কাশ্মিরের আনসার: যেখানে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে 'আজাদির লড়াই' থামেনি

বিদেশ ডেস্ক ১৫:১৩ , সেপ্টেম্বর ১২ , ২০১৯

৩০ আগস্ট ২০১৯। সবেমাত্র শেষ হলো জুমার নামাজ। সঙ্গে সঙ্গে ছোড়া হলো টিয়ারগ্যাস। আকাশ ছেয়ে গেল ধোঁয়ায়। শ্রীনগরের আনসার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর আরও একটি হামলা শুরুর ক্ষণ এটি। কাশ্মিরি প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ওই ‘মুক্তাঞ্চল’।

noname

ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে ওই অঞ্চলে অচলাবস্থা আরোপের পর পাঁচ সপ্তাহ পার হয়েছে। এতদিন পরেও বহু কাশ্মিরি নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। বিপুল সেনা উপস্থিতি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নির্বিচার আটকের কারণে সেখানে বড় ধরনের বিক্ষোভ হতে পারেনি। শ্রীনগরের প্রতিটি ইঞ্চি দখলে রেখেছে আধাসামরিক বাহিনী। বাদ রয়েছে কেবল আনসার। এখানকার বাসিন্দারা বেশিরভাগই পশমের শালের কারিগর। তারা এক্সক্যাভেটর দিয়ে আশপাশের অঞ্চলে পরিখা খনন করেছে। পাতলা শিট, ফেলে দেওয়া কন্টেইনার, কাঁটাতার আর কাঠ দিয়ে তৈরি করেছে ব্যারিকেড। রাতের বেলায় নিরাপত্তা বাহিনী আসছে কিনা তা পাহারায় দেয় একের পর একটি দল।

‘অন্যরা কেবল কেয়ামতের দিনের কথা শুনেছেন আর আমরা কেয়ামতের মধ্যেই বাস করি,’ বলছিলেন শ্রীনগরের উপকণ্ঠ আনসারে বসবাস করা ফাজি নামের এক নারী। তিনি জানান, নামাজ পড়তে সবাই যে মাজারের কাছে জড়ো হয়েছিল তার কাছেই ছোড়া হয় টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট।

নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিহত করতে আনসারের বাসিন্দারা দ্রুত ৫০০ মিটার দূরে জড়ো হতে শুরু করে। গত ৩০ আগস্টের ওই প্রতিরোধ প্রায় ৫ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। ফাজি বলেন, ‘সবখানে বৃষ্টির মতো রাবার বুলেট ও ধোঁয়া ছিল। আমাদের কাছে কোনও অস্ত্র নেই। কেবল আছে আল্লাহর নাম আর তিনিই আমাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন।’

গত এক দশকের মধ্যে কাশ্মিরের কোনও এলাকায় ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনী ও স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে ঢুকতে না দেওয়া একমাত্র অঞ্চল আনসার। সেখানকার সব পরিবারই এই প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত হয়েছে। এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা যখন পাথর ছুড়ি তখন আমাদের নারীরাও আমাদের পাশে থেকে পাথর এগিয়ে দেয়।’ রাতের পাহারায় অংশ নেওয়া ৫০ বছর বয়স্ক মোহাম্মদ সুবহান বলেন, ‘তিনটি কারণে আমরা এটি করি। প্রথমত, যেন তরুণদের আটক করতে না পারে, দ্বিতীয়ত আমাদের বাড়িঘর যেন ভাঙচুর করতে না পারে আর তৃতীয়ত আমাদের স্ত্রী-কন্যাদের সম্মানের যেন কোনও ক্ষতি না হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর হামলা যখন শুরু হয় তখন জেনাব শাহাব মাজারে ছিলেন সুবহানের স্ত্রী ও চার মেয়ে। অন্য অনেকের মতো তার বড় মেয়ে ২২ বছরের সায়মা দৌড়ে প্রতিরোধকারীদের সাহায্য করতে ছুটে যায়। এক ব্যক্তি বলেন, ‘নারীরাই সব সরঞ্জাম সংক্রান্ত কাজ করেন: তারা পাথর ছোড়ে, পানি নিয়ে আসে, লবণ নিয়ে আসে। তাদের সাহায্য ছাড়া লড়াই চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব’। টিয়ারগ্যাস মোকাবিলায় লবণপানি ব্যবহার করা হয়।   

