সাংবাদিক খাশোগির অন্তর্ধান সৌদি আরবকে বর্জনের সিদ্ধান্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমগুলোর

বিদেশ ডেস্ক ২২:১০ , অক্টোবর ১২ , ২০১৮

সৌদি আরবের বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তি, সংবাদমাধ্যম ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী আর্নেস্ট মোনিজ, ভার্জিন গ্যালাক্টিকের রিচার্ড ব্রনসন, এওএলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ কেস, মার্কিন সাময়িকী ইকনোমিস্ট, সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনবিসিসহ আরও প্রতিষ্ঠান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘দাভোস ইন ডেজার্ট' নামে খ্যাত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনটির আগামী ২৩ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদে শুরু হওয়ার কথা । সম্মেলনটি বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু তুরস্কে অবস্থিত সৌদি আরবের কনস্যুলেটে গিয়ে সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজ হওয়া ও তার পেছেনে সৌদি সরকারের হাত থাকার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে দেশটির সম্মেলন বর্জন করা বা সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিতের কথা জানিয়েছেন অনেকেই। জামাল খাশোগি

গত ২ অক্টোবর দুপুরে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করেন খাশোগি। এরপর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। তুরস্কের তদন্তকারীরা বলছেন, সৌদি আরবের ১৫ জন এজেন্ট কনস্যুলেটের ভেতরেই খাশোগিকে হত্যা করেছে । তুর্কি আরব মিডিয়া এসোসিয়েশনের প্রধান তুরান কিসলাকসি একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছেন, খাশোগিকে হত্যা করে তার লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। সৌদি আরব এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে আসছে, কনস্যুলেটে প্রবেশের কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বের হয়ে গেছেন।

খাশোগি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রবল সমালোচক ছিলেন। সৌদি আরবের এ রাজনৈতিক ভাষ্যকার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা তার নিবন্ধে সৌদি জোটের কাতারবিরোধী অবরোধের কঠোর সমালোচনা করতেন। মানবাধিকার প্রসঙ্গে সমালোচনা করায় কানাডার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিল সৌদি আরব। আর তখন সৌদির সমালোচনায় কলম ধরেছিলেন খাশোগি। সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, তিনি মোহাম্মদ খালেদ খাশোগির দৌহিত্র। খালেদ খাশোগি দেশটির সাবেক বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন।

সংবাদ সাময়িকী ইকনোমিস্টের এডিটর ইন চিফ জ্যানি মিন্টন বেডোস জানিয়ে দিয়েছেন, রিয়াদের বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন না। সিএনবিসিতে কর্মরত একজন সঞ্চালক ও নিউ ইয়র্ক বিজনেস টাইমসের সাংবাদিক অ্যান্ড্রু রস সরকিন টুইটার বার্তায় লিখেছেন, তিনিও ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘জামাল খাশোগির অন্তর্ধান ও তার হত্যার শিকার হওয়ার বিষয়ে প্রতিবেদন পড়ে আমি ভয়ঙ্কর রকম ক্ষুব্ধ।’

প্রভাবশালী সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভাষ্য, সম্মেলনের মিডিয়া স্পন্সরের হিসেবে থাকার কথা থাকলেও তারা ওই অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা সৌদি আরবের ওই আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে না থাকার কথা ভাবছে। ভায়াকমের সিইও বব বিকাশও সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ তার সেখানে বক্তব্য রাখার কথা ছিল। সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ব্লুমবাবার্গও তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়ে দিয়েছে, রিয়াদের বিনিয়োগ সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্তের কথা।

সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধান ও সম্ভব্য হত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে সৌদিবিরোধিতা সংবাদমাধ্যমের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছেছে অন্যান্য খাতেও। উবার টেকনোলজিসের সিইও দারা খশরুশাহী বলেছেন, এর মধ্যে যদি নতুন কোনও তথ্য উঠে না আসে তাহলে তিনি রিয়াদে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ কনফারেন্সে’ যাবেন না।

‘আমেরিকান অনলাইনের’ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন স্টিভ কেস জানিয়েছেন, তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে দূরত্ব রাখতে চান। সম্মেলনে তিনি অংশ নেবেন না। তার টুইটারে লেখা বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে আমি জামাল খাশোগি সম্পর্কে নতুন তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত পরিকল্পনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

শুধু যে রিয়াদের সম্মেলন বর্জনের ঘটনা ঘটছে তা নয়। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে জামাল খাসোগির অন্তর্ধান ও সম্ভাব্য হত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্বালানিমন্ত্রী আর্নেস্ট মোনিজ জানিয়েছেন, জামাল খাশোগির অন্তর্ধান রহস্যের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না জানা পর্যন্ত সৌদি যুবরাজের স্বপ্নের শহর ‘নিওমের’ প্রকল্প পরিচালনা পর্ষদ থেকে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ৫০ হাজার কোটি ডলারের নিওম প্রকল্পের জন্য গত মঙ্গলবারই ১৮ জন উপদেষ্টার নাম ঘোষণা করেছিল সৌদি আরব, যাতে মোনিজের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে সৌদি আরবের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছিল ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হারবার গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড মিন্টজ জানিয়েছেন, প্রতি মাসে ৮০ হাজার ডলার করে পাওয়া যেত সৌদি আরবের সঙ্গে থাকা চুক্তি থেকে। কিন্তু তারা সে চুক্তি বাতিল করে দিয়েছে।

ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্রনসন বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান ভার্জিন গ্যালাক্টিকের জন্য সৌদি বিনিয়োগ নিশ্চিতে যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল তা স্থগিত করেছেন তিনি। ভার্জিন গ্যালাক্টিক সৌদি আরবের কাছ থেকে একশ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাওয়ার আশা করেছিল।

/এএমএ/

x