ট্রাভেলগ কেওক্রাডংয়ে তারার ঝলকানি

মাসুদ সরকার রানা ১৮:৪৩ , আগস্ট ১০ , ২০১৮

কেওক্রাডংয়ের চূড়া থেকে রাতের আকাশ। দেখা যাচ্ছে অসংখ্য তারার ঝলকানি (ছবি: জাহেদ খান)কেওক্রাডং যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। কিন্তু পরিচিত কোনও সঙ্গী না পাওয়ায় তা আর হয়নি। তাই স্বপ্নযাত্রা যখন কেওক্রাডংয়ের ইভেন্ট ঘোষণা করে, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি—এবার যাবোই। নির্দিষ্ট দিনে আমরা রাতের বাসে বান্দরবানের উদ্দেশে রওনা দেই। পরদিন সকাল ৮টার দিকে সেখানে নেমে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেয়ে আগে থেকেই রিজার্ভ করে রাখা চান্দের গাড়িতে রুমার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। রুমা বাজার পর্যন্ত সড়ক মোটামুটি ভালো। ভাঙাচোরা কিছুটা কম।

রুমা থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও গাইড নিয়ে একই গাড়িতে চড়ে বগা লেকের দিকে রওনা দেই। রুমা থানা পেরিয়ে একটু সামনে যেতেই শুরু হয় ধুলার রাজ্য। রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল সেখানে। এ কারণে সামান্য দূরেও কিছুই দেখা যায়নি। যেতে যেতে আমরা হয়ে উঠলাম ধুলাময়! মনে হচ্ছিল, ধুলা রফতানি করা গেলে শুধু রুমা-বগা লেক সড়ক থেকেই প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো!

চুলে, নাকে, মুখে ধুলায় জর্জরিত হয়ে দুপুর নাগাদ পৌঁছালাম বগা লেকে। সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর থালার মতো একটা লেক। টলটলে স্বচ্ছ পানি মন কাড়ে। তবে বগা লেক দেখে আমার তেমন ভালো লাগেনি। হতে পারে গ্রামের ছেলে বলে এসব দেখে দেখে বেড়ে উঠেছি, তাই ভালো লাগেনি।
বগা লেক থেকে নেমে কেওক্রাডং যাওয়ার জন্য সবাইকে সাইন করতে হলো খাতায়। এরপর বগা লেকপাড়ের এক কটেজে লাঞ্চ করে নিলাম। পেঁয়াজ আর পাহাড়ি তেঁতুলের ভর্তাটা অমৃত লেগেছে। সেই স্বাদের কথা মনে পড়লে আজও জিভে জল এসে যায়। দুপুরে খেয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে সবাই রওনা হলাম কেওক্রাডংয়ের উদ্দেশে। হেঁটে পাড়ি দিতে হবে ৯ কিলোমিটার পথ।

পাহাড় ট্রেকিং আমার কাছে নতুন কিছু নয়। তাই ফুরফুরে মেজাজেই দুপুরের তপ্ত রোদের মধ্যেও হাঁটতে লাগলাম। আধঘণ্টার মধ্যেই আমাদের দলটা তিন ভাগ হয়ে গেলো। আমরা চারজন সামনে, মাঝে একদল আর পেছনে আরেক দল। পেছনের দলের কথা না ভেবেই বীরবিক্রমে এগিয়ে যেতে লাগলাম।

সরু পাহাড়ি পথটা শেষ হতেই উঠলাম মূল সড়কে। সেখানে যেতেই দু’পাশের বাঁশফুল যেন সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে স্বাগত জানালো। বাঁশের ফুল যে এত সুন্দর হতে পারে আমার ধারণাই ছিল না। এতক্ষণ হাঁটার ক্লান্তি ভুলিয়ে দিলো বাঁশফুলের সৌন্দর্য। যত হাঁটছিলাম ততই মুগ্ধ হয়েছি মনকাড়া পরিবেশ দেখে।

সুউচ্চ পাহাড়ের ওপর অবস্থিত বগা লেক (ছবি: রাতুল বিডি)খাড়া রাস্তা ধরে হাঁটছি তো হাঁটছিই, পথের যেন শেষ নেই। পাহাড়ি পথে একটানা বেশিক্ষণ হাঁটা যায় না। ২০ মিনিট পরপর জিরিয়ে নিচ্ছি, পানিও গিলছি। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে কেওক্রাডংয়ের চূড়ার দেখা মিললো। আমরা যেই জায়গায় পৌঁছালাম সেটি ছায়াঘেরা সুন্দর। সামনে তাকালেই দেখা যায় কেওক্রাডংয়ের শৃঙ্গ। জায়গাটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য জুতসই।

