কান কথা- দশ মেয়রের আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজ, মন জুড়ানো প্রকৃতি

জনি হক, কান (ফ্রান্স) থেকে ১৩:৩৯ , মে ১৭ , ২০১৮

বাংলা ট্রিবিউন প্রতিনিধি জনি হকের কান-পরিচয়পত্রঘুম থেকে উঠে বাইরে তাকিয়ে মনটা ভালো হয়ে গেলো। আকাশ আজ নীলাঞ্জনা! ডানা মেলেছে রোদ্দুর। গত দুদিন বিকাল অবধি মেঘ-বৃষ্টি সাগরপাড়ের শহরে কিছুটা ছন্দপতন ঘটিয়েছে।
বুধবার (১৬ মে) উৎসবের নবম দিনে বৃষ্টি হলে হয়ে যেতো সর্বনাশ! কান শহরের মেয়র ডেভিড লিসনার্ডের আমন্ত্রণপত্র জলে যেতো। কারণ, এতে উল্লেখ ছিল, আবহাওয়া খারাপ থাকলে মধ্যাহ্নভোজের নেমন্তন্ন বাতিল হবে। সূর্য মুচকি হেসেছে বলে সেই শঙ্কা আর থাকেনি।
বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই আয়োজনের ৭১তম আসরে অ্যাক্রেডিটেশন পাওয়া বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছেন কানের মেয়র। আমন্ত্রণপত্রে আরও উল্লেখ ছিল, উৎসবের ৭১তম আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকরাও সাংবাদিকদের সঙ্গে লাঞ্চ করবেন।
দক্ষিণ ফ্রান্সের শহরটির ঐতিহ্যবাহী লে শুকে নামক জায়গায় মেয়রের কর্মস্থল পালে দো লা ক্যাস্তরে হয় অনুষ্ঠানটি। গত তিনবারের মতো এবারও ভেন্যু বদলায়নি। সেখানেই বুধবার কানের স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় খাওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছে।
পালে দো লা ক্যাস্তরে যেতে হলে পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবন থেকে ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল পেরিয়ে হোটেল ডি ভিলের সামনে গিয়ে সড়ক পেরোতে হয়। সেখানে শুধু হোটেলটিই নয়, একই নামে বাসস্ট্যান্ডও আছে। কানের ট্রেন স্টেশনের পর এটাই এই শহরের সবচেয়ে বড় বাস টার্মিনাল।

মূল সড়ক থেকে উঁচু হয়ে যাওয়া পিচঢালা পথে হেঁটে এগোতে হয় পালে দো লা ক্যাস্তরের দিকে। এই জায়গাটা নিরিবিলি। রাস্তার দু’পাশে বাসাবাড়ি। খুব ধীরে ধীরে হাঁটতে হয় এই পথে। যত এগোবেন, পায়ের গোড়ালিতে তত চিন চিন করে! ওই পথ শেষ হলে দুই ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে পেলাম পালে দো লা ক্যাস্তরের ফটক। সেখানে অতিথিদের জন্য প্লাস্টিকের গ্লাসে পরিবেশন করা হচ্ছে রেড ওয়াইন, জুস, পানি।
অতিথিদের বরণ করে নিতে ফটকের ভেতরে দু’পাশে বাহারি সাজে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধারা। প্রবেশের আগে নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যাগ চেক করে নিলেন। আরেকটু ভেতরে গিয়ে চোখে পড়লো সুর তুলছেন ব্যান্ড পার্টির সদস্যরা। ঢোল বাজাচ্ছে এক শিশু। তাদের গত বছরও মেয়রের লাঞ্চে দেখেছি। তাদের ঠিক পাশে উপরে তাকালেই চোখে পড়ে বিশাল এক ঘড়ি।
অন্যপাশে নিমন্ত্রণপত্র জমা নিয়ে অতিথিদের দেওয়া হচ্ছে অলিভ অয়েলের বোতল। তাতে ৭১তম কান উৎসবের স্টিকার। অলিভ অয়েল নিয়ে সোজা হেঁটে গেলাম। টেবিলে পিঙ্ক ওয়াইন, পানি, স্পার্কলিং ওয়াটার, বাগেল ও বাটার আগে থেকেই রাখা। বুফেতে পরিবেশন করা হয়েছে সামুদ্রিক মাছ, সবজি, ডিম ও মিষ্টান্ন।
নিমন্ত্রণপত্রে কানের মেয়র উল্লেখ করেছেন, ‘ফরাসি রেসিপি দিয়ে বানানো খাবারের মাধ্যমে আমাদের এই শহরের অন্যরকম একটি দিক সম্পর্কে জানার সুযোগ হবে আপনাদের। বলাবাহুল্য, উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই এই স্বাদ পান না।’
টেবিলগুলোর একপাশে বুফে। অন্যপাশে একটি ভাস্কর্য। তার পাশে বড় করে ইংরেজিেতে লেখা ‘কান’। পালে দো লা ক্যাস্তরের একেবারে সামনে ব্যারিকেডের কিছুটা সামনে টেবিল-চেয়ার রাখা। সেখানে বসে খেতে হাজির হলেন ৭১তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকরা।
অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী কেট ব্ল্যানচেটের নেতৃত্বে এসে হাজির হলেন ‘টোয়াইলাইট’ তারকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, জেমস বন্ড সিরিজের ‘স্পেক্টর’ ও ‘মিশন ইমপসিবল’ সিরিজের ফরাসি অভিনেত্রী লেয়া সেদু, ‘সেলমা’ ছবির পরিচালক আভা ডুভারনে, বুরুন্ডির গায়িকা খাজা নিন, ‘ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন’ তারকা চ্যাং চেন, ‘ব্লেড রানার ২০৪৯’ ছবির পরিচালক ডেনিস ভিলেন্যুভ, রুশ পরিচালক আন্দ্রে জিভিয়াজিন্তসেভ ও ফরাসি পরিচালক রবার্ট গেদিজিয়ন।
মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের প্রধান কেট ব্ল্যানচেটের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আলোকচিত্রী ও টেলিভিশন সাংবাদিকদের চেষ্টার ত্রুটি রইলো না। সাড়াও দিলেন তিনি। তবে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট হতাশ করেছেন তাদের।
এরপর ৯ বিচারক পেছনে সাগরকে রেখে একসঙ্গে দাঁড়ান ফটোসেশনে। তাদের বিচারেই চূড়ান্ত হবে উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বর্ণপাম। খাওয়ার সময় তাদের ছবি তোলা বারণ। তাই ভোজনরসিক হয়ে যান সাংবাদিকরা।
খাওয়ার ফাঁকে চোখ মেলে তাকালে একঝলকে দেখে ফেলা যায় পুরো শহর! সাগরপাড়ের শহরটির সৌন্দর্য অন্যরকম মুগ্ধতা তৈরি করে। নীল আকাশের নিচে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি। তীরে অসংখ্য ইয়ট ও স্পিডবোট। সাগরের অন্যপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। তার মধ্যেই ঘরবাড়ি, রিসোর্ট, হোটেল। এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়।

/জেএইচ/এমএম/চেক-এমওএফ/

x