খুলনা বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গু রোগী বেশি যশোরে

তৌহিদ জামান, যশোর ২০:২৭ , সেপ্টেম্বর ১১ , ২০১৯

যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তরাখুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও রোগীর সংখ্যা বেশি। খুলনা স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার হিসাব মতে বুধবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা পর্যন্ত পুরো বিভাগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ২১ জন। এরমধ্যে যশোরেই আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৯৫৭ জন। আর মারা গেছেন ছয় জন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে ঢাকার বাইরে কেন যশোরাঞ্চলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এত বেশি। এ বিষয়ে যশোরের চিকিৎসা ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, মূলত যশোরের তিনটি উপজেলায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা, যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ায় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুবিধা বেশি থাকায় রোগীরা ভিড় জমান বলে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেড়েছে।

বুধবার যশোর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২১ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৯৫৭জন। এরমধ্যে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৭৩৩ জন এবং গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ জন। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ছয় জন (অবশ্য, সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে এর সংখ্যা পাঁচ। এরমধ্যে ৭ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়িতে থাকা অবস্থায় মারা যাওয়া চৌগাছা উপজেলার ওয়াদুদের নাম নথিভুক্ত হয়নি)।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘এডিস মশার বংশবিস্তার মূলত আরবান এলাকায়। মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক এডিস মশা যশোর-খুলনা অঞ্চলে স্থানান্তর হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি যানবাহন বিশেষ করে ট্রেন, ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের মাধ্যমে হয়েছে। যশোর হচ্ছে যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেন যশোর ও খুলনায় আসে। সেখানে থাকা ফাঁকা বগিতে মানুষের সঙ্গে এডিস মশাও ট্রান্সফার হতে পারে। ট্রানজিট পয়েন্ট বিধায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি ভারত থেকেও যানবাহন এখানে আসে। ট্রাকের পেছনের অংশ যেখানে পানি জমতে পারে কিংবা গ্যারেজে থাকা পুরনো টায়ারেও এডিস মশার প্রজনন হয়ে থাকে। সে কারণে লোকালি ইনফেক্টেডও হচ্ছে বেশি। তাছাড়া যশোরে বেটার ট্রিটমেন্ট হওয়ার কারণে অনেক রোগী এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে থাকে। এটিও একটি কারণ হতে পারে।’

এ বিষয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু বলেন, প্রথমদিকে ঢাকা থেকেই আক্রান্ত রোগী বেশি আসে। মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত জলাবদ্ধতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, মশানিধনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব- ডেঙ্গু রোগী বেশি হওয়ার কারণ। তাছাড়া ভালো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কারণে যশোরের বাইরে মাগুরা, ঝিনাইদহ, নড়াইল এবং সাতক্ষীরা থেকেও রোগীরা যশোর জেনারেল হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসেন। আক্রান্ত রোগী ও এডিস মশার বিস্তারের কারণে এখন স্থানীয়রাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, তিনটি উপজেলায় (অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর) স্থায়ী জলাবদ্ধতা, যশোর এলাকা ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ায় এবং উন্নত চিকিৎসা সেবা নিতে হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন জেলার রোগীরা ভিড় করায় স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গু রোগী বেড়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে অতিসম্প্রতি থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এরফলে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত জলাবদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বড়ধরনের বৃষ্টি হলে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হতো না। তবে থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় সমস্যা বাড়ছে। জলাবদ্ধতা এডিস মশার প্রজননের পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

গত ২১ জুলাই নড়াইলের কুড়িগ্রাম এলাকার রোকসানা পারভীন রাণী (৫২) ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান। পরে ২৭ আগস্ট মণিরামপুর উপজেলার রাজবাড়ী এলাকার সেকেন্দার আলীর স্ত্রী রেবেকা খাতুন (৫৫) যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৩ সেপ্টেম্বর বাঘারপাড়া উপজেলার ভাঙ্গুড়া গ্রামের শাজাহান আলী বিশ্বাস (৭০) একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৭ সেপ্টেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার বাসিন্দা, আব্দুল ওয়াদুদ (৪৫) ঢাকা থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে এসে মারা যান (জেলা সিভিল সার্জন অফিস তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি)। পরে ৯ সেপ্টেম্বর যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমনগর এলাকার ইনসান আলীর স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৫) মৃত্যুবরণ করেন। ১১ সেপ্টেম্বর একই উপজেলার হানুয়ার এলাকার আব্দুল কাদের মোল্যার স্ত্রী মারা যান।

/টিটি/

x