ট্রাভেলগ দুবাই মিউজিয়ামে একঝটকায় প্রাচীন আরব সভ্যতা

রবিউল ইসলাম ২৩:১৮ , অক্টোবর ০৭ , ২০১৮

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে একটু বিরতি পাওয়া আর সোনার হরিণ হাতে পাওয়া যেন একই ব্যাপার! দুবাই-আবুধাবি যেতে আসতে ক্রিকেটারদের মতো আমাদের (বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সাংবাদিক) শরীরও হয়ে পড়েছিল নিস্তেজ। ভাগ্যিস মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে পা রাখার পরপরই দর্শনীয় কয়েকটি স্থানে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছিল। এশিয়া কাপে লঙ্কানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচ শেষে তিন দিনের বিরতি পেয়েছিলাম। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরদিন সকালেই প্রাচীন সভ্যতার টানে আমাদের যাত্রা শুরু হয়।
গন্তব্য দুবাইয়ের দক্ষিণ দিকে ২৩১ বছরের পুরনো আল ফাহিদি ফোর্ট অব দুবাই মিউজিয়াম। কল্পনার টাইম মেশিন ছাড়াই একঝটকায় আরব সভ্যতায় ঘুরে আসতে চাইলে যেতে হবে এই জাদুঘরে। সেখানে গেলে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও নিজেদের প্রাচীন দুনিয়ায় আবিষ্কার করবেন ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীরা।

দুবাই শহরের আল ফাহিদি দুর্গে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার দুর্লভ ইতিহাস। তেলখনি পাওয়ার আগে আমিরাতের আমিরদের জীবনধারার বর্ণনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দুবাই মিউজিয়ামে। বহু বছরের পুরনো জাদুঘরটির আধুনিক রূপান্তর হয়েছে ১৯৭১ সালে। ওই বছরেই এটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। উঠোনের অংশটুকু বাদ দিলে পুরো জাদুঘরই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এর নির্মাণকাল ১৭৮৭ সাল। ঐতিহ্যবাহী কোরাল-ব্লক ও চুন দিয়ে তৈরি হয়েছে দুর্গের দেয়াল। এর সবচেয়ে ওপরের তলার ভারবহন করে রাখা কাঠের পোল ও সিলিং হলো পাম গাছের পাতা, কাদা ও প্লাস্টারের।

আকাশচুম্বি অট্টালিকা দিয়ে ঘেরা দুবাই শহর। কিন্তু দুবাই মিউজিয়ামে বিপরীত দৃশ্য। ঠিক যেভাবে পুরান ঢাকাকে পিঠ দেখিয়ে নতুন চাকচিক্য নিয়ে গড়ে উঠেছে নতুন ঢাকা। পুরান দুবাই শহরে আধুনিক দুবাইয়ের মতো সুউচ্চ দালানের সারি নেই। পুরনো দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্র ধরা হয় বার-দুবাই ও দেরা নামক জায়গাগুলোকে। একসময় আরব আমিরাতের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এখানেই।

পোশাক, স্বর্ণ, প্রসাধনী ও অন্যান্য সামগ্রী বেচাকেনার গুরুত্বপূর্ণ স্থান বার-দুবাই ও দেরা। স্বর্ণ ও প্রসাধনী সামগ্রী কিনতে একবারের জন্য হলেও ঢুঁ মারতে হবে এই দুটি জায়গায়। এর চেয়েও বড় আকর্ষণ হলো ২৩১ বছর আগের সভ্যতা। কালের বিবর্তনে সেই সভ্যতায় অনেক পরিবর্তন এলেও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এটি।

