‘ঘর-বাড়ি আর গাছের খুব কাছ দিয়ে উড়ছিলো বিমানটি’

বিদেশ ডেস্ক ১৫:১৫ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

নেপালের ললিতপুরে মেডিসিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া কেশব পান্ডে। নেপালের একটি ট্রাভেল এজেন্সির অপারেটর হিসেবে কর্মরত কেশব বাংলাদেশে এসেছিলেন একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। ৯ মার্চ বাংলাদেশে কাস্টমার সাকসেস সামিট নামের ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নেপাল থেকে কেশবের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন আরও ১১ জন ট্রাভেল এজেন্সি অপারেটর এবং ইউএস-বাংলা বিমানের দুই প্রতিনিধি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নেপালি সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন কেশব। ১২ মার্চ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ও পরের পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন তিনি।

কেশব পান্ডে
কেশব পান্ডে বলেন, ‘ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে আমরা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আয়োজিত সম্মেলনে অংশ নিতে বাংলাদেশে রওনা করেছিলাম। কক্সবাজারে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই আমাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু আমরা আরও একটা দিন বেশি থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’ 

কেশব জানান, ট্রাভেল এজেন্সির ১২ বন্ধুর মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশে থেকে গিয়েছিলেন। এরমধ্যে দুইজন ছিলেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের কর্মী। আর দুই বন্ধু আগের দিনই অর্থাৎ ১১ মার্চ নেপাল ফিরে যায়।

১২ মার্চ সোমবার তাদের বহনকারী বিমানটি যথাসময়ে উড্ডয়ন করেছিল বলে জানান কেশব। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই বিমানে উঠলাম এবং সামনের দিকের সিটে বসলাম। বিমানে অনেক নেপালি যাত্রী ছিলেন। এমবিবিএস কোর্স শেষ করা অনেক শিক্ষার্থীও ওই বিমানে করে বাড়ি ফিরছিলো। নিউরো সার্জন বলকৃষ্ণ থাপাও একই বিমানে ছিলেন। পাশাপাশি অনেক পর্যটকও ছিলেন।’ প্রসঙ্গত, বলকৃষ্ণ থাপাও ওই দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। তাকেও নেপালের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।  

বিমানের রুট পরিবর্তন নিয়ে কেশব বলেন, ‘যখন বিমানটি কাঠমান্ডু ভ্যালিতে প্রবেশ করলো তখন এটি অবতরণের জন্য কোটেশ্বরের দিকের রুটটি ব্যবহারের কথা ছিল। কিন্তু এটি অন্য আরেকটি রুটে গেলো এবং বিমানবন্দর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আমরা ভাবলাম, পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনাই অনুসরণ করছে।’

কেশব জানান, বুধানিলকণ্ঠ এবং বৌদ্ধ এলাকাগুলোতে অবস্থিত পাহাড়ের উপর দিয়ে চালিয়ে নিয়ে এরপর বিমানটিকে বিমানবন্দরের দিকে ঘোরান পাইলট। বিমানটি ঘর-বাড়ি এবং গাছের খুব কাছ দিয়ে উড়ছিলো। এতে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলো।

‘আমরা তখনই অনুভব করলাম আমাদের জীবন ঝুঁকিতে আছে। তবে পাইলট যখন বিমানটিকে দিশাহীন পথ থেকে বের করে বিমানবন্দরের দিকে ঘোরালো তখন আমরা ভাবলাম প্রাণে বেঁচে যাব’- বলে যান কেশব।

তবে কেশব জানান, সে আশা মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেলো। তিনি বলেন, ‘অবতরণের দুই মিনিট আগে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বিমানটি ঝাঁকুনি খেলো এবং ভীষণরকমের এক শব্দ হলো। এতটুকুই আমার মনে আছে। এরপর যা মনে করতে পারি তা হলো কীভাবে আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। পেট্রোল বের হচ্ছিল এবং বিমান ধোঁয়ায় ছেয়ে গেলো। বিধ্বস্ত বিমান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম আমি কিন্তু পায়ে আঘাত পাওয়ার কারণে পারছিলাম না। এরইমধ্যে নেপালের সেনাবাহিনী আমাকে হামাগুঁড়ি দেওয়া অবস্থায় দেখতে পেলো। উদ্ধার করে সিনামঙ্গলভিত্তিক কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজে নেওয়া হলো আমাকে। পরে আমার পরিবারের সদস্যরা আমাকে চিকিৎসার জন্য মেডিসিটি হাসপাতালে নিয়ে গেলো।

ভয়াবহ ওই বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিজে প্রাণে বেঁচে গেলেও অনেক পর্যটন উদ্যোক্তা, সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করা চিকিৎসক এবং পর্যটকরা নিহত হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন কেশব পান্ডে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘জীবিত থাকার আশা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। অনেক বন্ধুকে হারানোর মধ্য দিয়ে আমি নতুন জীবন পেয়েছি।’ 

/এফইউ/চেক-এমওএফ/

x