিল্লা আদালতে। এখানে এক হাজারের অধিক আইনজীবী রয়েছেন। প্রতিদিন তাদের একাধিক মক্কেল আসেন।
তাদের অভিযোগ, আদালতে প্রবেশের তিনটি পথ রয়েছে। প্রথম গেটে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকলেও বিশেষ কোনও কারণ ছাড়া বসা থেকেই ওঠেন না তারা। কে এলো বা কে গেলো কোনও খোঁজই রাখেন না। আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সেইদিকেও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কোনও খোঁজখবর রাখেন না। এতে কুমিল্লার আদালত এলাকায় অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

আরও খবর: যেভাবে বিচারকের সামনে আসামিকে হত্যা


এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালত চলাকালীন এজলাস অতিক্রম করে বিচারকের খাস কামরায় হত্যা একটি নিজরবিহীন ঘটনা। আদালতে বিচারক, আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই চিত্র সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের। সরকারকে দেশের বিচার বিভাগের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
কুমিল্লা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মমিন ফেরদৌস বলেন, ‘আদালতে নিরাপত্তায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন তোলার উপযুক্ত কারণ রয়েছে। একটি আদালতে আসামি আনা-নেওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কমপক্ষে চারজন পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন। অথচ মাত্র একজন কিংবা দুই জন রাখা হয়। এছাড়া আদালত প্রাঙ্গণে যে পরিমাণ নিরস্ত্র পুলিশ সদস্য রয়েছে, তাও অপ্রতুল। প্রবেশ পথগুলোতে কোনও চেক হয় না। আদালত প্রাঙ্গণে নানা ঘটনাই ঘটে, সেইদিকে পুলিশের কোনও নজরই থাকে না। অবসরে যাওয়ার সময় এসেছে, এমন পুলিশ সদস্যদের আদালতের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হয়।’
আব্দুল মমিন ফেরদৌস আরও বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ যদি আদালতে প্রবেশের সময় আইনজীবীদেরও চেক করা প্রয়োজন মনে করে, সেই বিষয়েও আমরা একমত।’

আরও খবর: বিচারকের প্রশ্ন, আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?

জানতে চাইলে কুমিল্লা আদালতের পিপি জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘হঠাৎ করে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে আদালত প্রাঙ্গণে আরও নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশা করি।’

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসান এবং ফারুক নিয়মিত হাজিরা দিতে এসেছিল। তারা পুলিশের কোনও ধরনের হেফাজতে ছিল না। অন্য পাঁচ-দশজন মানুষ আদালতে যেভাবে আসেন, হাসান ও ফারুকও একইভাবেই এসেছিল। এই আদালতে প্রতিদিন ৫ হাজারের অধিক লোকের জনসমাগম হয়। এত লোকের মাঝে একজন ব্যক্তি নিজেকে আড়াল করে ছুরি নিয়ে প্রবেশ করা সহজ ব্যাপার। এখন থেকে আমরা আরও সতর্ক থাকবো। চেষ্টা করবো জেলা জজ, বিচারক এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে তারা যদি রাজি থাকেন, তাহলে আদালতে প্রবেশের সময় প্রত্যেককে চেক করা হবে।’


পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এজলাসে মক্কেলদের আইজীবীরাই ঢোকান, সেক্ষেত্রে আমরা শুধু বিচারকের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে দেখি। এছাড়া আসামি যদি পুলিশ হেফাজতে থাকে, সেই আসামি যেন পালিয়ে যেতে না পারে, সেই বিষয়টি দেখি। কিন্তু, আদালতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শরীর চেক করে ঢোকানোর কাজটা সাধারণত হয়ে ওঠে না।’
উল্লেখ্য, সোমবার কুমিল্লার আদালতে বিচার চলাকালীন এজলাস অতিক্রম করে খাস কামরায় ঢুকে বিচারকের সামনে এক আসামি অন্য আসামিকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দিগ্রামে হাজী আবদুল করিম হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার (১৫ জুলাই) ওই মামলার জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার দিন ধার্য ছিল। বেলা ১১টার দিকে এ মামলার আসামিরা আদালতে প্রবেশের সময় ৪ নম্বর আসামি ফারুককে ছুরি নিয়ে তাড়া করে ৬ নম্বর আসামি হাসান। জীবন বাঁচাতে ফারুক বিচারকের খাস কামরায় প্রবেশ করেন। পরে সেখানে হাসান প্রবেশ করে টেবিলের ওপর ফেলে ফারুককে ছুরিকাঘাত করে। একপর্যায়ে তাকে ওই কক্ষের মেঝেতে ফেলেও আঘাত করা হয়। তখন আদালতে অন্য একটি মামলার হাজিরা দিতে আসা কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ এগিয়ে গিয়ে হাসানকে আটক করে। এ সময় আদালত কক্ষে বিচারক, আইনজীবী ও অন্য আসামিদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই ভয়ে ছোটাছুটি করেন। গুরুতর আহত ফারুককে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরও খবর...




বিচারকের সামনে আসামি হত্যার ঘটনায় মামলা

 

/এনআই/এমএমজে/

x