সায়মা আর তার দুই ছোট বোন ১৪ বছরের মায়সারা ও ১২ বছরের কুরাত নিরাপত্তা বাহিনীর রাবার বুলেট হামলায় আহত হয়। মায়সারার চোখে আঘাত করেছে একটি ধাতব গুলি। শ্রীনগরে তাকে এক চাচির বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। কুরাতের লেগেছে মাথায় আঘাত। সায়মা পেয়েছে ঘাত আর হাতে আঘাত। সায়মা বলেন, প্রথমে মনে হলো আমার ওপরে গরম বালি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। আর বুঝতে পারলাম আমার ঘাড় পুড়ে যাচ্ছে।

আশপাশের এলাকা থেকে পালিয়ে আসা চিকিৎসকরা সন্ধ্যার পর তাকে মাজারে চিকিৎসা দেয়। তারা ব্যথ্যানাশক ব্যবহার ও সংক্রমণ প্রতিরোধে ইঞ্জেকশন দেয়। সুবহান বলেন, জানি না (মায়সারা) কেমন আছে। তাকে কি ভর্তি রাখা হয়েছে নাকি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে মানুষ জানতে পারছে না তাদের স্বজনেরা নিরাপদ আছেন কিনা।

ফাজির ২২ বছরের নাতি বিলালের ডান চোখ রাবার বুলেটের আঘাতে অন্ধ হয়ে গেছে। বিলালের বাবা মোহাম্মদ রমজান বলেন, রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছিল না, সে কারণে আমি তাকে হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন তারা চোখটি বাঁচাতে পারবে না। চিকিৎসকেরা তাকে কাশ্মিরের বাইরে বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বিলালকে শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রমজান জানেন না সে এখন কোথায় আছে বা কেমন আছে।

গত মাসে দিল্লি সরকার কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় থেকেই সেখানকার ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। সামান্য কিছু ল্যান্ডলাইন সচল থাকলেও সেগুলোতে আস্থা রাখা যায় না। আনসারের প্রতিরোধ সম্পর্কে কাশ্মিরের খুব কম বাসিন্দাই জানতে পারছেন। আর আনসারের খুব কম মানুষই সেখান থেকে বের হতে পারছেন।

শ্রীনগরের সবখানেই বন্ধ রয়েছে বাজার। দিল্লি সরকার সবকিছু স্বাভাবিক দেখাতে চাইলেও তা প্রতিহত করতেই কর্মীরা বন্ধ রেখেছেন দোকানপাট। গণপরিবহনও বন্ধ রয়েছে।

আনসারে দোকানের শাটারের ওপর দিয়ে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পোস্টার সাটানো হচ্ছে। এক তরুণ বলেন, ‘তাদের সন্ত্রাসী বলবেন না। তারা মুজাহিদ, তারা আমাদের জন্য লড়াই করছে’। অনেকেই বিশ্বাস করেন দিল্লির সিদ্ধান্তের প্রতিরোধে একমাত্র আশা এই মুজাহিদরা।

ভারত সরকার বলছে তাদের সিদ্ধান্তে কাশ্মিরের সন্ত্রাসবাদ কমবে আর উন্নয়ন আনবে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি শান্ত থাকায় সেই লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে। সুবহান বলেন, ‘তারা দাবি করছে, সব কিছু স্বাভাবিক। এটা কোন ধরনের স্বাভাবিকতা? তারা আমাদের মূল মসজিদ বন্ধ করে রেখেছে। জামিয়া মসজিদ বন্ধ। এটা যদি কেবল শুরু হয় তাহলে পরে তারা কী করবে’? সুবহান জানান, রাতের পাহারায় অংশ নেওয়া অব্যাহত রাখবেন তিনি। বলেন, আনসার সব কাশ্মিরির জন্য লড়াই করছে।

