ট্রাভেলগ রহস্যময় স্টোনহেঞ্জ দর্শন

রবিউল ইসলাম ১৮:২২ , আগস্ট ১৪ , ২০১৯

ইংল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ স্টোনহেঞ্জ এককথায় অসাধারণ। তবে কিছু পাথরখণ্ড ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই! সালিসবুরির কাছে নিওলিথিক যুগের এই পাথর বৃত্তের সৃষ্টি আজও এক রহস্য। এজন্যই পর্যটকদের কাছে এটি বেশ আকর্ষণীয়।

‘তোমার ঐতিহাসিক ব্যাপারে আগ্রহ থাকলে যেতে পারো’– সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি পরামর্শ দিলেন এভাবেই। ব্রিস্টল থেকে টন্টনে ঢুকেই একদিনের ব্যবধানে রনি ভাই-সাকেব ভাই স্টোনহেঞ্জ দেখে ফেলেছেন। ফেসবুকে সেসব ছবি চোখে পড়ায় রনি ভাইকে ফোন দিলাম। তার মুখে গল্প শোনার পাশাপাশি গুগলে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে অল্পবিস্তর পড়াশোনার সুবাদে জায়গাটির ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহ তৈরি হলো। কিন্তু টন্টনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের দশজনের দলটা স্টোনহেঞ্জে যাওয়ার সময় বের করতে পারেনি। টন্টন থেকে নটিংহাম যাওয়ার পথে অবশেষে সেই ইচ্ছেপূরণ হলো।

স্টোনহেঞ্জবাসে চড়ে টন্টন থেকে নটিংহাম ছয়-সাত ঘণ্টার পথ। এত্তো লাগেজ নিয়ে এমন লম্বা পথ বাসে কীভাবে পাড়ি দিবো ভেবে সবার কপালে ভাঁজ। এর মধ্যে সুমন ভাইয়ের মাথায় আইডিয়া এলো– ‘রবি, আমরা নিজেরাই তো একটা ১২ আসনের গাড়ি ভাড়া করতে পারি।’ যেই ভাবা সেই কাজ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী নটিংহামে যাওয়ার পথে স্টোনহেঞ্জ দেখবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাওয়ার পথে ঠিক নয়, ওয়াল্টশায়ার কাউন্টিতে অবস্থিত স্টোনহেঞ্জ দেখে নটিংহামের পথ ধরতে অনেকটা পিছিয়ে আসতে হবে! তবুও যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে! 

আমাদের সবুজ রঙা গাড়ি ছুটে চলছে। যেতে যেতে ফিরে গেলাম ২০০০ সালে। সেই সময় কম্পিউটারে স্ক্রিনে প্রথম এই রহস্যময় পাথরখণ্ডগুলো দেখি। এবার সামনে থেকে স্টোনহেঞ্জ দেখবো– এমন রোমাঞ্চ নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওয়াল্টশায়ার পৌঁছে গেলাম।

গাড়ি থেকে নেমে কম্পার্টমেন্টে ঢুকতেই চোখে পড়ে খাবারের দোকান, স্টেশনারি হাউস, স্যুভেনির হাউস। একইসঙ্গে বিশাল আকৃতির বাগান। সেখানে খড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট কিছু ঘর। একপাশে বিশাল পাথরখণ্ডের একটি নমুনা।

স্টোনহেঞ্জস্টোনহেঞ্জ দর্শনের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের খরচ করতে হয় ২১ পাউন্ড। ভ্রমণসঙ্গী ইয়াসিন রাব্বি দ্রুত টিকিট কেটে নিয়ে এলো। আমরা স্টোনহেঞ্জ দেখার উদ্দেশে পা বাড়ালাম। তবে এর আগে ছোট্ট একটি জাদুঘরে এ প্রসঙ্গে ধারণা পাওয়া গেলো। এতে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক তথ্য রয়েছে। কীভাবে ধীরে ধীরে এর পরিসর বেড়েছে, সেই সম্পর্কেও বলা আছে।

