কানের জৌলুস ছড়িয়ে পড়তে দেরি নেই!

জনি হক ১০:০০ , এপ্রিল ১৬ , ২০১৯

৭২তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল পোস্টারতামাম দুনিয়ায় কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আর মাত্র ২৮ দিন। কান চলচ্চিত্র উৎসবের জৌলুস ছড়িয়ে পড়তে দেরি নেই! বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন এই আয়োজনকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের রথী-মহারথীরা হাজির হবেন কানসৈকতে। সবার অংশগ্রহণে মুখর হয়ে উঠবে দক্ষিণ ফরাসি উপকূলের শহর। সবাইকে স্বাগত জানাতে এখন প্রস্তুত হচ্ছেন আয়োজকরা। 
ইতোমধ্যে কান উৎসবের ৭২তম আসরের অফিসিয়াল পোস্টার উন্মোচন করা হয়েছে। সদ্যপ্রয়াত নারী নির্মাতা আনিয়েস ভারদার একটি স্থিরচিত্র নিয়ে সাজানো হয়েছে এটি। এতে দেখা যাচ্ছে, উজ্জ্বল সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়েছে তার মুখে। অবিচল একজন টেকনিশিয়ানের কাঁধে দাঁড়িয়ে ক্যামেরায় চোখ রেখেছেন তিনি।
ছবিটি ১৯৫৪ সালের আগস্টে তোলেন ফরাসি অভিনেতা ও মঞ্চ নির্দেশক জ্যঁ ভিয়ার থিয়েটার ন্যাশনাল পপুলেয়ারের একজন আলোকচিত্রী। তখন আনিয়েস ভারদার বয়স ২৬ বছর। পরিচালক হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন তিনি। দক্ষিণ ফ্রান্সের সেতে ‘শর্ট পয়েন্ট’ (লা পঁন্ত কুর্ত) নামের ছবিটির শুটিং হয়। এর গল্প একজোড়া কপোত-কপোতীর প্রেমকে ঘিরে। তাদের চারপাশে রয়েছে প্রতিকূল জীবনযাপন করা জেলে, ব্যস্তবাগীশ নারী, খেলাধুলায় মেতে থাকা শিশু ও ঘুরে বেড়ানো বিড়াল। ১৯৫৫ সালের কানের রুই ডি’অন্তিবের একটি প্রেক্ষাগৃহে এটি দেখানো হয়।
সেটে তোলা পুরনো ছবিটিতে ইশতেহারের মতো আনিয়েস ভারদার আবেগ, আত্মবিশ্বাস ও মজার স্বভাবের সবই ফুটে উঠেছে। ৬৫ বছরের বর্ণাঢ্য সৃজনশীল ও নিরীক্ষাধর্মী ক্যারিয়ারে কান উৎসবের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। অফিসিয়াল সিলেকশনে ১৩ বার স্থান পেয়েছেন তিনি। ২০০৫ সালে বিচারক প্যানেলে ছিলেন গুণী এই নারী। আর ২০১৩ সালে ক্যামেরা দ’র বিভাগের জুরি সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে।
২০১৫ সালে সম্মানসূচক পাম দ’র পান আনিয়েস ভারদা। পুরস্কারটি নির্ভীক ও সৃজনশীল নির্মাতাদের উৎসর্গ করেন তিনি, যারা লাইমলাইটে না থাকার পরও মৌলিক চলচ্চিত্র কিংবা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে ঠিকই নিজেদের নিবেদিত রেখেছেন।
