ট্রাভেলগ বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক

ওয়ালিউল বিশ্বাস ০০:০০ , আগস্ট ১৫ , ২০১৯

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথেশিলিগুড়ির জিপ চালকরা নানান ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন মনে। সেসব যে আমাদের একেবারে কাবু করছে না তা নয়। কিন্তু বেশিক্ষণ সাহস ধরে রাখা যাচ্ছে না। যেমন, বেশিরভাগ ড্রাইভার জানালো– শিলিগুড়ি থেকে সিকিম যেতে জিপ নেওয়ার বিকল্প নেই। এখানে সরকারি বাস চলে, কিন্তু সবার জন্য না! তবে দু’একজন জানালেন– বাস ঠিকই আছে, তবে স্থানীয় বাসে ওঠা আর সমস্যার লড়িতে ওঠা একই বিষয়। বাস যাবে খুব ধীরগতিতে। র‌্যাম্পোতে বাস থামলে পুরো বাসের লোকজন সিকিমে যাওয়ার অনুমতি নেবে। এ কারণে রাজ্যের দেরি হবে।

র‌্যাম্পো হলো সিকিম রাজ্যের দূতাবাসের মতো। সেখান থেকেই সিকিমে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। পাসপোর্টে আগমন ও বহির্গমনের সময়সহ সিল মারা হয়। বিদেশিদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।

দেরির কারণে প্রধান যে সমস্যা হবে তা হলো, সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে নামার পর রাত নেমে আসবে। তখন কোনও হোটেল ভাড়া পাওয়া যাবে না। এসব কথা আমরা বিশ্বাস করার ভঙ্গি দেখিয়েছি। তাদের কথাতেই একপ্রকার সায় দিতে হয়েছে। কারণ সেখানকার জিপ চালকরা বেশ একতাবদ্ধ। আর জিপে সময়ও কম লাগে।

আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো, দেড়শ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথে বাংলাদেশি, নেপালি ও বিদেশিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম। এসব দেশের পর্যটকরা কোনোভাবেই জিপে ভারতীয়দের সঙ্গে ভাগাভাগি করে যেতে পারবেন না। এমনকি বাংলাদেশি বা বিদেশিদের স্ব স্ব দেশের নাগরিকদের সঙ্গেই যেতে হবে। আর সর্বনিম্ন দুই জন হতে হবে। তাই আমরা দু’জন হওয়ায় বিপদ যেন বেড়ে গেলো। কারণ আটজনের জিপের ভাড়া দু’জনে দিতে হবে। আর সেটা ২০০০-২৫০০ রুপি!

আমরা বাংলাদেশি বলেও তাদের মধ্যে একটা ভ্রু কুঁচকানো ভাব দেখা গেলো। কারণ র্যা ম্পোতে অনুমতি নেওয়ার বিলম্ব। শিলিগুড়ির এই চালকদের সঙ্গে বনিবনা করাটা বেশ কঠিন হয়ে উঠলো। একবার মনে হলো, দার্জিলিংয়ের দিকে হাঁটা দিই। পরে অন্য একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো।

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথেচ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি আসার সময়ের ঘটনা। সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি মহাসড়ক। সেখান থেকে বাস অহরহ শিলিগুড়ি যায়। এমন একটা বাসে উঠে বসেছি। হঠাৎ দেখি আকাশ কালো হয়ে গেলো। আমি ও সহযাত্রী আশিক মুস্তাফা একেবারে পেছনের আসনে বসা। পাশেই সৌম্য চেহারার শুভ্র চুলের একজন ভদ্রলোক। জানালায় চোখ মেলে রেখেছেন। নতুন এলাকা, তাই খুচরো আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। হালকা স্বরে বললাম, দাদা এদিকে কি নিয়মিতই বৃষ্টি হয়? ভদ্রলোক একবার আমাকে দেখে মুখটা হাসি হাসি করে মেঘের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘এখন তো দাদা বৃষ্টিরই সময়। পাশে নদী-পাহাড়। বৃষ্টি তো হবেই!’

আবহাওয়া তাহলে ঠাণ্ডাই থাকে?
-তা তো বটেই। মেঘ দেখছেন না? এ মেঘে শিলাবৃষ্টি নামে।
আপনি দাদা কোথায় যাবেন?
-সামনের স্টপেজেই।
এখানেই বাড়ি আপনার?
-না।
-তাহলে কোথায়?
লালমনিরহাট!

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথেমেঘ থেকে বৃষ্টি নয়, যেন আমি পড়লাম! এ ভদ্রলোকও বাংলাদেশি। তাকে বললাম, ভাই আপনি বাংলাদেশি অথচ এখানকার খবর বলছেন! ভদ্রলোক এবারও হাসলেন। তবে এবার মেঘের দিকে নয়, আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা আরও প্রসারিত করে বললেন, ‘নতুন জায়গা। আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা না বললে ঠকাবে। তাই আপনার সঙ্গে এভাবে একটু কথা বলে নিলাম আরকি!’

শিলিগুড়িতেও যখন ভাড়ামতো জিপ পাচ্ছিলাম না, তখন সেই সৌম্য চেহারার আত্মবিশ্বাসী ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেলো। এতে কাজও হলো। বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সহযাত্রী আশিক ও আমি এক ড্রাইভারকে প্রস্তাব দিলাম, ছয় আসনের জিপে আমি ও আশিক থাকবো। আর যাত্রাপথে দু’একজন যা পাবেন নিয়ে নেবেন। কোনও সমস্যা নাই। তবে শর্ত একটাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী খোঁজা যাবে না! ভাড়া পাবেন ১৩০০ রুপি!

ব্যস, চালকবেচারা খানিক যোগ-বিয়োগ করে হিন্দিতে কিছু একটা বললেন। যার অর্থ হলো, গাড়িতে উঠে পড়ুন দাদা। চলুন যাই। শুরু হলো আমাদের শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের ৫ ঘণ্টার যাত্রা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জিপে চড়ে বসলাম। (চলবে)

ছবি: লেখক

/জেএইচ/

x