প্রায় চার হাজার বছর আগে তৈরি পাথরখণ্ডের এই স্তূপ নিয়ে হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় অনেক প্রশ্ন। কারা বানিয়েছে স্টোনহেঞ্জ? কেন বানিয়েছে? এটা কি কোনও কবরস্থান? এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিছু কিছু ব্যাখা ছোট্ট জাদুঘরটিতে আছে। সেখানে একটি ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে স্টোনহেঞ্জের অতীত ও বর্তমান কিছু তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে।

স্টোনহেঞ্জঐতিহাসিকেরা স্টোনহেঞ্জ নির্মাণের তিনটি সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। অনেকে প্রথম ধাপটি প্রাগৈতিহাসিক যুগের চেয়ে এক হাজার বছর আগের হিসাব করলেও এ নিয়ে দ্বিমত আছে। প্রথম ধাপে এর বাইরের দিকের ৩৬০ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার পরিখা খননের কাজ শুরু হয়, যার গভীরতা ছয় ফুট। পরিখার উত্তর-পূর্বে একটি বড় প্রবেশপথ ও দক্ষিণ দিকে একটি ছোট প্রবেশপথ আছে। এই পরিখা ও এর ঢালু কিনারাকে একত্রে ‘হেঞ্জ’ বলা হয়।

পুরো হেঞ্জজুড়ে রয়েছে ৫৬টি ছোট ছোট খাদ, এসবের প্রতিটির ব্যাস তিন ফুটের মতো। ১৭ শতকে জন অব্রে নামক এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক এই খাদ বা গর্ত আবিষ্কার করেন। তার নামেই এগুলোর নামকরণ হয় ‘অব্রে হোল’। ধারণা করা হয়, গর্তগুলোকে ‘ব্লুস্টোন’ অথবা কাঠের তক্তা দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল। ব্লুস্টোন হচ্ছে স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে ছোট আকারের পাথর, যেগুলো ভেজা অবস্থায় কিছুটা নীলাভ দেখায়।

জাদুঘরে স্টোনহেঞ্জের নকশাদ্বিতীয় ধাপে ঠিক কী কাজ হয়েছিল সেই প্রমাণ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, আগেরটি শেষ হওয়ার ১০০ থেকে ২০০ বছর পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কাজ। এ সময় থেকে স্টোনহেঞ্জকে সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। তখন কেন্দ্রে ছাদসদৃশ গঠন বানানো হয়। বৃত্তাকার পরিখায় শবদাহের জন্য নতুনভাবে আরও ৩০টি গর্ত খনন করা হয়।

তৃতীয় ধাপের কাজ শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পর। প্রধান কাজ মূলত এ সময় হয় এবং এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ ধাপ। তখন অব্রে হোলগুলোর ব্লুস্টোন তুলে ফেলে বসানো হয় ৩০টি বিশালাকার ‘সারসেন’। স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে বড় পাথরগুলোকে সারসেন বলা হয়। এগুলো ২৫ মাইল দূরবর্তী মার্লবোরো নামক স্থান থেকে আনা হয়েছিল। প্রতিটি সারসেন উচ্চতায় ১৩ ফুট ও প্রায় ৭ ফুট চওড়া। এগুলার ওজন প্রায় ২৫ টন! ওই সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এত বড় পাথরগুলো কীভাবে টেনে আনা হয়েছে তা আজও বিস্ময়!

স্টোনহেঞ্জস্টোনহেঞ্জ একটি সমাধিস্থলই ছিল, আশেপাশের এলাকা থেকে পাওয়া হাড় ও কঙ্কাল থেকে সেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয়, বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে লোকজন এখানে উপাসনার জন্য আসতো। এতে ৬৩ জন মানুষের হাড়ের টুকরো খুঁজে পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হয়েছে। হুট করেই মনে পড়লো কিছুদিন আগে তো এখানে অনেক মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। নরবলি হতো কিনা কে জানে! ভাবনার জগতে চলে গেলাম– গভীর রাতে পুরোহিতের নেতৃত্বে একদল মানুষ মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন স্টোনহেঞ্জের দিকে। ভাবতেই কেমন যেন লাগছে!