আয়োজকদের কথায়, অফিসিয়াল পোস্টারের মাধ্যমে এবারের আসরে অনুপ্রেরণাদায়ক পথনির্দেশক হিসেবে কানসৈকতে আলো ছড়াবেন আনেস ভারদা। এটি সাজিয়েছেন নারী গ্রাফিক্স ডিজাইনার ফ্লোরে মাকিন। 
স্বর্ণপামের দৌড়ে থাকবে যেসব ছবি
আগামী ১৪ মে আমেরিকার জিম জারমাশের ‘দ্য ডেড ডোন্ট ডাই’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে উৎসবের উদ্বোধন হবে। এটি স্বর্ণপামের জন্য লড়বে। আগামী ১৮ এপ্রিল উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত অন্য ছবিগুলোর নাম ঘোষণ করবেন কান উৎসবের সভাপতি পিয়ের লেসকিউর ও পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো। ওইদিন সকাল ১১টা (বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা) ইউটিউব, ডেইলি মোশন, ফেসবুক ও টুইটারে সরাসরি দেখানো হবে এই সংবাদ সম্মেলন। 
বিচারক দল 
প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের প্রধান থাকছেন অস্কারজয়ী মেক্সিকান নির্মাতা আলেহান্দ্রো গঞ্জালেজ ইনারিতু। ‘আঁ সার্তে রিগার্দ’ বিভাগে বিচারকরা দায়িত্ব সামলাবেন লেবাননের নারী নির্মাতা নাদিন লাবাকির নেতৃত্বে।
এবারের আসরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও ফিল্ম স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিভাগ সিনেফঁদাসোতে বিচারকদের প্রধান থাকবেন ফরাসি নারী নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনিস। ২৩ মে সিনেফঁদাসোর তিনটি পুরস্কার তুলে দেবেন তিনি। এরপর ২৫ মে সমাপনী আয়োজনে তার হাত থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের স্বর্ণপাম গ্রহণ করবেন বিজয়ী নির্মাতা।
৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ক্লেয়ার ডেনিস। তার বানানো পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রের সংখ্যা ১৩। এরমধ্যে কান উৎসবের অফিসিয়াল সিলেকশনে ছিল চারটি। আঁ সার্তে রিগার্দ বিভাগে ‘আই কান্ট স্লিপ’ (১৯৯৪) ও ‘বাস্টার্ডস’ (২০১৩), মিডনাইট স্ক্রিনিংয়ে ‘ট্রাবল এভরি ডে’ (২০০১)। তার বিখ্যাত ছবির তালিকায় আছে ‘চকোলেট’ (১৯৯৮), ‘বিউ ট্রাভেইল’ (২০০০), ‘হোয়াইট ম্যাটেরিয়াল’ (২০১০), ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ (১৯৯০), ‘নেনেত অ্যান্ড বনি’ (১৯৯৬), ‘থার্টি ফাইভ শটস অব রামস’ (২০০৮)। সবশেষ গত বছর মুক্তি পায় তার ‘হাই লাইফ’। অভিনয়ে রবার্ট প্যাটিনসন।

