ভারতীয় অর্থনীতি নিম্নমুখী

আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা ২০:৪৫ , অক্টোবর ১২ , ২০১৭

গুজরাটের আহমেদাবাদের একটি বাজারে ক্রেতার অপেক্ষায় একজন ফল বিক্রেতা। ছবি: ব্লুমবার্গ।প্রবৃদ্ধির বদলে ভারতের অর্থনীতি এখন উল্টো সংশয় বা হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)– এর সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি’র সরকারকে এখন এটা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে যে, ২০১৪ সালে নির্ধারিত বেশিরভাগ সরকারি লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব নয়।

শুধু খাতভিত্তিক একটি বিশ্লেষণেই গত তিন বছরে অর্থনৈতিক পতনের পূর্ণ পরিমাপ উঠে আসতে পারে। জিডিপি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে আর্থিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে এটা সর্বনিম্ন। আগের প্রান্তিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এটা ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষই নয়, এমনকি সরকারের প্রতি বন্ধুত্ববৎসল হিসেবে বিবেচিত দুই অর্থনীতিবিদ ড. অরুণ শৌরি এবং ইয়াশওয়ান্ট সিনহা উভয়েই বিপদ সংকেতের আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন। এ দুজনই বিজেপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী। পরিকল্পনা এবং অর্থ সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ এখানে নেই। তবে গত তিন বছরে মোদি সরকারের সময়কালের কয়েকটি ঘটনা পতনের মাত্রা নির্দেশ করে।

২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে শিল্প খাতে উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ। এটাও সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৩ সালের জুন থেকে এই প্রথমবারের মতো শিল্প খাতের উৎপাদনের হারে এমন ব্যাপক পতন ঘটেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থনীতির আটটি খাতে ৪৩ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে মেটাল, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, জহরত এবং অটোমোবাইলের মতো খাতগুলোও রয়েছে।

বছরে কমপক্ষে ২০ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বিজেপি সরকার। যদিও এটাকে প্রাক নির্বাচনি অতিশয়োক্তি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায়, তবুও নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল কর্মসংস্থানের একটি চিত্তাকর্ষক পুনরুজ্জীবনের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতের কমপক্ষে ৬৭টি বড় ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ফলে কাজের বাইরে রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের ১৭ হাজার ৬০০ কর্মী। বড় বড় ইউনিট এবং এসএমই উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লার্সেন অ্যান্ড টাবরো একাই ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এমনকি আইটি সেক্টরও আর আগের মতো ভালো করতে পারছে না। এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো: চলতি অর্থবছরে টিসিএস-এর কর্মী সংখ্যা কমেছে ১৪১৪ জন। ইনফোসিস-এর জনবল কমেছে ১৮১১ জন। ১৭১৩ জন কর্মীকে ছাঁটাই করেছে টেক মাহিন্দ্র।

ব্যাংকিং সেক্টরে একই অবস্থা বিরাজ করছে। ২০১০৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এইচডিএফসি একাই ৬ হাজার ৯৬ জনের হাতে চাকরিচ্যুতির কাগজ ধরিয়ে দিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোর এমন অভিজ্ঞতার কথা আর উল্লেখ করছি না। বিদ্যুৎ উৎপাদন (অপ্রচলিত পদ্ধতি) খাতে, গত ছয় মাসের মধ্যে দেড় হাজার মানুষকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশা প্রকৃত চিত্রের বিশদ ব্যাখ্যা করা একটি দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবে এখানে বাস্তবে কী ঘটেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা যায়।

বিজেপি’র প্রতি সহানুভূতিশীল দুই অর্থনীতিবিদ ড. অরুণ শৌরি এবং ইয়াশওয়ান্ট সিনহা উভয়েই মনে করেন, পুরো দুনিয়াজুড়েই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে পণ্য ও পরিষেবা কর (‌জিএসটি)‌ চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একটি তাৎক্ষণিকভাবে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে একটি সাধারণত প্রবণতা যুক্ত করেছে। এর বিপর্যয়কর সংক্ষিপ্ত এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনেরই ফলাফল বা প্রভাব রয়েছে।

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার বর্তমান মেয়াদে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সমালোচনার ঝুঁকি নিয়েছেন। এখন ২০২২ সালের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণে মুদ্রাস্ফীতি এবং জিএসটি-এর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা ভোগ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ কর্তৃপক্ষ তার পাশে রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং ক্রমবর্ধমান আয় হ্রাস নিয়েও তাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। শিগগিরই এমন পরিস্থিতির অবসান ঘটবে এমন কোনও লক্ষণও দৃশ্যমান নয়।

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x