স্টোনহেঞ্জঅনেকেরই ধারণা, অদ্ভুত গঠনের স্টোনহেঞ্জকে পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহার করতেন ধর্মযাজকরা। তারাই এর নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন। তাদের বলা হয় ড্রুয়িদ। ১৭৪০ সালে এটি ড্রুয়িদদের প্রার্থনার ঘর হিসেবে ব্যবহার হতো। প্রাচীন জাদুর কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবকহৃত হতো বলে জনশ্রুতি আছে। জাদুঘরে এসব তথ্যে চোখ বোলাতে বোলাতে আধঘণ্টা কীভাবে কাটলো টেরও পেলাম না।

এবার আমাদের সেই রহস্যময় পাথরখণ্ডের সমষ্টি দেখার পালা। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে উঠতে দেরি হলো না কারও। ১০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

স্টোনহেঞ্জগাড়ি থেকে নেমে হা হয়ে দেখছি! সত্যিই কি আমরা স্টোনহেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে! ব্যাপারটা যে কল্পনার রাজ্যে আবদ্ধ নেই, তা বুঝতে হাতে চিমটি পর্যন্ত কাটা হলো। সত্যিকার অর্থেই স্টোনহেঞ্জ অপার এক সৌন্দর্যের নাম। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্টোনহেঞ্জ দেখছেন, ছবি তুলছেন। মোদ্দাকথা, তারা বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করছেন বিস্ময়কর এই জায়গা। তবে কাছে যেতে না পারায় অনেকের মধ্যে ছিল আক্ষেপ।


১৯৮৬ সালে স্টোনহেঞ্জকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা দেয় ইউনেস্কো। এরপর থেকে এর কাছে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। স্টোনহেঞ্জের খুব কাছাকাছি পর্যটকদের চলাফেরা নিষিদ্ধ। এ কারণে দর্শনার্থীদের একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখতে হয় নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিস্ময়টিকে।

স্টোনহেঞ্জপ্রতিদিনই স্টোনহেঞ্জে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভিড় জমে। কার্ডিফ থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসেছেন পিটার নিক্সন নামের একজন শিক্ষক। পৃথিবীর ইতিহাসসহ জটিল সব রহস্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘এই ছেলেমেয়েরা কার্ডিফে পড়াশোনা করে। শিক্ষা সফরে এখানে এসেছে ওরা। স্টোনহেঞ্জের ইতিহাস বেশ রহস্যময়। আশা করি, এই প্রজন্ম একদিন তা উন্মোচন করতে পারবে।’
১৯১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকারের হাতে স্টোনহেঞ্জ তুলে দেন শিল্পপতি সেসিল চাব। এরপর এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসিল ও ম্যারি চাবের উদারতা স্টোনহেঞ্জকে বাঁচিয়েছে নিঃসন্দেহে। এর মাধ্যমে অবহেলিত ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি পরিণত হয়েছে ব্রিটেনের জাতীয় সম্পদে।
স্টোনহেঞ্জস্টোনহেঞ্জের গঠন খানিকটা জটিল। তবে এটি তৈরিতে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। ধূসর বর্ণের প্রায় ১৩ ফুট উচ্চতার পাথরগুলোতে ফুটে উঠেছে জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের ছাপ। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে এই স্থাপত্যের খানিকটা মিল পাওয়া যায়। স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলোর গঠনে আছে দুটি বৃত্তাকার ও দুটি ঘোড়ার খুরের নলের আকারবিশিষ্ট পাথরের সারি। এছাড়া কতগুলো পৃথক পাথর রয়েছে অল্টার স্টোন।

স্টোনহেঞ্জের সামনে লেখকসময় ফুরিয়ে এসেছে। আমাদের যেতে হবে নটিংহামে। সবুজ রঙের বাসটিতে চেপে বসার পরও যতক্ষণ পারা যায়, পেছন ফিরে বিস্ময়কর এসব পাথরখণ্ড থেকে দৃষ্টি সরলো না।
ছবি: লেখক

/জেএইচ/

x