কানে স্বর্ণপাম ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাম দ’র দুটোই জিতেছেন এমন নির্মাতাদের তালিকায় আছেন লিন রামসে, হাভিয়ার জিয়ানোলি, অ্যালিস উইনোকুর, পাসকেল ফেরান, জোয়াও সালাভিজা, জিম জারমাশ, নুরি বিলগে সেলান ও জেন ক্যাম্পিয়ন।

মাস্টার অব সিরিমনিস

গতবারের মতোই উৎসবের মাস্টার অব সিরিমনিস (উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক) থাকছেন ফরাসি অভিনেতা এদুয়ার্দ বেয়া। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে আরও দু’বার এই দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা আছে তার। ৫১ বছর বয়সী এই তারকা ৭১তম আসরে কথায় কথায় মুগ্ধ করেছেন। তাই তাকে আবারও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে কানমঞ্চে।

কানসৈকতে মার্শে দ্যু ফিল্মের অংশ বিভিন্ন দেশের প্যাভিলিয়নমার্শে দ্যু ফিল্মের ৬০ বছর 
কানে বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ও শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র বাজার মার্শে দ্যু ফিল্মের ৬০ বছর পূর্তি হচ্ছে এবার। ১৯৫৯ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্প পরিসরে এটি চালু হয়েছিল। অল্প সময়ে প্রযোজক, পরিবেশকদের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে এই আয়োজন। ১৯৬১ সালের ১০ মে পরিপূর্ণভাবে শুরু হয় ‘মার্শে ইন্টারন্যাশনাল দ্যু ফিল্ম’। সেই থেকে প্রতি আসরে এই বিভাগে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফিল্ম প্রফেশনালদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। প্রেক্ষাগৃহ, টেলিভিশন, ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্যান্য উৎসবে চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রের পরিবেশনা স্বত্ব বেচাকেনার ব্যাপারে আলোচনার জন্য এটি অপরিহার্য ভেন্যু।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও চীন থেকেই বেশি ফিল্ম প্রফেশনালরা যান কানে। গত বছর তাদের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। পাঁচটি ভেন্যুর ৩৩টি প্রেক্ষাগৃহে তিন হাজার ছবির প্রদর্শনীর দেড় হাজারটিতে অংশ নিয়েছেন ১২ হাজার ৪০০ জন। পালে দে ফেস্তিভাল ভবনের পাশাপাশি সাগরপাড়ে ও ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালে বিভিন্ন দেশের প্যাভিলিয়নে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে মার্শে দ্যু ফিল্ম।
আগামী ১৪ মে শুরু হয়ে মার্শে দ্যু ফিল্ম কার্যক্রম চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। ছবি বেচাকেনার পাশাপাশি এবার রয়েছে প্রডিউচার্স নেটওয়ার্ক, ডক কর্নার, ইন্ডাস্ট্রি ওয়ার্কশপ, কান এক্সআর, অ্যানিমেশন ডে, শর্ট ফিল্ম কর্নার।
১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য রয়েছে ‘থ্রি ডেজ ইন কান’ নামের বিশেষ পাস। এর মাধ্যমে তারা অফিসিয়াল সিলেকশনের ছবিগুলো দেখার সুযোগ পাবেন।

লা’এতেলিয়ার

কান চলচ্চিত্র উৎসবের ৭২তম আসরে সিনেফঁদাসো আয়োজিত লা’এতেলিয়ারের ১৫তম কার্যক্রমে আমন্ত্রণ পেয়েছেন নতুন প্রজন্মের ১৫ জন নির্মাতা। তাদের আগামী ছবিকে সম্ভাবনাময় মনে করছেন আয়োজকরা। এগুলোতে লগ্নি করতে ইচ্ছুক বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের প্রফেশনালদের সঙ্গে কানসৈকতে ১৬ থেকে ২৩ মে চিন্তাভাবনার আদান-প্রদান করবেন তারা।

২০১৯ সালের লা’এতেলিয়ারে জায়গা পেয়েছে এশিয়ার মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েল ও সিরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার চিলি, ইউরোপের ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, সার্বিয়া, স্পেন, স্লোভাকিয়া ও তুরস্ক আর আফ্রিকার লেসোথোর উদীয়মান নির্মাতার ছবির চিত্রনাট্য নির্বাচিত হয়েছে।

লা’এতেলিয়ার কার্যক্রমে নির্বাচিত ১৯৮টি ছবির মধ্যে ১৫৭টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়ে গেছে। ২৭টির শুটিং চলছে। বাংলাদেশি নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমনের ‘ডে আফটার টুমরো’ ছিল ২০১৭ সালের লা’এতেলিয়ারে।  

প্রেস বিভাগ পুনর্বিন্যাস

প্রতিবারের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা হাজির হবেন কানে। তাদের জন্য এবার প্রেস বিভাগ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে হেড অব প্রেস অফিস হিসেবে থাকবেন আইদা বেলুলিদ। সংবাদকর্মীদের অ্যাক্রেডিটেশন, তাদের জন্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের ভার তার কাঁধে। গত ২ জানুয়ারি থেকে নতুন পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আলফনসো কুয়ারন, টেরেন্স ম্যালিক, ফাতি আকিন, সের্গেই লজনিৎসা ও নিকোলাস উইন্ডিং রেফনের ছবির প্রচারণার অভিজ্ঞতা আছে তার ঝুলিতে। মরক্বোর মারাকেশ ও ফ্রান্সের দ্যভিল, ব্যুন ও জেরার্দমার চলচ্চিত্র উৎসবে প্রচারণায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি।  

কানের হেড অব প্রেস অফিস পদে থাকা ক্রিস্টিন ইমে এখন থেকে ‘ফেস্টিভ্যাল মেমোরি’ দেখভাল করবেন। ২০২২ সালে কান উৎসবের ৭৫ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে আয়োজকরা নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে অডিওভিজ্যুয়াল প্রেসের ইনচার্জ হিসেবে বহাল আছেন ফ্রেদেরিক ক্যাসোলি ও ক্লেমেন্ত লেমোয়ান।

সূত্র: কান উৎসবের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

/এমএম/

x