জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে কমাতে হবে মাংস খাওয়া!

বিদেশ ডেস্ক ২০:৪২ , অক্টোবর ১১ , ২০১৮

জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থার সংরক্ষণ ও খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে কমাতে হবে মাংস ও অন্যান্য প্রাণীজাত খাদ্যের ব্যবহার। এর বদলে গুরুত্ব দিতে হবে বাদাম, বীজ, ডালের মতো নিরামিষের ওপর। খাদ্য উৎপাদনে পালন করা পশু থেকে যে পরিমাণ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন হয় তা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা অন্যতম একটি বড় উৎস। ‘নেচার’ সাময়িকীটিতে প্রকাশিত নিবন্ধে লেখা হয়েছে, বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে পশ্চিমা দেশগুলোতে গরুর মাংস খাওয়া কমাতে হবে ৯০ শতাংশ। দুধ খাওয়া কমাতে হবে ৬০ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে খাদ্য হিসেবে শুকরের মাংসের ব্যবহার কমাতে হবে ৯০ শতাংশ। এর বদলে শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ বাড়াতে হবে মাত্র পাঁচ গুণ। তাছাড়া এক হাজার কোটি হতে চলা বিশ্বের জনসংখ্যার খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনও অনিবার্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নে বিশ্ববাসীর হাতে মাত্র অল্প কয়েক বছর সময় রয়েছে।

খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে এমনিতেই জলবায়ুর অনেক ক্ষতি হয়। কারণ পালিত পশু থেকে উৎপাদিত গ্রিন হাউজ গ্যাস, বন উজাড় করে ফেলা, সেচের কারণে পানি খরচ করা এবং কীটনাশকের কারণে সমুদ্রে পানিতে অক্সিজেন নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। বিশ্বের বেশ কিছু সমুদ্রাঞ্চলে অক্সিজেন স্বল্পতা এমন অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে সেখানে মাছসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এর সম্পর্ক হচ্ছে: গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ছে। আর বর্ধিত তাপমাত্রার জন্য পানি ও হয়ে উঠছে গরম। কিন্তু গরম পানিতে অক্সিজেন খুব কম থাকতে পারে। সমুদ্রের পানিতে অক্সিজেন স্বল্পতার আরেকটি কারণ সেখানে ফেলা বর্জ্য।

এখনই যদি পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ আরও ২৩০ কোটি মানুষের বাড়লে অবস্থা হবে সঙ্গিন, কারণ সে সময় আয় বাড়বে তিনগুন। স্বাভাবিকভাবেই মাংসের চাহিদাও বাড়বে। তাই এখন থেকেই নিরামিষ খাদ্যে অভ্যস্ততার ওপর গুরুত্ব আরোপের তাগাদা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নেচার সাময়িকীতে গবেষণা প্রতিবেদনটি এমন এক সময় প্রকাশিত হলো যখন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে গুরুতর শঙ্কার কথা আলোচিত হচ্ছে। গত সোমবার ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি) তাদের মাইলফলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ যদি ১.৫ ডিগ্রির স্থানে আর মাত্র আধা ডিগ্রিও বেশি হয় তাহলে এমন কি সামুদ্রিক প্রবালের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে পরাগায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কীট-পতঙ্গ। আইপিসিসির সেই প্রতিবেদনেও মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বের তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখাতে যা করণীয় তা বাস্তবায়ন করতে হবে আগামী অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই। তা যদি না হয় তাহলে তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে। সেক্ষেত্রে খরা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যগে বিপর্যস্ত হবে জীবন। নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরির আগে এর সঙ্গে জড়িত গবেষকরা বিশ্বের সব দেশের কৃষি ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করেছেন এবং সেখান থেকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পেছেনে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া ও খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা কতটুকু। গবেষণা পরিচালনাকারী দলের প্রধান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্কো স্প্রিংম্যান মন্তব্য করেছেন, ‘আমারা আসলেই বিশ্বের ধারণক্ষমতা নষ্টের ঝুঁকি নিচ্ছি। আমরা যদি কৃষিকাজ ও খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ হারাতে না চাই তাহলে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। খদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার তরান্বিত করাটা প্রয়োজনীয় দুইটি পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে খাদ্যের অপচয়ও রোধ করতে পারতে হবে।’ গার্ডিয়ান লিখেছে, বিশ্ব উৎপাদিত খাদ্যের এক তৃতীয়াংশই শেষ পর্যন্ত খাদ্য হিসেবে টেবিল পর্যন্ত পৌঁছায় না। তার আগেই কোনও না কোনওভাবে নষ্ট হয়।

গবেষকরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে দিতে না চাইলে গড়ে গরুর মাংস খাওয়া কমাতে হবে ৭৫ শতাংশ। শুকরের মাংস খাওয়া কমাতে হবে ৯০ শতাংশ। ডিম খাওয়া কমাতে হবে ৫০ শতাংশ! বীজ ও ও ডালের ব্যবহার বাড়াতে হবে তিন গুণ। বাদাম ও বীজের ব্যবহার বাড়াতে হবে চারগুণ। ধনী দেশগুলোর জন্য এ হিসেবে একটু ভিন্ন। সেখানে গরুর মাংস খাওয়া কমাতে হবে ৯০ শতাংশ। দুধ খাওয়া কমাতে হবে ৬০ শতাংশ। তাদেরকে বীজ-ডাল খাওয়া বৃদ্ধি করতে হবে ছয় গুণ। মাংস ও প্রাণীজাত অন্যান্য খাদ্য উৎপাদন কমাতে নিরামিষ খাদ্যের জন্য ভর্তুকি দেওয়া থেকে শুরু করে পশুজাত খাদ্যের ওপর কর আরোপের মতো ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটিতে।

এর মাধ্যমে মাংসের জন্য পালন করা পশু থেকে উৎপাদিত গ্রিন হাউজ গ্যাসের দূষণ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা যাবে। জার্মানির ‘পটসড্যাম ইন্সটিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের’ গবেষক অধ্যাপক জন রকস্ট্রম বলেছেন, ‘এক হাজার কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু তা ঘটবে যদি আমরা কৃষিকাজের ধরণ পাল্টাই এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করি। খাদ্য তালিকায় সবজিনির্ভর হওয়াটাই এখনকার মেনু।’

/এএমএ/

x