ট্রাম্পের নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে বিপর্যয়ের আশঙ্কা

বাধন অধিকারী ০৪:৩৮ , ডিসেম্বর ০৭ , ২০১৭



ভিন্ন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে একটি শহরকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনার জন্ম দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩ লাখ ৩০ হাজার (জেরুজালেমের মোট জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ) ফিলিস্তিনির আবাস জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রনায়কদের এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের সমাপ্তি টানলেন। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে আরব বিশ্ব আরও বিভক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে ওই পদক্ষেপে গভীর হতাশা, সীমাহীন অস্তিরতা ও বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।24824276_10214231358914203_322313918_n


বুধবার জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বুধবার দুপুরে হোয়াইট হাউসে কূটনীতিকদের অভ্যর্থনা কক্ষে এক ঘোষণায় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করছি, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির এটাই সময়।’ ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য দেশের রাজধানী নির্ধারণে হস্তক্ষেপ খুবই নজিরবিহীন একটি ঘটনা। তবে জেরুজালেমের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা।
জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা ও দূতাবাস স্থানান্তর বিষয়ে ট্রাম্পকে সাবধান করেছিল জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লিগ, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। তার পূর্বসুরিরাও শান্তি প্রক্রিয়ার স্বার্থে জেরুজালেম ইস্যুতে কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। ১৯৪৮ সালে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই জেরুজালেমকে তাদের রাজধানীর স্বীকৃতি দিলো। এএফপির আরেক প্রতিবেদনে বিশ্ব সম্প্রদায়কে উপেক্ষা করে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে বিভক্তি জোরালো হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
ইহুদি-খ্রিস্টান ও মুসলিম; তিন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য পবিত্র ধর্মীয় স্থান জেরুজালেম। তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে ৪ ডিসেম্বর সময়সীমা পার হয়ে গেছে। সোমবার দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা না দেওয়ায় দেশটির আইন অনুযায়ী আরও ছয় মাসের মধ্যে দূতাবাস সরছে না। দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিতের পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানী ঘোষণার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। ওই অঞ্চলে জন্ম দেবে নতুন অস্থিরতার। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, আরব, মুসলিম আর পশ্চিমা মিত্রদের উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দূতাবাস স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলেছেন। জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানীর স্বীকৃতি দিয়ে তিনি বিক্ষোভ উসকে দিয়েছেন।
জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘দুই দশকেরও বেশি সময়ের ছাড় দিয়েও আমরা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তির কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি।’ তার উদ্যোগ শান্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করেন তিনি।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে পিটার বিমন্ট জেরুজালেম থেকে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গভীর উদ্বেগ আর বিভক্তির জন্ম দিয়েছে। বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা বারবারা প্লেট-উশেরও বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইহুদিদের সমর্থন পেতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জিতলে তিনি জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন এবং মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর করবেন। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রাখছেন। সংবাদদাতা বলছেন, এই স্বীকৃতি দিয়ে মি. ট্রাম্প যে পরে প্রতিদান হিসেবে শান্তিচুক্তি ত্বরান্বিত করতে ইসরাইলের ওপর চাপ দেবেন, তার কোনও ইঙ্গিতই নেই।
ফিলিস্তিনের মুক্ত চিন্তার রাজনীতিবিদ মুস্তাফা মারঘুতি ট্রাম্পের ঘোষণাকে প্রতিক্রিয়ায় ‘বেপরোয়া সিদ্ধান্ত’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন, এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি । তিনি মনে করছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যা এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করবে। ‘ওই ঘোষণা ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মুসলিম, ২ দশমিক ২ বিলিয়ন খ্রিস্টান এবং ৩৬০ মিলিয়ন আরবের জন্য নতুন সংকটের কারণ হবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

/এমএনএইচ/

x