আমরা অগ্রজ দল তখন হাঁটতে হাঁটতে অনেক ক্লান্ত। পেছনের দলের ছায়াও দেখা যাচ্ছে না। তাই আর দেরি না করে বিশ্রাম নিতে কাঁচা ঘাসের ওপরে বসে গেলাম। দক্ষিণ দিক থেকে বইছে মৃদু হাওয়া। সূর্যটা তখন অস্ত যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা কয়েকজন মিলে পানি গিলে তৃষ্ণা মিটিয়ে গল্প করছি। এরই মধ্যে এলো আমাদের দ্বিতীয় দল। আরও প্রায় মিনিট দশেক পরে মিললো শেষ দলের দেখা। ক্লান্ত-শ্রান্ত সবাই আরও অনেকটা সময় ধরে বিশ্রাম নিলাম।

চূড়া দেখার আনন্দে মনের স্পৃহা তখন দ্বিগুণ। লম্বা বিশ্রামের পর আবারও শুরু করলাম হাঁটা। এবার আমরা দু’জন সবার আগে এগিয়ে চললাম। একটু পরেই তৌহিদ ভাই আমার চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে গেলেন। প্রায় দৌড়েও তার নাগাল পাচ্ছি না। ভাবছিলাম তাকে পেলেই একটু জিরিয়ে নেবো। কিন্তু যত হাঁটছি ততই যেন তিনি অনেক দূরত্বে চলে যাচ্ছেন।

একটানা ৪০ মিনিটের মতো হাঁটার পর এলাম দার্জিলিংপাড়া। এ জায়গাটা অনেক পরিচ্ছন্ন আর গোছানো। সেখানকার কয়েকটা দোকানে বসে আমরা আবারও সবাই একত্র হয়ে নাস্তা খেয়ে উজ্জীবিত হলাম। এরপর শুরু হলো সবাই মিলে একযোগে যাত্রা। প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছালাম চূড়ার কাছাকাছি। ততক্ষণে চারদিকের পরিবেশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। আমরা মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলোতে হাঁটছি। পথ সোজা হলেও খাড়া হওয়ার কারণে পা যেন আর চলছিল না। তার ওপর চার ঘণ্টার ওপর হেঁটেই চলছি। কাহাতক আর ভালো লাগে এত ঝক্কি! তবুও মনের জোরে হাঁটতে লাগলাম। অবশেষে হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছে গেলাম কেওক্রাডংয়ের কটেজে। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বেঞ্চে ব্যাগ রেখে বসতেই দরদর করে শরীর থেকে ঘাম ঝরতে শুরু করলো। আমাদের সবার অবস্থা তখন ক্লান্ত যোদ্ধার মতো।

কটেজ থেকে চূড়া খানিকটা ওপরে। কটেজে সবকিছু রেখে আমরা গেলাম চূড়ায়। অবশেষে আমাদের কেওক্রাডং সামিট হলো। হোক না তা ছোট একটা পর্বত, তবু প্রথমবার জয় করায় একটু আনন্দ তো আছেই। চূড়ায় গিয়ে চারপাশ দেখে আকাশের দিকে তাকাতেই চক্ষু ছানাবড়া! আকাশে যেন তারার মেলা বসেছে। যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি ঝলমল করছে তারা। পরিষ্কার আকাশ থাকায় তারাগুলো অনেক স্পষ্ট আর বড় দেখাচ্ছিল। আমি দার্জিলিংয়ের চেয়েও উঁচু পাহাড়ে গিয়েছি। কিন্তু সেখানে তারার এমন ঝলকানি দেখিনি। কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় বসে তারাময় আকাশটা দেখতে দারুণ লাগলো। মন চাইছিল, সেখানেই সারা রাত কাটাই!

কেওক্রাডংয়ের চূড়া থেকে সূর্যোদয় (ছবি: লেখক)আকাশটাকে দেখে মনে হচ্ছিল—কোনও সৌন্দর্য দেবী আমাদের বিমোহিত করার জন্য জ্বালিয়ে দিয়েছে মিটমিটে তারা। আকাশে এত তারা আগে দেখিনি! বান্দরবানের গহিনে না গেলে বোঝা যায় না আকাশে কী পরিমাণ তারা আছে। সেদিন প্রায় ঘণ্টাখানেক চূড়ায় ছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকাশকে প্রতিটি মুহূর্তে উপভোগ করেছি।

রাতের তারাময় আকাশ দেখে ডিনার করে সেদিনের মতো ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম। পরদিন সূর্যাস্তের আগেই জেগে উঠে চলে গেলাম হেলিপ্যাডে। সূর্যমামা তখন সবে লেপ ছেড়ে উঠবে উঠবে করছে! আধো আলোয় চারদিকের পরিবেশ ভারি সুন্দর লাগছিল। এরপরই উঠলো লাল সূর্য। হেলিপ্যাড থেকে সূর্যোদয়ের মুহূর্ত দেখার অনুভূতি অবর্ণনীয়। আমরা সবাই মিলে সেখানে অনেকক্ষণ কাটালাম। এরপর সকাল ৮টার দিকে নাশতা খেয়ে ফিরতি পথ ধরলাম।

 

/জেএইচ/চেক-এমওএফ/

x