জাতিগত নিধনযজ্ঞে মিয়ানমার সেনাকে দায়ী করতে জাতিসংঘকে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান

বিদেশ ডেস্ক ১৭:৩৯ , ফেব্রুয়ারি ১৪ , ২০১৮

রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনাকে অস্বীকার করাকে অযৌক্তিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ঘটনায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা এবং রাখাইনে যে এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে তা স্বীকার করতে অং সান সু চি’র ওপর চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূত নিকি হ্যালি মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এই আহ্বান জানান।

নিকি হ্যালি

নিকি হ্যালি বলেন, বার্মা (মিয়ানমার) সরকারের প্রভাবশালী বাহিনী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞের কথা অস্বীকার করে আসছে। তাদের এই অযৌক্তিক অস্বীকৃতির বিপরীতে মানুষ যাতে সঠিক তথ্য জানতে না পারে সেজন্য রাখাইনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না দেশটি।

মার্কিন দূত মিয়ানমারে গ্রেফতার হওয়া ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। রয়টার্সের দাবি, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের খবর সংগ্রহের কারণেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছে।

নিকি হ্যালি আরও বলেন, ‘বিশ্ববাসী মিয়ানমারের উদ্যোগ দেখার জন্য তাকিয়ে থেকে অপেক্ষা করছে। দেশটি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি বিষোদগার করছে কিন্তু সংবাদকর্মীরা তথ্যের অপরিহার্য উৎস।’

বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মার্কিন দূত বলেন, ‘বাংলাদেশ মিয়ানমারের শরণার্থীদের কত বড় বোঝা বহন করছে তা বুঝতে পারি।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত ফরাসি দূত ফ্রাসোঁয়া দেলাত্রি নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, রয়টার্স রোহিঙ্গাদের হত্যাযজ্ঞের যে বিবরণ প্রকাশ করেছে তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে কোনও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। ভেটো ক্ষমতা সম্পন্ন চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারবিরোধী যে কোনও পদক্ষেপে বিরোধিতা করবে। মঙ্গলবার উভয় দেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, রাখাইনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

বৈঠকে ইউএনএইচসিআরের হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বাংলাদেশের বর্ষাকালের বিষয়টি তুলে ধরে সবাইকে সতর্ক করে দেন। মার্চ মাসে বাংলাদেশে বৃষ্টি শুরু হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বন্যা ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় অবস্থান করছে প্রায় এক লাখ ৭ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী। বৃষ্টি হলে যেকোনও সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, ‘নতুন করে কোনও জরুরি সংকট থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে।’

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন মানবাধিকার কাউন্সিলের তদন্ত দলকে এখনও  রাখাইন রাজ্যে প্রবেশেরর অনুমতি না দেওয়ায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাস্তব অবস্থা মূল্যায়নের জন্য পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাও দো সুয়ান বিতাড়িত মানুষদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ উন্নতি করেছে বলে দাবি করেছেন।  

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি আর ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স নিজস্ব অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে তুলে এনেছে নারকীয় হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ভয়াবহ বাস্তবতা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইনের সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। সূত্র: ভয়েস অব আমেরিকা।

 

/এএ/

x