বাতিল নোটকে সোনায় পরিণত করেছেন মাদুরো

বিদেশ ডেস্ক ১৬:১০ , ফেব্রুয়ারি ১১ , ২০১৯

লাতিন আমেরিকার খনিজসম্পদে ভরপুর ভেনেজুয়েলা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ার দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ওই সময়েই পশ্চিমা অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সংকটের কারণে ভেঙে পড়বে দেশটির সরকার। কিন্তু বিশ্লেষকদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত করে টিকে আছে দেশটি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখেও ভেনেজুয়েলার ক্ষমতায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর টিকে যাওয়া অবাক করার মতো ঘটনা। সম্প্রতি বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদো নিজেকে স্বঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দাবি করার পর সংকট চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪০টিরও বেশি দেশ গুইদোকে সমর্থন দেওয়ার ফলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে আনা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির মুদ্রা কার্যত অচল হয়ে পড়লেও কীভাবে মাদুরো তা দিয়েই সরকার ও শাসন ব্যবস্থা চালু রেখেছেন। বিশ্লেষকরা মাদুরোর এই পরিকল্পনাকে বাতিল নোটকে সোনায় রূপান্তর করা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাজ্যকে চাপ দিচ্ছে ভেনেজুয়েলার ১.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনার মজুত আটকে রাখার জন্য। মাদুরোর সরকার এই সোনা ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে জমা রেখেছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার সোনা কেনার ক্ষেত্রে আবুধাবিভিত্তিক বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদেরও না কেনার জন্য সতর্ক করেছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা বিদেশিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন মাদুরো।

মাদুরোর সোনার কর্মসূচির কথা গোপন কিছু নয়। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ভেনেজুয়েলার এই সোনার ব্যবসার পুরো চিত্র তুলে ধরেছে তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন তৈরিতে কথা বলা হয়েছে ৩০ জনের বেশি লোকের সঙ্গে, যারা এই বিষয়ে অবগত বা সংশ্লিষ্ট। এদের মধ্যে রয়েছেন খনি শ্রমিক, মধ্যস্বত্বভোগী, ব্যবসায়ী, গবেষক, কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তা। প্রায় সবাই ভেনেজুয়েলা বা মার্কিন সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় বা এই বিষয়ে কথা বলার এখতিয়ার না থাকার কারণে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন। 

রয়টার্স লিখেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক নেতার এক বেপরোয়া পরীক্ষা বলে মনে হয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাকে হ্রাস করেছে। আনুষ্ঠানিক খনি খাত জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর তাই মাদুরো দেশটির খনিজসম্পদ আহরণে ফ্রিল্যান্সারদের সুযোগ দিয়েছেন কার্যত রাষ্ট্রীয় কোনও নিয়ম বা বিনিয়োগ ছাড়াই।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় আর্থিক সাফল্য ওয়াল স্ট্রিটে ঘটেনি। ঘটেছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় আদিকালের সোনা আহরণ শিবিরে। যখন দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ছিল তখন প্রায় ৩ লাখ ভাগ্যানুসন্ধানী লোক খনিজসম্পদে ভরপুর জঙ্গলে পাড়ি জমায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অস্থায়ী খনি থেকে সোনা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা।

তাদের কোদাল ও শাবল হাতে তুলে নেওয়া প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বামপন্থী সরকারের জন্য অনেক সহায়ক হয়ে ধরা দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ সাল থেকে মাদুরোর প্রশাসন ১৭ মেট্রিক টন ধাতু কিনেছে, যেগুলোর মূল্য প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার। আর এসব মূল্যবান ধাতু উত্তোলন করেছে তথাকথিত আর্টিজান খনি শ্রমিকরা।

এসব অপেশাদার শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয়েছে কার্যত বাতিল হয়ে পড়া নোটে। বিপরীতে তারা সরকারকে মূল্যবান সোনা দিয়েছে, যা দিয়ে প্রয়োজনীয় খাবার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পণ্য আমদানি করা সম্ভব হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে সোনার এই বাণিজ্যের পুরো প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার এসব সোনার খনি দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন জঙ্গল এলাকায় অবস্থিত। খনি শ্রমিকরা অপরিশোধিত সোনা তুলছে টানেল খুঁজে। সংগৃহীত সোনা এল কালাওয়ে বিক্রি করেন। ক্রেতাদের বেশিরভাগেরই কোনও লাইসেন্স নেই এবং তারা ছোটখাটো ব্যবসায়ী। অনুমোদিত এক ক্রেতা জনি ডিয়াজ জানান, তিনি ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সোনা কিনে তিন দিন অন্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সোনা কিনছে, সবাই সোনা কিনছে। কারণ, এটার দাম ভালো।

