যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ায় খুন হন গণজাগরণ মঞ্চের বাবু

বগুড়া প্রতিনিধি ১৭:৪০ , ফেব্রুয়ারি ২০ , ২০১৬

ইনসেটে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু ও গ্রেফতার হওয়া শিবির ক্যাডাররাবগুড়া জেলা সেক্টরস কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক, গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু (৪৭) হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিচারের প্রতিশোধ নিতেই বাবুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন শিবিরের নেতাকর্মীরা।
গ্রেফতারকৃত তিন শিবির ক্যাডারের একজন পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন। শনিবার বিকালে তাদের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।
গ্রেফতার শিবির ক্যাডাররা হলেন বগুড়ার সারিয়াকান্দির নারচি তরফদারপাড়ার মাইনুর ইসলাম ফকির (২১), শিবগঞ্জের সাতআনা কিচক গ্রামের সরকারি আযিজুল হক কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র মহসিন আলী (২১) এবং বগুড়া শহরের সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা ঢাকার একটি বেসরকারি কলেজের ছাত্র হাবিবুল্লাহ নাঈম (১৯)। শুক্রবার রাতে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
শনিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে সদর থানার পেছনে সেলিম হোটেলের সামনে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও একটি কলেজের প্রভাষক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবু খুন হন। নিহতের ছোট ভাই সামছুদ্দিন সোলায়মান সাধু সদর থানায় অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। গোপনে খবরের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মন্ডল ও ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে শহরের চকসুত্রাপুর, সবুজবাগ ও জামিলনগরে অভিযান চালান। তারা মূল ঘাতক মাইনুর ইসলাম ফকির এবং তার দুই সহযোগী মহসিন আলী ও হাবিবুল্লাহ নাঈমকে গ্রেফতার করেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাইনুর জানান, মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারে গণজাগরণ মঞ্চ সমর্থন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ শিবিরের শীর্ষ নেতারা মঞ্চ নেতা জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ঘটনার দিন বিকালে তার আশ্রয়দাতা সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিবিরের এক শীর্ষ নেতা তাকে (মাইনুর) জামিলনগর মোড়ে ডেকে পাঠান। শিবিরের দুই শীর্ষ নেতা গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানান। পরিকল্পনা অনুসারে শিবির কর্মী মহসিন আলী ও হাবিবুল্লাহ নাঈম বাইক নিয়ে শহরের সাতমাথা থেকে থানা মোড়, সেলিম হোটেল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের টহল দেখতে আসেন। এসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি নেই নিশ্চিত করলে দুই শীর্ষ শিবির নেতার নেতৃত্বে ৪টি বাইকে ৭-৮ জন সহযোগী একটি ককটেল ভর্তি ব্যাগ ও কয়েকটি ধারালো অস্ত্র নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে সদর থানার পেছনে সেলিম হোটেলের সামনে আসেন। শিবিরের এক নেতা মাইনুরকে নেশা জাতীয় ট্যাবলেট খাইয়ে তার হাতে একটি চাকু তুলে দেন। হোটেলের পাশে তৃপ্তি প্রেসে থাকা জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুর অবস্থান নিশ্চিত করতে মহসিন ও নাঈম সেখানে যান। তারা ভিজিটিং কার্ড ছাপানোর জন্য প্রেসের মালিক গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক মাছুদুর রহমান হেলালের সঙ্গে কথা বলে বের হয়ে আসেন। রাত ৯টার দিকে ভিকটিম প্রভাষক বাবু পান খাওয়ার জন্য প্রেস থেকে সেলিম হোটেলের সামনে আসলে অনুসরণকারী এক শিবির নেতা তার গালে থাপ্পড় দেন। তিনি তাকে হত্যা করতে মাইনুরকে নির্দেশ দেন। মাইনুর প্রথমে তার (বাবু) পাজর ও পরে কানের নিচে চাকু ঢুকিয়ে দেন। বাবু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে শিবিরের অন্য নেতাকর্মীরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে শিবির নেতারা মাইনুরকে তিন হাজার টাকা দিয়ে এক মাসের জন্য শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেন। এছাড়া বাবুকে হত্যার পুরস্কার হিসেবে তাকে জামিলনগরে একটি বাড়ি দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও হত্যায় অংশ নেওয়া অন্য শিবির নেতাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি পুলিশ সুপার।

বগুড়া ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর আমিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত তিন শিবির সন্ত্রাসীকে শনিবার বিকালে ১০ দিন করে রিমান্ড চেয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে মূল ঘাতক মাইনুরের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিকালে এ খবর পাঠানো পর্যন্ত তাদের রিমান্ড মঞ্জুর হয়নি।

নিহতের স্ত্রী বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ আলোর নির্বাহী পরিচালক ফেরদৌসী বেগম জানান, হত্যার পরিকল্পনাকারী জামায়াত-শিবিরের নেতারা গ্রেফতার হলে তিনি শান্তি পাবেন। তিনি অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার দাবি জানান।

/বিটি/এসএম/টিএন/

x