শরণার্থী বালকের সঙ্গে একটি পাখির সম্পর্কের গল্প

বাধন অধিকারী ও জাহিদুল ইসলাম জন ২০:২৫ , মে ১৭ , ২০১৮

বিভক্তি আর বিদ্বেষের বিশ্বে আপনাদের একটি গভীরতর প্রেমময় সম্পর্কের গল্প বলছি। না, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক নয়। জাতিরাষ্ট্রের কাঁটাতারে বিভক্ত বিশ্বের এক শরণার্থী কিশোর, আর একটি পাখির মধ্যকার সম্পর্কের গল্প এটি। পাকিস্তানে শরণার্থী জীবনের অনন্য সঙ্গী হিসেবে পাখিটিকে পেয়েছিল আফগান কিশোর বেলাল। বন্ধুত্ব পাতিয়ে পাখিটির নাম রেখেছিল টোটি। তাই পাকিস্তান থেকে যখন শরণার্থী বেলালদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো, নিজ দেশ আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তনের সেই সময়ে পাখিটিকে ছেড়ে আসতে পারেনি বেলাল। ২ বছর আগে পাকিস্তানে বন্ধু হওয়া পাখি টোটিকে খাঁচায় বন্দি করে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল সে। মানুষের মতো জাতিরাষ্ট্র বানিয়ে উড়বার আকাশকে বিভক্ত করেনি পাখিরা। তবে পাকিস্তান নামের ভূখণ্ডের ওপরে দাঁড়ানো চেনা আকাশ ছেড়েই টোটিকে আসতে হয়েছিল বেলালের সঙ্গে। আফগানিস্তানের অচেনা প্রতিবেশে, উড়বার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যকে দমিত রেখেই টোটি কি কেবলই বন্ধুত্বের দাবি মেটাতে এসেছিল? প্রশ্নটি কেন উঠল, তার উত্তর পাওয়া যাবে এই বন্ধুত্বের পরিণতির কথা পড়তে পড়তে।
বেলাল আর তার টিয়া টোটি

হেলমান্দ সভ্যতাকে নিয়ে এক সময়ের ঐতিহাসিক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা দেশ আফগানিস্তান। বিগত ৪টি দশকে ক্রমান্বয়ে তা রূপান্তরিত হয়েছে বিরান ভূমিতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে থাকা আফগানিস্তানে ‘কমিউনিস্ট’ হটাতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর কেন্দ্রীয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ উস্কে দিয়েছিল ‘জিহাদি উন্মাদনা’। সোভিয়েতবিরোধী জিহাদি উন্মাদনার ধারাবাহিকতায় তখনকার সেই রুশ পরাশক্তি আফগানিস্তান আক্রমণ করলে, দেশ ছেড়ে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল বহু মানুষ।  এদের কেউ ইউরোপে, কেউ ইরানে কেউ আবার পাকিস্তানে খুঁজে নিয়েছিল নিজেদের আশ্রয়। ২০১৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক খবরে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া আফগানদের মধ্যে ১৩ লাখ নথিভূক্ত এবং ৭ লাখ অনথিভূক্ত শরণার্থী সোভিয়েতবিরোধী আফগান যুদ্ধে পাকিস্তানে শরণার্থী জীবন বেছে নিয়েছিল।  দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া অনেকের মধ্যে ছিল বেলালের পূর্বপ্রজন্মও।