সোনার প্রতি মানুষের আকৃষ্ট হওয়ার কারণ হচ্ছে দেশটির মুদ্রা বলিভার। কারণ, হাতে আসার পর প্রতিমুহূর্তেই এই মুদ্রার দাম কমতে থাকে। আইএমএফের তথ্য অনুসারে, এই বছর মূলস্ফীতি বেড়েছে ১০ মিলিয়ন শতাংশ। এক্ষেত্রে সোনা বিদেশে পাচার করে ডলার অর্জন করতে পারা ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দেয় সরকার। দিয়াজের কাছে যেসব ব্যবসায়ী সোনা বিক্রি করেন তারা নগদ অর্থ নিয়ে খনি শ্রমিকদের মজুরি শোধ করেন। শ্রমিকরা তা দিয়ে খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে বা সঞ্চয়টুকু পরিবারের কাছে পাঠায়।

রাষ্ট্রীয় খনি কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারের কেনা সোনা মিনার্ভানে গলানো হয়। পরে তা সেখান থেকে ৮৪৩ কিলোমিটার দূরে রাজধানী কারাকাসে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হয়। ব্যাংকে বেশি দিন এই সোনা রাখা হয় না। এমনিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনার মজুত ৭৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে রয়েছে। সরকারের দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতে, এই মজুত করা সোনা সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য ভেনেজুয়েলা বিক্রি করে দেয়। বর্তমানে এই সোনার সবচেয়ে বড় ক্রেতা তুরস্ক।

সোনার এই ব্যবসায় মাদুরো সহযোগিতা পেয়েছেন তার মতোই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ থাকা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের। ভেনেজুয়েলা তাদের সোনার বেশিরভাগই বিক্রি করতো তুর্কি শোধনাগারে। বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা হয়। গত বছর থেকে উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলা কারাকাস থেকে ইস্তানবুলে তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু হয়। উভয় দেশের মধ্যে যাত্রী চলাচল কম থাকার পরও এই উদ্যোগ ছিল বিস্ময়কর। বাণিজ্যিক তথ্য অনুসারে দেখা যায়, যাত্রীর চেয়ে অন্যান্য বস্তু এসব ফ্লাইটে পরিবহন করা হচ্ছে বেশি। ২০১৮ সালের প্রথম দিনে ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তুরস্কে সোনা পাঠানো শুরু করে। প্রথম ফ্লাইটে ৩৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা পাঠানো হয় ইস্তানবুলে। মাদুরোর তুরস্ক সফরের এক সপ্তাহের মধ্যেই পাঠানো হয় এই সোনা। গত বছরে সোনার এই চালান ৯০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। খোদ তুরস্কের সরকারি ও বাণিজ্যিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার দুই সরকারি কর্মকর্তা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব সোনা তুর্কি শোধনকারীদের কাছে বিক্রি করে। বিক্রি করা অর্থ দিয়ে তুরস্ক থেকে ভোগ্যপণ্য কেনা হয়। কারাকাসের লা গুয়াইরা বন্দরের তথ্য অনুসারে, তুর্কি পণ্য নিয়মিতই আসছে ভেনেজুয়েলায়। ডিসেম্বরের শুরুতে ৫৪ কন্টেইনার তুর্কি গুঁড়োদুধ পৌঁছায় বন্দরে।

সমালোচকরাও স্বীকার করেছেন মাদুরো খুবই কার্যকর কৌশল গ্রহণ করেছেন। এই কৌশল হলো, দুর্ভোগে থাকা নাগরিকদের কার্যত মূল্যহীন মুদ্রায় পারিশ্রমিক দিয়ে মূল্যবান ধাতু সোনা উত্তোলন। মাদুরো তুচ্ছ বস্তুকে সোনায় পরিণত করেছেন।

ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা ও অর্থনীতিবিদ অ্যাঞ্জেল আলভারাদো বলেন, মাদুরোর কাছে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড ও অস্বাভাবিক বাণিজ্য বিনিময় ছাড়া তেমন কোনও বিকল্প নেই। যেকোনও উপায়ে ক্ষমতায় ঠিকে থাকতে তিনি বেপরোয়া।

/এএ/এমওএফ/

x