যেভাবে ভারতের রাজনীতি পাল্টে দিলেন মোদি

বিদেশ ডেস্ক ২৩:৩৩ , মে ২৪ , ২০১৯

ভারতের সাধারণ নির্বাচনে অভাবনীয় জয় পেয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। নিশ্চিত করেছেন টানা দ্বিতীয়বার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে ভারতীয় রাজনীতিতে মোদির উত্থান, প্রভাব এবং কীভাবে তিনি ভারতীয় রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন তা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিজেপির পুরো নির্বাচনি প্রচারণাকে তিনি মোদির প্রচারণা হিসেবে হাজির করেছেন। আর এতেই এসেছে সাফল্য।

মোদির শাসনামলে বেকারত্ব বেড়েছে, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন কমেছে। নোট নিষিদের ফলে অনেক ভারতীয় আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ভোটের ফলে প্রমাণিত হয়েছে, জনগণ মোদিকে দোষ দিচ্ছেন না। মোদি ভোটারদের বারবার বলে আসছিলেন যে, ৬০ বছরের অব্যবস্থাপনা দূর করতে তাদের পাঁচ বছরের চেয়ে বেশি সময় প্রয়োজন।

দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর ডেভেলপিং সোসাইটিসের এক জরিপে দেখা গেছে, মোদি প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী না হলে বিজেপি ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ অন্য দলকে ভোট দিতেন। ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক মিলান বৈষ্ণব বলেন, এ থেকে প্রমাণিত হয় মানুষ বিজেপির চেয়ে মোদিকেই বেশি ভোট দিয়েছে। এই পুরো নির্বাচন ছিল মোদির নেতৃত্ব নিয়েই।

অনেকেই বলছেন, ভারতীয় নির্বাচনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রূপ দিয়েছেন অনেকটাই। কিন্তু শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই তাদের দলকে ছাপিয়ে বড় ওঠেছেন। উদাহরণ হিসেবে তারা বলছেন, মার্গারেট থ্যাচার, টনি ব্লেয়ার ও ইন্দিরা গান্ধীর কথা। বৈষ্ণব বলেন, ইন্দিরা গান্ধীর পর সন্দেহাতীতভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হচ্ছেন মোদি। জাতীয় পর্যায়ে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ নেই।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের ফল ছিল ২০১৪ সালে মোদির জয়। বৃহস্পতিবারের জয় ছিল মোদির প্রতি সমর্থন। ১৯৭১ সালের পর তিনিই প্রথম নেতা যার নেতৃত্বে দুইবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলো তার দর। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহেশ রাঙ্গারাজন বলেন, এটা হলো মোদি ও তার নয়া ভারতের স্বপ্নের বিজয়।

কেউ কেউ মনে করছেন, জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর, ধর্মীয় মেরুকরণ ও কিছু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কারণে মোদি টানা দ্বিতীয়বার বড় ধরনের জয় পেয়েছেন। ব্যাপক প্রচারণায় মোদি ধারাবাহিকভাবে জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়নের কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জাতীয়তাবাদী (সমর্থক) ও দেশবিরোধী (রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমালোচক); এই দুই ভাগে ভারতীয়দের বিভক্ত করে ফেলেছেন। নিজেকে চৌকিদার হিসেবে হাজির করেছেন আর বিরোধীদের দুর্নীতিবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সঙ্গে ছিল উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি জোরেশোরে সামনে এনেছেন যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা যায়নি।

কলকাতার একজন প্রবীণ রাজনৈতিক বিবিসিকে বলেছেন, উন্নয়ন এক-আধটু কম হলে সমস্যা নাই। কিন্তু মোদি ভারতকে সুরক্ষিত ও দেশের মাথা উঁচু রাখছেন।

কেউ কেউ বলছেন মোদির ব্যক্তিত্ব ক্যাডারভিত্তিক দলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। তিনি অনেকের আশা ও অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়েছেন। মোদি ও প্রভাবশালী অমিত শাহের হাত ধরে বিজেপি একটি নির্দয় পার্টি মেশিনে হিসেবে গড়ে ওঠেছে। মহেশ রাঙ্গারাজন বলেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপির বিস্তৃতি খুব তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি।

ঐতিহাসিকভাবে বিজেপির শক্ত বলয় হলো হিন্দুভাষাভাষী উত্তরাঞ্চল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছিল ২৮২ আসনে। এগুলোর মধ্যে ১৯৩টি আসন ছিল উত্তরের। ব্যতিক্রম ছিল মোদির নিজ রাজ্য গুজরাট ও মহারাষ্ট্র। এই দুই রাজ্যে আঞ্চলিক জোট গড়ে ক্ষমতায় ছিল দলটি। কিন্তু মোদি ক্ষমতায় আসার পর উত্তরপূর্বে আসাম ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। এই রাজ্যগুলো আসামি ও বাংলা ভাষাভাষী এলাকা। এবার ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। দক্ষিণ ভারতে বিজেপির স্বল্প উপস্থিতি দলটিকে এখনও সর্বভারতীয় রূপ পায়নি। তবে ক্রমশ দলটি কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

/এএ/

x