২০১৮: প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি নতুন বছরে মুক্ত হবে নতুন চমক!

জনি হক ১৭:০১ , ডিসেম্বর ২৯ , ২০১৭

২০১৬ সালে লোকার্নো ওপেন ডোর্সের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, পিয়াতজা গ্রান্দায় সম্মাননা। এ বছর (২০১৭) বার্লিন থেকে ডব্লিউসিএফ, কানের সিনেফঁদাসিউতে নিমন্ত্রণ। চলছে নতুন ৩টি ছবির প্রি-প্রোডাকশন, শুটিং, এডিটিং— এই নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন। মূলত নির্মাণাধীন নতুন ছবির প্রসঙ্গ নিয়েই তার সঙ্গে আলাপ হলো বাংলা ট্রিবিউনের। কথা কথায় উঠে এসেছে আসছে বছরে (২০১৮) তার প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতির গল্প।
‘শিকলবাহা`র সেটে কামার আহমাদ সাইমন

বাংলা ট্রিবিউন: জানা গেছে নতুন ছবির শুটিং শুরু করছেন, এটা কোন ছবি?

কামার আহমাদ সাইমন: ইংরেজি নামটা অনেকেই শুনেছেন আগে— ‘ডে আফটার টুমরো’। এর বাংলা নাম ‘অন্যদিন…’। এটা আমার ওয়াটার ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবি। আগেরটি ছিল ‘শুনতে কি পাও!’। ‘অন্যদিন…’-এর পর হবে ‘আরও কিছু জীবন’। আসলে ‘অন্যদিন…’ ছবিটার প্রি-প্রোডাকশন করে রেখেছিলাম অনেকদিন আগেই। ইডফা আর সানড্যান্সের মতো উৎসব থেকে গ্রান্ট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম ২০১৩ সালেই। কিন্তু ‘শুনতে কি পাও!’র পরিবেশনা আর ‘শিকলবাহা’র প্রস্তুতিতে বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল ‘অন্যদিন…’।
এ বছর কানের সিনেফঁদাসিউতে যখন স্ক্রিপ্টটা আমন্ত্রণ পেলো তখন থেকেই ভাবছিলাম শুটিংয়ের কথা। তাছাড়া গত বছর লোকার্নোর ওপেন ডোর্সে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার আর আর্তে ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ পাওয়ার পর থেকে একটু চাপেও ছিলাম। ওরা পিয়াতজা গ্রান্দার মতো বিশ্ব চলচ্চিত্র মঞ্চে সম্মানিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু ছবির মূল ভাবনাটাও অনলাইনে পাবলিক করে দিয়েছিল তার আগেই।
বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে ‘শিকলবাহা’র শুটিং কবে শুরু হচ্ছে?
কামার আহমাদ সাইমন: এবার বার্লিন থেকে ডব্লিউসিএফ দেওয়ার পর থেকে একটু চাপে আছি। তবু ‘শিকলবাহা’র শুটিং শুরু হতে আরেকটু সময় লাগবে। সময় নিলেই ভালো হবে না জানি। কিন্তু ভালো ছবির কাজে একটু সময় লাগবেই। একে তো চটকদার কোনও গল্প নয়, তার ওপর কোনও চেনা মুখ নিতে চাচ্ছি না। তাই কাস্টিংটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ! গত দুই বছর থিয়েটারে কতগুলো নাটক দেখেছে সারা (প্রযোজক সারা আফরীন) জানি না। ফেসবুকে হাজার হাজার প্রোফাইল ঘেঁটেছে আমার সহকারীরা। কিন্তু পছন্দ হচ্ছে না কাউকেই! আমি অচেনা মুখ চাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু একটা ডিস্টিংশন লাগবে। যেমন ‘শুনতে কি পাও!’র সৌমেন-রাখীর মতো জীবন থেকে নেয়া। মানে স্টারের চাইতেও বেশি কিছু!
বাংলা ট্রিবিউন: শুধু কাস্টিং না, লোকেশনও বড় ফ্যাক্টর নয় কি?
কামার আহমাদ সাইমন: অবশ্যই। ‘শিকলবাহা’র জন্য একটা নির্দিষ্ট চরিত্রের পুরনো বাড়ি খুঁজছিলাম, অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেই বাড়িটা যখন পাওয়া গেলো, গাছ-গাছালি আমার পছন্দ হলো না। গেলো বর্ষায় প্রায় শ’দুয়েক গাছ লাগিয়েছি ওই বাড়িতে। শিল্পী সাইদুল হক জুইস ডিজাইন করছেন সেটটি। আমার ফরাসি প্রযোজককে নিয়ে গিয়েছিলাম নভেম্বরে। গাছগুলা বেড়ে একটা বেশ জংলী চেহারা নিয়েছে। আশা করছি, আগামী বর্ষায় শুটিংয়ের জন্য রেডি হয়ে যাবে। আমি আসলে সিনেমার বাণিজ্যটা বুঝি না, তাই সিনেমা উদযাপনের চেয়ে সিনেমাযাপন করতেই বেশি ভালোবাসি!
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার ফরাসি প্রযোজকের ঢাকায় আসা প্রসঙ্গে বলুন।
কামার আহমাদ সাইমন: গত মাসে মানে নভেম্বরে ঢাকায় এসেছিলেন আমার ছবির ফরাসি প্রযোজক ডমিনিক ওয়েলেন্সকি। কানে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে ওপেনিং সেগমেন্ট ‘ফ্যাক্টরি’র মাস্টারমাইন্ড তিনি। ‘মাটির ময়না’র সময় ফরাসি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘এম কে টু’র পক্ষ থেকে ডেলিগেট প্রডিউসারও ছিলেন ডমিনিক।
অনেকেই একটা ঘটনা জানেন না, এই ডমিনিকই কিন্তু তারেক মাসুদকে ভালোবেসে ‘এম কে টু’র কাউকে না জানিয়ে অফিশিয়াল প্যাডে ‘মাটির ময়না’র যৌথ-ফরাসি প্রযোজক হিসেবে চিঠি দিয়েছিলেন! তাই বাংলাদেশের অন্য এক মানে আছে তার কাছে। তাকে নিয়ে ঘুরেছি মানিকগঞ্জ থেকে মোড়েলগঞ্জে। ‘শিকলবাহা’ বা ‘অন্যদিন…’— দুই ছবিরই লোকেশনে।
‘শিকলবাহা`র জন্য নিজেদের বানানো জঙ্গলে শিল্পী সাইদুল হক জুইসের সঙ্গে কামার আহমাদ সাইমন ও ফরাসি প্রযোজক ডমিনিক ওয়েলেন্সকিবাংলা ট্রিবিউন: তাহলে ২০১৮’তে ‘শিকলবাহা’ বা ‘অন্যদিন…’ মুক্তি পাচ্ছে?
কামার আহমাদ সাইমন: এখন ‘অন্যদিন…’-এর শুটিং করছি টানা। একটু লম্বা সময় চলবে শুটিং। ‘শুনতে কি পাও!’র শুটিং করেছিলাম প্রায় ২০ মাস। ‘অন্যদিন…’ অন্তত ১০ মাস শুট করার ইচ্ছে আছে। পাশাপাশি চলছে ‘শিকলবাহা’র কাজ। কিন্তু এর কোনওটাই ২০১৮’তে রেডি হবে না।

