সাগরে নৌকা ডুবে মিয়ানমারে ফেরত গেল শতাধিক রোহিঙ্গা

বিদেশ ডেস্ক ০৬:২১ , জুন ১৪ , ২০১৮

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে নৌকা ভেঙে মিয়ানমারের সংকট কবলিত রাখাইনে ফিরেছে শতাধিক রোহিঙ্গা। মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির কাছে দাবি করেছেন নৌকাটি বাংলাদেশ থেকে রওনা দিয়েছিল। বুধবার জাও তায় বলেন, সোমবার সকালে নৌকাটি রাখাইন উপকূলে দুর্ঘটনার কবলে পড়লে আরোহীরা সাঁতার কেটে মিয়ানমারে পৌঁছায়। তিনি দাবি করেন, মোট ১০৪ আরোহীর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছে। তাদের মংডুতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য নির্মিত শিবিরে রাখা হয়েছে। যাচাই বাছাই শেষে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি প্রত্যাবাসনে রাজি হওয়া রোহিঙ্গাদের ওই প্রক্রিয়ায় রেখে দেওয়া হবে বলে জানান জাও তায়।উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য নির্মিত শিবিরে রেখেছে মিয়ানমার
বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের মানবেতর পরিস্থিতি  ও রাখাইনে নতুন সহিংসতার আশঙ্কায় দুই এলাকা থেকেই বিপদজনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা চালায় রোহিঙ্গারা। বিপদজনক এই যাত্রা পথে অনেকের প্রাণহানি ঘটলেও ঝুঁকি নিয়েই পালাতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। বুধবার জাও তায় বলেছেন, সোমবার মালয়েশিয় এক ব্যক্তি মালিকানাধীন নৌকাটিতে করে বাংলাদেশ থেকে এসব আরোহীরা রওনা দেয়। তিনি বলেন, এদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক থাকলেও বেশিরভাগই শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা।

কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে আসলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া এসব রোহিঙ্গাদের ফেরাতে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও এখনও শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন।

গত বছরের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৮ হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রস্তাব করা হলেও মাত্র ৬০০ জনকে ফেরত নিতে চেয়েছে মিয়ানমার। এরমধ্যেই গত ৬ জুন প্রত্যাবাসন প্রশ্নে জাতিসংঘ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। মিয়ানমার বলছে প্রত্যাবাসনের আওতায় স্বেচ্ছায় ফিরতে চাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রথমে এই উপলক্ষে নির্মিত আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হবে। পরে পর্যায়ক্রমে তাদের নিজেদের গ্রামে ফেরত পাঠানো হবে।

জাও তায় বলেন, উদ্ধার হওয়া লোকদের মংডুর না খু ইয়া শিবিরে রাখা হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্যই এই শিবিরগুলো বানানো হয়েছে।

মিয়ানমারের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, উদ্ধার হওয়া নৌকার আরোহীদের মধ্যে শিশু এবং নারীরাও রয়েছে। খালি পায়ে হেঁটে এসব আরোহীরা ভারী বৃষ্টিপাতের মধ্যে মিয়ানমার পুলিশের ট্রাকে উঠছে।

মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জাও তায় বলেন, নৌকার এসব আরোহীরা মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাচারকারীদের প্রায় ২৩৫ মার্কিন ডলার করে দিয়েছে। পৌঁছে কাজে যোগ দিতে পারলে আরও ২১০০ মার্কিন ডলার দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে এসব আরোহীদের।

বিগত কয়েক বছরে মালয়েশিয়া পৌঁছানার চেষ্টা করে সমুদ্রে প্রাণ হারিয়েছেন বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক। ২০১৫ সালে থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তে বিপুল সংখ্যক গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর এই পথে যাত্রার সংখ্যা কমে যায়। তবে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়নের মুখে আবারও বেড়েছে এই পথের ব্যবহার।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধার হওয়া নৌকার আরোহীদের যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হবে। বাকিরা প্রত্যাবাসনের আওতায় আসতে চাইলে তাদের এই প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর করা হবে।

মিয়ানমারের রাখাইনে এখনও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের স্বাধীন প্রবেশাধিকার নেই। ৬ জুন চুক্তি স্বাক্ষরের আগেও জাতিসংঘ বলেছে, সেখানকার পরিস্থিতি এখনও নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরি নয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পর জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জটিল আলোচনার ক্ষেত্রে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথম পদক্ষেপ।

বুধবার মিয়ানমারে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি ও মানবিক সহায়তাবিষয়ক সমন্বয়কারী নাট ওৎসবি দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির সঙ্গে নেপিদোতে সাক্ষাৎ করেছেন।  গত কয়েক মাস ধরে সম্পর্কে টানাপোড়েনের পর চুক্তি স্বাক্ষরের এই প্রথম মিয়ানমার ও জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বৈঠকে করেছেন।

/জেজে/

x