আল ফাহিদি ফোর্ট অব দুবাই মিউজিয়ামে প্রবেশের জন্য গুনতে হয় ৩ দিরহাম (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭০ টাকা)। এর প্রবেশমুখে রয়েছে ব্রোঞ্জের কৃ্ত্রিম কামান ও গোলাবারুদ। জাদুঘরে ঢুকতেই দেখা যাবে বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী নৌকা ও আমিরাতি উইন্ড-টাওয়ারসহ পাম-পাতায় বানানো একটি বাড়ি। ভেতরের উঠোনেও একই সরঞ্জামাদি। এই উঠোনই জাদুঘরের কেন্দ্রবিন্দু। এর চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান ঐতিহাসিক নিদর্শন। মাঝখানে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি নৌকা। হঠাৎ সেখানে দাঁড়িয়ে কোনও আনমনা পর্যটক জায়গাটিকে নৌকা কেনাবেচার বাজার ভেবে ভুল করতে পারেন।
জাদুঘরের বাইরের সীমানায় এর চেয়েও লম্বা ডুবো (ঐতিহ্যবাহী নৌকা) আছে। খাল ও মাকদুম নদী পারাপারে ব্যবহার হতো এগুলো। এই নৌকার সামনেও কৌতূহলী পর্যটকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে ওঠে অবিরাম।

সুবিশাল উঠোনের মাঝখানে বুকটান করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী একটি খেজুর গাছ। এক কোণে শন আর বাঁশ দিয়ে নির্মিত ঘর। বেড়ার ফাঁক গলে সূর্যের আলো ঢুকে পড়ে ঘরে। বিছানা, চৌকি, সোফা, হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, রান্নার চুল্লি, হারিকেনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবই আছে সেখানে। শতাব্দী আগের হতদরিদ্র আরব বেদুঈনদের জীবনযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছে এভাবেই। উঠোনের আরেক পাশে আছে নলকূপ। 

শনের ঘরের পাশে দেখা যাবে গোয়ালঘর। এর পাশে এসে দাঁড়াতেই খেয়াল করলাম, এক রুশ দম্পতি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আছেন। যেন এই জীর্ণ গোয়ালঘরের অতীত বুকে নিয়ে আকাশচুম্বি ইমারতের মালিক হওয়া আরবদের ঝলমলে বর্তমান তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না!
বিস্মিত রুশ দম্পতির কৌতূহলী চোখমুখ পেরিয়ে সামনে যেতেই চোখে পড়ে বড় দুর্গ। সেখানে কাচের বাক্সে ভরা প্রাচীন অস্ত্র, বল্লম, ছুরিসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধের সরঞ্জাম। সেইসব দেখতে দেখতে দুর্গের বিপরীত পাশে সুড়ঙ্গ বেয়ে চলে যায় দৃষ্টিসীমা। এটি মূলত সিঁড়ির মতো গোলাকৃতির গুহা। এই সুড়ঙ্গ বেয়ে নামলেই দেখা যায় চোখধাঁধানো আলোর খেলা। সেখানে কিছুটা ভড়কে যেতে হয়! অন্তরাল থেকে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধুর সুর ভেসে এলে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পাওয়ার অনুভূতি হয়।

জাদুঘরে ঢোকার পর ডানদিকের হলে দেখবেন অস্ত্রের প্রদর্শনী। বাঁ-পাশের হলে আছে আমিরাতের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। আরবের প্রাচীন রাজাদের ছবিও চোখে পড়বে। ফ্রেমবন্দি থাকা এই মানুষগুলোই সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসককর্তা ছিলেন যুগের পর যুগ। বর্তমান রাজা আবু জায়েদের ছবিও আছে। সঙ্গে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দেওয়া আছে রাজাদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। পর্যটকরা চাইলে এসব ছবি পয়সার বিনিময়ে কিনতে পারবেন।
দুবাই মিউজিয়ামের উঠোনে লেখকএছাড়া জাদুঘরের ভেতরে আছে স্যুভেনিরের বিশাল দোকান, প্রবাল পাথর, অ্যাকুয়ারিয়াম, কামান, বল্লম, ছুরি, যোদ্ধাদের বেশভূষা। পর্যটকদের অনেককেই এসবের ছবি তুলতে দেখলাম। সেলফিও তুলছেন অনেকে।

জাদুঘরে ঘুরে ক্লান্ত পর্যটকদের তৃষ্ণা নিবারনের জন্য বহির্গমন পথে রাখা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রসংবলিত দোকান। সেখান থেকে খুচরা পয়সা দিয়ে কেনা যায় কোমল পানীয়। এভাবেই আল-ফাহিদি দুর্গে বেড়ানোর অসাধারণ দিন শেষ হয়ে আসে। ততক্ষণে হৃদয়ে আঁকা হয়ে গেছে স্থায়ী স্মৃতির দাগ।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/

x