ট্রাভেলগ সাদা পাথরের স্বর্গরাজ্যে

দেবাশীষ রনি ১৬:০৩ , আগস্ট ১২ , ২০১৯

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরসৌন্দর্যের প্রাচুর্যে ভরা সিলেট বিভাগ। সবখানে ছড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটনকেন্দ্র। সবুজে মোড়া পাহাড়ের কোলঘেঁষা পাথুরে নদী, ঝরনা, বন, চা-বাগান, নীল জলরাশির হাওর; কী নেই এখানে! সিলেটের এমন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের পর্যটক আর ভ্রমণপ্রিয় মানুষ ভিড় জমান। সিলেটের অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম নয়নাভিরাম ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদের উৎসমুখে এর অবস্থান।

সিলেটের সীমান্তবর্তী একটি নদের নাম ধলাই। ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে এসেছে এটি। ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সাদা সাদা পাথর। ওপারে উঁচু পাহাড়ে ঘেরা সবুজের মায়াজাল। সেখান থেকে নেমে আসা ঝরনার অশান্ত শীতল পানির অস্থির বেগে বয়ে চলা। গন্তব্য তৃষ্ণার্ত ধলাইয়ের বুক। স্বচ্ছ নীল জল, সাদা পাথর আর পাহাড়ের সবুজ মিলেমিশে যেন একাকার। ধলাইয়ের বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাথরের বিছানা শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে হাজার গুণ।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরসাদা পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা ঝরনার পানির তীব্র স্রোত নয়ন জুড়ায়। শীতল জলের স্পর্শে প্রাণ জুড়িয়ে যায় নিমিষে। পাথরের ওপর দিয়ে প্রবল বেগে বয়ে চলা পানির কলকল শব্দে যেন পাগল করা ছন্দ। বরফ গলার মতো ঠাণ্ডা সেই পানি। বেশিক্ষণ গা ভেজালে শরীরে শীতের কাঁপন লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়।

ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরশহরের যান্ত্রিকতা ফেলে কয়েকদিন আগে সকালবেলা গাড়িতে করে যাত্রা শুরু। গন্তব্য ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর। সঙ্গী বেশ কয়েকজন। সিলেট নগরের আম্বরখানা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কটির চারপাশে শুধু সবুজ চা বাগান। দেখলে মনে হয় নীল আকাশ যেন সবুজ গালিচার ওপর তাঁবু টানিয়েছে। সড়কটি ধরে চলতে চলতে সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় মন। দু’হাতে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করতে পারলে মন্দ হতো না!

ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরসংস্কারকাজ চলায় বিমানবন্দর থেকে বাকিটা পথের কিছু কিছু স্থান নাজুক। তবে বছরখানেক আগে দেখেছিলাম রাস্তার বেহাল দশা। সেই তুলনায় এখন অনেকটাই ভালো বলা চলে। এই সড়ক দিয়ে ভোলাগঞ্জ বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে দুই ঘণ্টার মতো।

ভোলাগঞ্জ বাজার ফেরিঘাটফেরিঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে মূল গন্তব্য সাদাপাথরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। নৌকা যত সামনে এগোয়, মুগ্ধতা ততই বাড়তে থাকে। ধলাই নদের স্বচ্ছ নীল জলে নৌকা চলতে চলতে চোখে পড়ে মেঘালয়ের আকাশছোঁয়া পাহাড়। মনে হচ্ছিল আকাশে হেলানো উঁচু উঁচু পাহাড়ের সারি।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে যাওয়ার নৌপথচারপাশের চোখধাঁধানো সব দৃশ্য দেখতে দেখতে ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাই নদের উৎসমুখে। তীরে ভেড়ে নৌকা। তীরে নামতেই চোখে আটকে যায় পাথরের স্তূপে। পাথরগুলো সব সাদা। ছোট, মাঝারি, বোল্ডার আকৃতির পাথর। সাদার মধ্যে নিকষ কালো পাথরও আছে। কোনোটি খয়েরি। যেন এলাকাজুড়ে পাথরের বিছানা।

পাথর মাড়িয়ে ঝরনার আবাহন। কোথাও হাঁটু সমান, আবার কোথাও কোমর পানি। কোথাও তারও অনেক বেশি। পাথরের ওপর দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তৃষ্ণার্ত ধলাইয়ের মুখে। ধলাইয়ের বুকে সেই জলে নেমে নিজেকে শীতল করি। অনেকক্ষণ গা ভেজানোর পর প্রচণ্ড গরমেও শরীরে শীতের কাঁপন লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। বিকালবেলা অসম্ভব সুন্দরকে বিদায় জানিয়ে ফেরার পথ ধরি। মন বলছিল, আহ! কত অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমার এই দেশ!

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরযেভাবে যাবেন
* সড়কপথ: সিলেট শহরের আম্বরখানা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ভোলাগঞ্জ বাজার। ভাড়া জনপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। চাইলে লেগুনা কিংবা অন্য অন্যান্য গাড়ি ভাড়া করেও যাওয়া যায়। ভোলাগঞ্জ বাজারের ফেরিঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করতে হবে। ভাড়া যাওয়া-আসা মিলিয়ে ৮০০ টাকা।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে যাওয়ার নৌপথ* নৌপথ: সিলেট শহর থেকে বাদাঘাট হয়ে উমাইরগাঁও। সেখান থেকে সরাসরি ভোলাগঞ্জের নৌকা ভাড়া করা যায়। ভাড়া ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরসচেতনতা ও সতর্কতা
* সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে তা নষ্টের কারণ হওয়া ঠিক নয়। পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কিছু অবশ্যই করা উচিত হবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় তেমন কিছু মনের অজান্তেও ফেলে আসা ঠিক নয়। প্রকৃতিকে বেঁচে থাকতে দিতে হবে তার নিজের মতো করে।

* পর্যটন স্থানটি ভারত সীমান্তবর্তী। তাই সীমান্তের কাছাকাছি না যাওয়াই ভালো। ঘুরে বেড়ানোর সময় বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড সদস্যদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। আর ভুলেও গভীর পানিতে নামা যাবে না। তীব্র স্রোতের কবলে পড়লে সাঁতার জানা মানুষেরও বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/

x