রাতের বেলায় তরুণদের এক একটি দল শহরের রাস্তায় অবস্থান নেয়। রাবার বুলেটের ক্ষত থেকে সেরে উঠতে থাকা এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, ‘যখন অ্যালার্ম বেজে ওঠে তখন সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়’। তার শরীর, ঘাড়, মাথায় একশোরও বেশি ছররা গুলি আঘাত করে। ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘খুব যন্ত্রণা হতো। যখন আঘাত লাগলো মনে হলো শত শত সুচ আমার শরীরে বিদ্ধ হলো’। তার মা খাতজিদা বলেন, আবারও অভিযানের আশঙ্কায় প্রতিরাতে কেঁপে ওঠে সে। তিনি বলেন, এখন আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।  

খাতজিদার ২৪ বছর বয়সী বড় ছেলে শাল বানানোর কাজ করেন। তিনিও রাতের পাহারায় অংশ নেন। বলেন, ‘তাদের বাড়িতে আসন্ন অভিযানের বিষয়ে অ্যালার্ম বাজানো হলে চারপাশ থেকে মানুষ মৌমাছির মতো ছুটে আসে। আমরা এখানে একটি পরিবারের মতো, মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতো বাস করি।’ আনসারের প্রতিরোধকে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হকের (অধিকার) জন্য লড়ছি, আমরা লড়ছি আজাদির (স্বাধীনতা) জন্য’। খাতজিদার ছেলে বলেন, তারা আমাদের মুছে ফেলতে চায়, আমাদের ইতিহাস মুছে ফেলতে চায়। আমরা তা হতে দেবো না’।

আনসার লেক সংলগ্ন সুরা এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের বসবাস। কয়েক সপ্তাহ আগে রয়টার্স তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছিল, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য অঞ্চলটি এখন ‘নো গো জোন’। এই অঞ্চলই এখন নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের জন্য বড় চালেঞ্জ। সুরার বাসিন্দারা সে সময় রয়টার্সকে জানান, যখনই কোনও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এলাকায় ঢোকার চেষ্টা করেন, সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদে গিয়ে সতর্কবাণী বাজান। লাউডস্পিকারে গান বাজাতে থাকেন। ‘অবৈধ দখলদারিত্বে’র বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয় সেই গানে।

সুরার সরু গলিতেও বাসিন্দারা সেনাবাহিনীকে মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন। তাদের সামনে ইট ও পাথর জমা করা রয়েছে। একটি ব্যারিকেডে বসানো হয়েছে তারকাঁটার বেড়া। ওই এলাকা টহল দেওয়া তরুণরা জানান, ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকেই চুরি করে আনা হয়েছে ওই তারকাঁটা।

এর আগে ৯ আগস্ট ‍জুমার নামাজের পর ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভটি এই সুরাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। আশপাশের বাসিন্দারা এসেও যোগ দেয় তাদের সঙ্গে। প্রতিরোধ গড়ে ওঠে অন্তত ১০ হাজার মানুষের। বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সেদিন নিরাপত্তা বাহিনীর ১৫০ থেকে ২০০ জন সদস্য সুরায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান বাসিন্দারা। একটা সময় ছররা ও টিয়ার গ্যাসও ছোড়ে পুলিশ।

ভারত সরকার প্রথমে এই ঘটনার কথা অস্বীকার করে জানায়, সুরায় ২০ জনের বেশি মানুষ জড়ো হয়নি। পরে বিবিসি ও আল-জাজিরায় প্রকাশিত ফুটেজে বিক্ষোভের চিত্র হাজির হলে সরকার জানায়, এক হাজার থেকে দেড় হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলো।

স্থানীয়রা জানান, এরপর থেকে সুরাতে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা একাধিকবার সুরায় প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। জিনাব শাহিব মাজারের পাশে উন্মুক্ত স্থানটিই বন্ধ করার উদ্দেশ্য তাদের। সেখান থেকেই যেকোনও আন্দোলনের সূত্রপাত হচ্ছে।

ভারতের আধাসামরিক পুলিশও জানিয়েছে, তারা ওই স্থানের নিয়ন্ত্রণ নিতে বদ্ধপরিকর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করছি। কিন্তু সেখানে অনেক বাধা।’

/জেজে/বিএ/এমওএফ/

x