নতুন বছরে মুক্ত হবে নতুন চমক! মজার ব্যাপার হলো, গত দুই বছরে অন্য একটা ছবির শুটিং শেষ করেছি একরকম কাউকে না জানিয়েই! গত মাসেই কলকাতা থেকে ফিরলাম সেটার ড্রাফট এডিট শেষ করে। আশা করছি, মে-জুনের মধ্যে হয়ে যাবে ফাইনাল এডিট আর পোস্টের কাজ। সব ঠিক থাকলে এই নতুন ছবি মুক্তি পাবে নতুন বছরে। এর বেশি আর এখন বলবো না। এজন্য আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে!
বাংলা ট্রিবিউন: একটা নতুন ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে আমাদের সিনেমায়…
কামার আহমাদ সাইমন: আসলে বাংলাদেশে পোস্ট-৭১ জেনারেশনের একটা নতুন ওয়েভ দেখা যাচ্ছে ২০১২ থেকে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, গত বছর লোকার্নোর ওপেন ডোর্সে ছয়টি কাহিনিচিত্র ছিল, এর তিনটাই ২০১২’র বা তার পরে বানানো বাংলাদেশের ছবি। উদ্বোধনী ছবি ছিল ‘শুনতে কি পাও!’, বাংলাদেশের অন্য দুটি কাহিনিচিত্র হলো ‘টেলিভিশন’ (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী) ও ‘আন্ডার কন্সট্রাকশন’ (রুবাইয়াত হোসেন)।
এছাড়া গত কয়েক বছরে আলোচিত ছবি যেমন ‘আয়নাবাজি’ (অমিতাভ রেজা), ‘জালালের গল্প’ (আবু শাহেদ ইমন), ‘ঢাকা লাইভ’ (আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ), ‘মাটির প্রজার দেশে’ (বিজন সরকার), এমনকি হালের ‘ঢাকা অ্যাটাক’ (দীপঙ্কর দীপন) বা ‘গহীন বালুচর’ (বদরুল আনাম সৌদ)— এইসব ছবিই কিন্তু ২০১২ সালের পরে বানানো পোস্ট-৭১ জেনারেশনের ছবি। আসলে অনেকেই অনেকভাবে চেষ্টা করছেন, নানান রকম ছবিও তৈরি হচ্ছে। মুক্ত আর বাণিজ্যিক সিনেমার মাঝখানের শূন্যস্থানে একটা ইতিবাচক ভাইব্রেশন হচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: ২০১৮’র জন্য আপনার আশাবাদ কেমন?
কামার আহমাদ সাইমন: এই সময়ের একটা খুব ইতিবাচক দিক হলো, নতুন একটা প্রজন্ম উঠে আসছে। ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়ে সরাসরি বিশ্ব চলচ্চিত্র দেখে নিজেদের চোখ তৈরি করছেন, স্বশিক্ষিত হওয়ার চেষ্টা করছেন, বাইরে পড়তে যাচ্ছেন, দেখতে যাচ্ছেন তারা। কলকাতা ও কানের পার্থক্য তারা বোঝে, বার্লিনের সঙ্গে বুসানকে গুলিয়ে ফেলে না। বয়সে যদিও তারা খুবই তরুণ, কিন্তু সূর্যসেন হওয়ার জন্য তো ৪০ বছরের হওয়া লাগে না। সুকান্ত হওয়ার জন্য ২১’ই যথেষ্ট! আমার আশা— তারা নিজের ছাড়া কারও দাসত্ব করবে না। উৎসব আর ফেসবুক লাইকের বাইরে শুধু সিনেমার বন্দেগি করবে, দিওয়ানা হবে, পাগল হবে! নিখাদ পাগল!ফরাসি প্রযোজক ডমিনিক ওয়েলেন্সকি`র সঙ্গে কামার আহমাদ সাইমন ও প্রযোজক সারা আফরীন

/এমএম/

x