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে আশ্রয় নিয়েছিল বেলালের দাদা দাওরান শাহ’র পরিবার।  সেখানে বিভিন্ন বঞ্চনার মধ্যেই বাস করতে হয় আফগান শরণার্থীদের। ২০১৬ সালে পাকিস্তান সরকার ওই বছরের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে আফগান শরণার্থীদের কাছে পাসপোর্ট-ভিসার মতো বৈধ নথি দাবি করে। হুমকি দেওয়া হয়, তা দেখাতে না পারলে গ্রেফতার-আটকসহ নানা ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার। এই ঘোষণার পর অনথিভূক্ত শরণার্থীদের অনেকে সেখানে থেকে গেলেও পুলিশি অবমাননায় সম্মানহানির ভয়সহ নানাবিধ কারণে ১ লাখ অনথিভূক্ত আফগান গত বছর ২০১৭ সালে পাকিস্তান থেকে আবার নিজ দেশ আফগানিস্তানে ফিরে যায়। বেলালের দাদা শাহ পরিবারও ছিল সেই প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা মেনে নেওয়া আফগানদের মধ্যে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিকের কাছে সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প বলেছে বেলালের পরিবার। ৩ দশকের যুদ্ধ-শরণার্থী জীবন পার করে পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ফেরার গল্প। ফেরার দিনটির স্মৃতিকে সামনে এনে তারা জানায়: সেটি ছিল এক আসন্ন সন্ধ্যা... আধো অন্ধকারে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চলা পথে ট্রাক চলাচলের ক্ষত...  যেন পেছনে ফেলে আসছেন  ৩০ বছর ধরে জমা হওয়া শরণার্থী জীবনের ক্ষত। ফিরছিলেন নারী ও শিশু মিলিয়ে প্রায় দুই ডজন মানুষ। যতোটা পারা গেছে, তার প্রায় সবটাই সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। টিন ভর্তি কাপড়, কম্বলের বান্ডেল, বাসনপত্র, ১১টা দড়ির বিছানা, ৪০টা মুরগী, দুটো কবুতর, একটা ছাগলসহ অনেক কিছু। কোনও জিনিস ট্রাকের ছাদে, কোনটা নেওয়া হয়েছে ট্রাকের পেছনে বেঁধে। এতোকিছুর মধ্যে ছয় বছরের ছোট্ট বেলাল ট্রাকের ছাদে বসে ছিল একটি খাঁচা জড়িয়ে। ভেতরে তার প্রিয় টিয়া পাখি টোটি। অচেনা অজানা দেশ পাকিস্তানে এই টোটিই ছিল তার একমাত্র বন্ধু।

যেখানে শাহ পরিবারের প্রত্যাবর্তন, সেই আফগানিস্তানে এখনও চলছে মার্কিন জোটের কথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’।  আফগান মুজাহিদীনদের প্রশিক্ষণের খরচ জোটাতে দেশটিকে করে তুলেছিল রমরমা আফিম চাষের উর্বর ভূমি। ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলার পর সেই মুজাহীদিনদেরই একজন ওবামা বিন লাদেনকে হামলার হোতা আখ্যা দিয়ে আফগানিস্তানে শুরু হয় মার্কিন আগ্রাসন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধের নামে শুরু হওয়া সেই আগ্রাসন আজও চলমান। এরইমধ্যে এক সময়ের অভাবনীয় সভ্যতার দেশটি ধূলো-ধূসরিত এক দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আফগানিস্তানে ফিরেছে শাহ পরিবার।

নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর পার্বত্য এলাকা নাঙ্গাহার প্রদেশে বসত গেড়েছে শাহ পরিবার। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলের প্রতি তিনজনের একজন হয় যুদ্ধের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত নয়তো পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা শরণার্থী। পার্বত্য উপত্যকার ওই অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ছোট ছোট বাড়ি। এগুলোর অনেকগুলোই বানিয়ে দিয়েছিল নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল। বেলাল প্রথমবারের মতো মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের নজরে আসে যখন ওই সাহায্য সংস্থাটির পক্ষে এক ফটোগ্রাফার তার ছবি তোলে। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বেলাল জানায়, ‘ পাকিস্তানে আমাদের বাড়িতে বারান্দা ও তিনটি ঘর ছাড়াও মেহমানদের জন্যেও একটা ঘর ছিল। এখানে মাত্র দুইটা ঘর। সেগুলোরও দরজা নেই। আর আছে দুইটা তাঁবু। পরিবারটির প্রতিবেশি বলতে তেমন কেউ নেই।’

