ট্রাভেলগ গ্যাংটকে প্রকাশ্যে ধূমপান করলেই লাইসেন্স বাতিল!

ওয়ালিউল বিশ্বাস ১৮:০০ , আগস্ট ১৬ , ২০১৯

রাতের গ্যাংটকগ্যাংটকে নেমেছি রাত নয়টার দিকে। আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীদের জন্য এ সময়টা মধ্যরাত। হোটেল-মোটেল খুঁজতে খুঁজতে রাত ১০টা। পেট শুকিয়ে হাড় বেরিয়ে যাওয়ার দশা! কোনও রকম হাঁটতে হাঁটতে বাঙালি একটি রেস্তোঁরায় ঢুকলাম। তাকিয়ে দেখি, কাউন্টারে মৈনাক পর্বতের মতো বিশালদেহী এক লোক। সামনে মদের গ্লাস। চোখটা নিভু নিভু। সামনের মেঝেতে চেয়ার টেবিল কাত হয়ে আছে। খাবারের প্লেট নিচে ছাড়ানো-ছিটানো। বাংলা ছবি দেখার অভ্যেস থাকায় মনে হলো, মাত্রই এখানে মারপিট হয়েছে! নায়ক-ভিলেন এলাকা তছনছ করে দিয়েছে।

এমন অবস্থায় ভেতরে ঢোকা বোকামি। কিন্তু উপায় নেই। ভেতরে ঢুকতেই পর্বতদেহী মানুষটা চোখমুখ একসঙ্গে হা করে বলে উঠলেন, ‘দাদা, কিছু লাগবে? পার্সেল দেওয়া যাবে শুধু। দোকান বন্ধ করে দিয়েছি।’

আমি তার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে। তিনি কিছুটা বিব্রত। চটজলটি রুটি আর মুরগির অর্ডার দিলাম। তাকে ভড়কে দিতেই জিজ্ঞেস করলাম, দাদা মদও পাওয়া যায় নাকি? ভদ্রলোকের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। বললেন, ‘না, নেই!’

স্বাভাবিকভাবে কথা চালিয়ে গেলাম। আবার বললাম, ‘শীতের দেশ, থাকা উচিত। আশেপাশে নাই? তার নির্লিপ্ত উত্তর, ‘না।’ আর কথা বাড়ালাম না। লোকটা এখন অনেকটাই সিরিয়াস হয়ে গেছেন।

গ্যাংটকের লালবাজারপরদিন সকালে আবার একই খাবারের দোকানে গেলাম। এবার একেবারে নিপাট ভদ্রলোক তিনি। দাঁতগুলো হাসিতে ঝলকে উঠছে। আমি আর সহযাত্রী আশিক (বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক) সকালের নাশতা সেরে নিলাম। ক্যাশে এসে টাকা দেওয়ার সময় আর আজেবাজে প্রসঙ্গে গেলাম না। বেচারা গতকাল রাতে বিব্রত হয়েছেন। মাতাল অবস্থায় বিব্রত হওয়াটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

টাকা দিতে দিতে বললাম, ‘দাদা সিমের একটা ভালো প্যাকেজ কিনবো। এখানে মোবাইল-সিমের দোকানটা কোথায় বলতে পারেন? তিনি এবার বেশ সুন্দর করে বললেন, ‘সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামবেন। নাক বরাবর একেবারে নিচে চলে যাবেন। দেখবেন একটা মদের বার আছে! তার পাশের গলিতে পাবেন। কিংবা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের পাশেও পাবেন। নিয়ে নিতে পারেন।’

গ্যাংটকের লালবাজার চৌরাস্তামনে মনে বললুম, মৈনাক পর্বত বলে কী! মদের দোকান চিনিয়ে পরে সিমের দোকানের কথা বলছে! প্রথমে অবাক লাগলেও পরে বুঝতে পেরেছি, সিকিম রাজ্যটাই এমন। মুদি দোকানের চেয়ে এখানে মদের দোকান বেশি। এবং এটা বৈধ। যে কেউ মদ কিনতে ও খেতে পারেন। এক্ষেত্রে কোনও নিষেধ নেই।

কিন্তু সাবধান! ধূমপান করলে এখানে ঝামেলা আছে। বিশেষ করে স্থানীয়রা এ দিকটি খুব মেনে চলেন। এমন নিয়মও আছে, যদি কোনও ড্রাইভার প্রকাশ্যে সিগারেট ধরায় তার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। কোনও ক্ষমা নেই!
গ্যাংটকের এমজি মার্কেট চত্বরসেজন্য ভ্রমণপিপাসুরা স্বস্তিতে বেড়াতে পারেন। গ্যাংটকের এমজি মার্কেট চত্বরে দেখেছি বসার জায়গা আছে। গাছ দিয়ে সাজানো। রাত অবধি এখানে আড্ডা চলে।

সিকিমপর্বতারোহীদের জন্য কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হিমালয়ের কোলঘেঁষে ভারতের সিকিম রাজ্য নিয়ে দারুণ একটা তথ্য দেওয়া যাক। বিশ্বের প্রথম শতভাগ অর্গানিক অঞ্চলের স্বীকৃতি পাওয়া রাজ্য এটাই। জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করা হয় এখানে। ফলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি (এফএও) থেকে সম্মানজনক ফিউচার পলিসি গোল্ড অ্যাওয়ার্ড জিতেছে রাজ্যটি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশবান্ধব রাজ্য হিসেবে সিকিমে বেশকিছু সংস্কারমূলক কাজ হয়েছে। রাজ্যটিকে পর্যটনের স্বর্গ হিসেবে উন্নয়ন ঘটাতে সহায়ক হয়েছে এসব উদ্যোগ।
২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে সিকিমে অর্গানিক চাষাবাদ শুরু হয়। সেই থেকে কৃষকরা জৈব সার ব্যবহার করছেন। দীর্ঘমেয়াদি এই সিদ্ধান্তের ফলে মাটির উর্বরতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনধারণ ও স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। একই বছর রাজ্যে রাসায়নিক সার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়।

সিকিমরাসায়নিক সার ও কীটনাশক থেকে উত্তরণই কেবল সিকিমে নির্মল পরিবেশের জন্য সহায়ক হয়েছে তা নয়, একইসঙ্গে রাজ্যের ৬ লাখ ৬০ হাজার কৃষক পরিবার এর সুফল পাচ্ছে।
এদিকে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। এর মাধ্যমে ভারতের অন্যান্য রাজ্য ও বিভিন্ন দেশের জন্য দারুণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সিকিম। এখানকার সব কৃষি জমি অর্গানিক্যালি সনদপ্রাপ্ত।

ছবি: লেখক
আরও পড়ুন-
বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক

‘২০০ টাকা দিলেই সব মুসিবত সমাধান!’

ট্রাভেল এজেন্সি ছাড়াই অল্প খরচে সিকিম!

/জেএইচ/

x