বড় ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিচ্ছেন ছোট ভাই!

এনায়েত করিম বিজয়, টাঙ্গাইল ১০:৫৮ , নভেম্বর ০৫ , ২০১৯

খোরশেদ আলম খসরু ও নবাব আলীমুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলম খসরু ২৫ বছর ধরে প্যারালাইসজড হয়ে বিছানায়। আর এই সুযোগে খোরশেদের নাম ব্যবহার ও কার্ডে নিজের ছবি লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করছেন তার ছোট ভাই নবাব আলী। ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ফুলকী মধ্যপাড়া গ্রামে।
জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ ২৫ বছর ধরে প্যারালাইসড। বর্তমানে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। তিনি প্যারালাইসড হওয়ার পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধার ভাতা কার্ড পাবেন কিনা তা জানতে ছোট ভাই নবাব আলীকে খোঁজখবর নিতে বলতেন। এ কারণে খোরশেদ মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত কাগজপত্র দেন তার ছোট ভাইকে। ২০০০ সাল থেকে খোরশেদের নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কার্ড চালু হলেও নবাব বিষয়টি গোপন রাখেন। তিনি ওই কার্ডে নিজের ছবি লাগিয়ে ও নিজেকে খোরশেদ দাবি করে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করেন। কিন্তু বিষয়টি জানতেন না খোরশেদ।
৩ বছর আগে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে বয়স্ক ভাতা কার্ড করতে গিয়ে খোরশেদ তার নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কার্ড রয়েছে এমন তথ্য জানতে পারেন। পরে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে সমাজসেবা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান।
২০১৮ সালের এপ্রিলে খোরশেদ আলমের ছেলে মান্নান মিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তার চাচা নবাব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। ওই সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার (খোরশেদ আলম ) মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা স্থগিত করেন। এরপর প্রায় এক বছর ভাতা উত্তোলন স্থগিত থাকলেও রহস্যজনকভাবে আবার ভাতা চালু হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে খোরশেদ বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বাসাইল আমলি আদালতে মামলা দায়ের করেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আট ভাই-বোনের মধ্যে খোরশেদ তৃতীয় ও নবাব চতুর্থ। ন্যাশনাল ভোটার আইডি কার্ডসহ বিভিন্ন জরুরি কাগজপত্রে খোরশেদ ও নবাবের নাম রয়েছে আলাদা। স্থানীয় ফুলকি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কর্তৃক ওয়ারিশ সনদ ও প্রত্যয়নপত্রেও দেখা গেছে তারা পৃথক ব্যক্তি।
স্থানীয়রা জানান, খোরশেদ ও নবাব আপন দুই ভাই। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ওঠানোর বিষয় নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম বাবুলের উপস্থিতিতে এলাকায় একাধিকবার সালিশি বৈঠক হলেও সেখানে কোনও মীমাংসা হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জাহিদুল ইসলাম বাবুলের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
খোরশেদের স্ত্রী মরিয়ম বেগম বলেন, আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসড। মুক্তিযোদ্ধার ভাতা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য আমার দেবর নবাবের কাছে কাগজপত্র দেওয়া হয়। ভাতা হয়েছে কিনা বিষয়টি জানতে মাঝেমধ্যে নবাবের কাছে জিজ্ঞাসা করলেও তিনি এ সম্পর্কে কিছু জানাননি। প্রায় তিন বছর আগে আমার স্বামীর নামে বয়স্ক ভাতা কার্ড করতে গিয়ে জানতে পারি তার নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সমাজসেবা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এতেও কোনও কাজ হচ্ছে না। নবাব আলী এখনও আমার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করছে।’
খোরশেদ আলমের মেয়ে বিলকিস বেগম বলেন, ‘আমরা এ ঘটনায় চাচা নবাব আলীর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছি। এছাড়াও বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্ত তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় এখনও কোনও প্রতিকার পাচ্ছি না।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নবাব আলীর বাড়িতে গিয়ে তার ভোটার আইডি কার্ডসহ বিভিন্ন কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্র আমার মেয়ের জামাইয়ের কাছে রয়েছে। আপনারা কিছু জানতে চাইলে ইউএনও’র সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’ পরে তিনি দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামছুন নাহার স্বপ্না বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলমের নামে ভাতা চালু রয়েছে। ভাতাও উত্তোলিত হচ্ছে। তবে তার পরিবার অভিযোগ করেন, নবাব আলী প্রতারণা করে সেই ভাতা উত্তোলন করছেন। পরে বিষয়টি নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সমাজসেবা অধিদফতরের তদন্তে উঠে আসে খোরশেদ ও নবাব একই ব্যক্তি।’
এদিকে আদালতের নির্দেশে পিবিআই খোরশেদ আলমের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করে। তদন্ত শেষে পিবিআইয়ের এসআই ফরিদ আহমেদ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন- খোরশেদ আলম ও নবাব আলী একই ব্যক্তি নন। খোরশেদ আলমের আপন ছোট ভাই নবাব আলী।

/এআর/

x