অনেক কিছুর সঙ্গে বেলাল খাঁচায় বন্দি করে যে দেশ থেকে টিয়া পাখিটিকে এনেছিল, সেই পাকিস্তানে তার দাদা দাওরান শাহ আশ্রয় নিয়েছিলেন উত্তর-পশ্চিমের হাস্তনগর এলাকায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করলে কুনার প্রদেশ ছেড়ে পরিবার নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন দাওরান। টমেটো আর সবজি চাষ করে ৩০ বছর ধরে বড় এক পরিবার বানিয়েছেন তিনি। বাবার সঙ্গে সেই চাষের মাঠে গিয়েই  টোটিকে খুঁজে পেয়েছিল বেলাল। স্থানীয়ভাবে আস্পেন নামে পরিচিত এক একটি গাছের ডালের ওপরে বসে ছিল সেই টিয়া পাখিটা। ‘বাবা ডালটি নাড়া দিল। টোটি পড়ে গেল, আর আমি এক টুকরো কাপড় ওর ওপরে ছুঁড়ে দিলাম।’ কত বড়ো ছিল টোটি, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রশ্নের জবাবে বেলাল তার ছোট্ট হাতের দুই আঙ্গুল এক করে জানায়, ‘একদম বাচ্চা ছিল এই এতটুকু।’ বেলাল আর টোটিকে কখনও আলাদা করা যেত না। বাড়িতে একসাথে, মাঠে একসাথে, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে গেলেও বেলাল তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেত। সব সময় বেলালের কাঁধে করে ঘুরত সে। একমাত্র শস্য দানা বা বাদাম খাওয়ানোর সময় কাঁধ থেকে নামত। আর রাতে ঘুমানোর সময়ে টোটির খাঁচাটিকে আলতো করে নিজের খাটের নিচে রাখতো সে।

আফগানিস্তানে ফেরা নতুন জীবন বেলালের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কয়েকদিনের মধ্যেই ডায়াবেটিকসে আক্রান্ত তার দাদী মারা গেল। খেলার সাথীও নেই সেখানকার মতো। তার মতোই ছোট ছোট তিন বোনের একজন লালমিনা অসুস্থ।  বাবা জমসেদ হন্যে হয়ে কাজ খুঁজেও ব্যর্থ হয়ে যোগ দিয়েছেন আফগান সেনাবাহিনীতে। বেলাল জানায়, ‘আমার এখানে ভয় করে। বন্ধুরা কেউ এখানে নেই। আমি অসুস্থ হয়ে গেলাম। চোখে ব্যাথা করতো, জ্বর আসতো। ডাক্তার আমাকে ওষুধ দিল।’ এতো এতো নেতিবাচক বাস্তবতার মধ্যে টোটিই ছিল তার একমাত্র সহায়। সারা দিন তার কাঁধের ওপর থাকতো টোটি। দুজন মিলে বাড়ির পিছনের পাহাড়ে চড়তো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতো। বেলাল টোটি বলে ডাকলে পাখিটিও টোটি বলে উত্তর দিতো। দুই মাস আগের এক রাতে বেলাল টোটিকে খাঁচায় রেখে অন্যদিনগুলোর মতো খাটের নিচে রেখে ঘুমাতে গেল। সকালে উঠে টোটি বলে ডাকার পর সে সাড়া দিল না। দেখা গেল খাঁচায় নিথর হয়ে পড়ে আছে । বাবাকে ইন্টারনেটে মৃত টোটির ছবি পাঠালে তিনি বেলালকে জানান ‘বাড়ি আসলে তোমাকে আরও একটা কিনে দেবো’। কীভাবে টোটি প্রাণ হারালো নিশ্চিত জানা নেই বেলালের। তার দাদার ধারণা, আফগনিস্তানের আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে পারেনি টোটি। দুটি কবুতর আর ৪০টি মুরগীও মারা গিয়েছিল, সেখান থেকেই তার দাদার এই ধারণা। টোটির খাঁচাটি এখন শূন্য, বলছিলেন তার দাদা দাওরান শাহ।

টোটির মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল বেলাল। আস্তে আস্তে দিন গড়ায়। একটা সময় স্কুলে ভর্তিও হয় সে। কিছু বন্ধুও জুটে যায়। জুটে যায় খেলার সাথী। তবে স্মৃতি থেকে টোটি সরে যায় না। বেলালের ঘরের দেওয়ালের এক ফাঁকে মৃত টোটির পালকগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছে সে।

/বিএ/

x