কেন আবারও মোদির পক্ষে রায় দিলো ভারতবাসী

বাধন অধিকারী ও ফাহমিদা উর্ণি ২৩:৪৩ , মে ২৪ , ২০১৯

বিগত বিজেপি সরকারের শাসনামলে ভারতজুড়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছিল মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ। চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ বেকারত্বের হার, ভয়াবহ কৃষি সংকট আর খাদ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক বিপন্নতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। জরিপে দেখা গেছে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, কৃষি ও খাদ্য সংকটের মতো মৌলিক জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরও হয়ে উঠেছিল। তবুও শেষ পর্যন্ত জনগণের রায় গেছে বিজেপির পক্ষেই। নরেন্দ্র মোদির প্রতি আস্থা রেখেছে ভারতবাসী। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি দিল্লির মসনদ নিশ্চিত করেছে আরও পাঁচ বছরের জন্য। মোদির এই বিজয়কে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী (মেজরেটিয়ান) জনতোষণ নীতির (পপুলিজম) বিজয় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সমৃদ্ধ ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি হিন্দুত্বের পাটাতনে কট্টর জাতীয়তাবাদী প্রচারণা চালিয়েছেন মোদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তার অবস্থানের সঙ্গে একমত পোষণ করাতেই সব ছাপিয়ে তিনি আবারও বিজয়ী হয়েছেন।

মোদি সরকারের প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদে অর্থনীতির গতি মন্থরই থেকে গেছে। পাশাপাশি বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম এমনকি রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের অনেক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে নতজানু হতে হয়েছে। এরপরও ভারতের ৯০ কোটি ভোটারের একটা বড় অংশ মনে করেছে মোদিকে আরেকবার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক শিব বিশ্বনাথান একে দেখছেন ‘জনতোষণবাদী নেতার স্বেচ্ছাচারের’ বিজয় হিসেবে। তার আশঙ্কা, পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া এবং দুয়ার্তের নেতৃত্বে ফিলিপাইন যেভাবে চলছে; মোদির নেতৃত্বে ভারত সে রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।

হাফিংটন পোস্টের ভারতীয় সংস্করণের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছরের শুরুর দিকে মোদির জয়ের আভাস ছিল না বললেই চলে। তার সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং উচ্চ বেকারত্ব নিয়ে জনগণের ক্ষোভের প্রশ্নকে সামনে এনে প্রচারণা চালিয়েছে বিরোধীরা। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় আধা সামরিক বাহিনীর ৪০ সদস্য নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পাকিস্তানের মাটিতে বিমান হামলা চালানোর আদেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিতে সমর্থ হন মোদি।

জরিপকারী প্রতিষ্ঠান লোকনীতির সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, কিছুদিন আগের তুলনায় নির্বাচনের সময় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ভোটারদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। অথবা তারা ওইসব ইস্যু নিয়ে তেমন উচ্চকণ্ঠ ছিল না। সম্ভবত তারা নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করেছেন। ভোটাররা দীর্ঘ সময় আগে জরিপকারী সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যে ইস্যুগুলোকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছিলেন এবং তারা শেষ পর্যন্ত যে ইস্যুগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন, তা আর একই রকম থাকেনি। এর সম্ভাব্য কারণ, বালাকোটের সন্ত্রাসী আস্তানায় মোদি সরকারের কথিত হামলা। জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুটি পরোক্ষভাবে ভোটারদের মনোভাব বদলে দিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে ওই সংস্থা।

দিল্লির গুরগাঁও-এর বাসিন্দা রাখি শ্রিভাস্তব হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়া-কে বলেন, ‘অন্য নেতারা যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন সেগুলোই শেষ পর্যন্ত করছেন মোদি। আর কোনও প্রাণহানি হবে না। কারণ, যেসব জঙ্গি দশকের পর দশক ধরে আমাদের সেনাদের হত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবস্থা নিচ্ছে কেউ। যে কোনও উপায়েই হোক এর অবসান হওয়া প্রয়োজন।’ রশমি নামে উত্তরপ্রদেশের মীরাটের এক গৃহিণী বলেন, ‘কাশ্মিরে হামলা হওয়ার পর মোদি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এমনই হওয়া উচিত। তার ব্যক্তিত্ব খুব চমৎকার।’

ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (মেজরিটারিয়ানিজম) এর মানে হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব। এটি এমন এক চিন্তাধারা যা ১৭ কোটি ভারতীয় মুসলিমকে মানতে বাধ্য করে যে, তারা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। দিল্লিভিত্তিক ইলেক্ট্রিশিয়ান ইয়াশপাল সাক্সেনার ছেলেকে হত্যা করেছিল ছেলের মুসলিম প্রেমিকার পরিবার। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য একটি হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঠেকিয়ে দিয়ে নজির তৈরি করেছিলেন সাক্সেনা। তবে তিনিও মনে করেন, মোদির কোনও বিকল্প নেই। হাফিংটন পোস্ট ইন্ডয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাক্সেনা বলেছিলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমি খুব আন্তরিকভাবে বিজেপিকে ভোট দেব। আপনারাই বলেন, এ মুহূর্তে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিকল্প কোনও নেতা আছেন কি?’

নির্বাচনের আগে স্যাটেলাইট বিধ্বংসী নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় মোদি সরকার। আর নির্বাচনের মাঝামাঝি পর্যায়ে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়েশ-ই-মোহাম্মদের নেতা মাসুদ আজহারকে নিরাপত্তা পরিষদে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী ঘোষণার প্রস্তাব থেকে দীর্ঘদিনের আপত্তি প্রত্যাহার করে চীন। আনন্দবাজারের সম্পাদকীয় ভাষ্যে লেখা হয়েছে, “নির্বাচনের ফল বুঝাইয়া দিল, দেশের জনমানসে এই ঘটনাসমূহ প্রায় কোনও দাগ কাটিতে পারে নাই। বরং নাগরিক সমাজে গগনচুম্বী সাফল্য অর্জন করিয়াছে ‘বালাকোট’। বাস্তবিক, কেন যে বার বার নির্বাচন কমিশনের মান্য নীতি অমান্য করিয়া নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা বালাকোটের নামে ভোট চাহিতেছিলেন, তাহা স্পষ্ট। ইহাই, যাহাকে বলে, ওস্তাদের মার! আর প্রেক্ষিত হিসাবে, পাঁচ বৎসর ধরিয়া জাতীয়তাবাদের নামে অন্ধ পাকিস্তানবিরোধিতা এবং হিন্দু রাষ্ট্রের নামে আগ্রাসী সংখ্যালঘুবিরোধিতা অন্য সমস্ত বিষয়কে ফুৎকারে উড়াইয়া দিয়াছে।”

এনডিটিভিতে কলামিস্ট মিহির তার ২০১৪ সালের একটি লেখার প্রসঙ্গ টেনেছেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে মোদির ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিনটি বিষয়। এগুলো হলো ভারতকে শক্তিশালী হতে হবে, ধনী হতে হবে আর হিন্দুত্ববাদী হতে হবে। হতে গেলে তিনটি বিষয়কে একসঙ্গেই নিশ্চিত করতে হবে, না পারলে একটি বিষয়ও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আর এটাই ভারতের জাতীয় রাজনীতির ভাবনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তিনি লিখেছেন, আমরা বাস করছি মোদির ভারতে। আমরা ভারতীয়দের ভারতে বসবাস করছি এবং এতো সংখ্যক মানুষ তাকে ভালোবাসে, সেটার কারণ মোদি ভারত রাষ্ট্র ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নিয়ে তাদের মনের কথাটা বলেন।

এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রতাপ ভানু মেহতা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্কার-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, মোদি অর্থনৈতিক আশার সঞ্চার করার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষের প্রচারণা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতে স্পষ্ট সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মোদি সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অভিন্ন হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ের তলে দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। নির্বাচনে সেই প্রবণতারই জয় হয়েছে। 

/এমপি/

x