কোন জেলার নামকরণ কীভাবে হযরত শাহ জামালের (রহ.) ‘কোহমিলা’ থেকে কালপরম্পরায় কুমিল্লা

জার্নি রিপোর্ট ২৩:০০ , মার্চ ১৩ , ২০১৯

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল আয়তনের বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার মন কাড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ ও মিনার, নদী, পাহাড়, অরণ্যসহ হাজারও সুন্দরের রেশ ছড়িয়ে আছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত।

দেশের আট বিভাগে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ) ৬৪ জেলা। পণ্য, খাবার, পর্যটন আকর্ষণ কিংবা সাংস্কৃতিক বা লোকজ ঐতিহ্যে বাংলাদেশের জেলাগুলো স্বতন্ত্রমণ্ডিত। প্রতিটি জেলার নামকরণের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস। প্রতিটি স্থানের নামকরণের ক্ষেত্রে কিছু জনশ্রুতি রয়েছে। এসব ঘটনা ভ্রমণপিপাসু উৎসুক মনকে আকর্ষণ করে। তাই বাংলা ট্রিবিউন জার্নিতে ধারাবাহিকভাবে জানানো হচ্ছে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার নামকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

চন্ডী মুড়া (ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স)কুমিল্লা জেলা
প্রাচীনকালে সমতট জনপদের অন্তর্গত ছিল কুমিল্লা জেলা। পরবর্তী সময়ে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই অঞ্চলে বৌদ্ধ দেববংশ রাজত্ব করে। নবম শতাব্দীতে কুমিল্লা হরিকেলের রাজাদের শাসনাধীনে আসে। প্রত্নপ্রমাণ থেকে পাওয়া যায়, দশম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ বছর এই অঞ্চলে চন্দ্র রাজবংশের শাসন ছিল। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

কুমিল্লার নামকরণ নিয়ে অনেক প্রচলিত লোককথা আছে। হযরত শাহ জামাল (রহ.) ইসলাম প্রচার করতে এসে এই স্থানের মাটির সঙ্গে তার মামার প্রদত্ত মাটির মিল দেখতে পেয়ে ‘কোহমিলা’ (কাঙ্ক্ষিত পাহাড়) বলে চিৎকার করেন। ‘কোহমিলা’ থেকে কালপরম্পরায় কুমিল্লা নামটির উদ্ভব।

চীনদেশের পরিব্রাজক ওয়ান চোয়াং এখানে ভ্রমণের বিষয়ে নিজের মাতৃমাষায় লিখতে গিয়ে ‘কিয়ামলঙ্কিয়া’ নামের একটি জনপদের কথা উল্লেখ করেন। পণ্ডিতদের অনুমান, উচ্চারণাঞ্চলিক কারণে তা ‘কমলাঙ্ক’ ও পরে ‘কুমিল্লা’ রূপ ধারণ করেছে।

দেব ও চন্দ্রবংশীয় রাজা পূর্ণচন্দ্র লালমাই পাহাড়ে একটি রাজ্যের পত্তন করেছিলেন। এটি বর্তমান কুমিল্লার নিকটবর্তী। এভাবে দ্রুপিয়ান কলিংসও একসময় কামালঙ্ক নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ধারণা করা হয়, কামালঙ্ক থেকেই কুমিল্লা নামটির উৎপত্তি হয়েছে। শোনা যায়, কুমিল্ল নামক একজন শাসকের নামানুসারে এখানকার নাম কুমিল্লা হয়।

এমনও লোককথা আছে, জনৈক ‘করিমুল্লা’ নামে একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি পাড়াগ্রামে থাকতেন। তিনি ছিলেন সেখানকার অধিনায়ক। তৎকালীন শাসন কাঠামোয় পদ সোপান প্রণালীতে এটি ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও সম্মানজনক। ধারণা করা হয়, তিনি নিজের নামানুসারে পাড়াগ্রামের নামকরণ করেন ‘কুমিল্লা’। আরেকটি উপকথার মাধ্যমে জানা যায়, এ অঞ্চলে টিপরা (পরে উচ্চারণ পরম্পরায় ত্রিপুরা হয়) রাজার স্ত্রীর নাম ছিল কমলা। কুমিল্লা শব্দটি উৎপত্তির মূল বা মা-শব্দ এই ‘কমলা’।

কুমিল্লার খাদি হিসেবে কুমিল্লার খাদি বস্ত্র দেশ-বিদেশে জনপ্রিয়। চাহিদার কারণে দ্রুত তাঁত চালানোর জন্য পায়ে চালিত প্যাডেলের নিচে মাটিতে গর্ত করা হতো। এই গর্ত বা খাদ থেকে যে কাপড় উৎপন্ন হতো সেই কাপড়ই খাদি। এভাবে খাদি নামের উৎপত্তি। ক্রমান্বয়ে এই কাপড় খাদি বা খদ্দর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ছিল খাদি শিল্পের স্বর্ণযুগ। বাংলার লোকশিল্পের আবহমান সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম কুমিল্লার মৃৎশিল্পের বিভিন্ন পণ্য।

রূপসাগর পার্ক (ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স)কুমিল্লার রসমালাইয়ের সুনাম আছে দেশজুড়ে। ঊনিশ শতকে ত্রিপুরার ঘোষ সম্প্রদায়ের হাত ধরে রস মালাইয়ের প্রচলন হয়। তখন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মিষ্টি সরবরাহের কাজ মূলত তারাই করতেন। মালাইকারির প্রলেপ দেওয়া রসগোল্লা তৈরি হতো সেই সময়। পরে দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি ক্ষীরের মধ্যে ডোবানো রসগোল্লার প্রচলন হয়। ধীরে ধীরে সেই ক্ষীর রসগোল্লা ছোট হয়ে রসমালাইয়ে পরিণত হয়েছে।

জেলার পর্যটন স্পটের মধ্যে রয়েছে ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), শাহ সুজা মসজিদ, বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন, উটখাড়া মাজার, বায়তুল আজগর জামে মসজিদ, নূর মানিকচর জামে মসজিদ, কবি তীর্থ দৌলতপুর (জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত স্থান), গোমতী নদী, নওয়াব ফয়জুন্নেছার স্বামী গাজী চৌধুরীর বাড়ি সংলগ্ন মসজিদ, নজরুল ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল ও রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়ের মূর্তি, মুন্সীবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, রূপসাগর পার্ক।

প্রত্নসম্পদের মধ্যে বিখ্যাত শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে লালমাই ময়নামতি পাহাড়। এছাড়া আছে শালবন বিহার, কুটিলা মুড়া, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, সতের রত্ন মুড়া, রানির বাংলা পাহাড়, আনন্দ রাজার প্রাসাদ, ভোজরাজার প্রাসাদ, চন্ডীমুড়া। প্রাচীন নির্দশন হিসেবে এখানে কয়েকটি দীঘি রয়েছে।

/জেএইচ/

x