ঈদের ছুটিতে বেড়ানো ঢাকার কাছেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নগর

ফারুখ আহমেদ ১৭:৩০ , সেপ্টেম্বর ০৯ , ২০১৬

নদী আর স্থাপনার সমন্বয় কলাকোপার মূল বৈশিষ্ট্য। ঢাকার খুব কাছেই দোহারের একটি গ্রাম কলাকোপা, পাশের গ্রাম বান্দুরা। ঢাকা মহানগনর থেকে দেড় ঘন্টার পথ। বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হয়ে কেরানীগঞ্জের উপর দিয়ে কায়কোবাদ সেতু টপকে রাস্তার দুপাশের সবুজ উপভোগ করতে করতে ইতিহাস সমৃদ্ধ এই প্রাচীন নগরে পৌঁছে যাওয়া যায়।

রাধানাথ সাহার বাড়ি

ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশাল এক ভাণ্ডার কলাকোপা-বান্দুরা। উনিশ শতকেও এখানে জমিদারদের বসতি ছিল। প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ গ্রাম কলাকোপা-বান্দুরা একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের তীর্থস্থান ছিল। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখ জুড়ানো, যার প্রাণ ইছামতি নদী। এখানে দেখার অনেক কিছু আছে। একদিকে স্নিগ্ধ অপরূপ প্রকৃতি অন্য দিকে নানা পুরাণ কাহিনী। কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ির পাশে উকিল বাড়ি তারপর জমিদার ব্রজেন সাহার ব্রজ নিকেতন (যা এখন জজ বাড়ি নাম ধারণ করেছে) ব্যবসায়ী রাধানাথ সাহার বাড়ি, শ্রীযুক্ত বাবু লোকনাথ সাহার বাড়ি (যার খ্যাতি মঠবাড়ি বা তেলিবাড়ি নামে) মধুবাবুর পাইন্না বাড়ি, পোদ্দার বাড়ি এবং কালি বাড়ি। ঢাকার খুব কাছে স্থাপত্য সৌন্দর্যে ঘেরা ইতিহাস ঐতিহ্যের কলাকোপা-বান্দুরা। কলাকোপা-বান্দুরার স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছে গ্রীক আর্কিটেকচারের আদলে, ডরিক কলামে। এখানে আরও আছে খেলারাম দাতার বিগ্রহমন্দির, মহামায়া দেবীর মন্দির আর একটু দূরের হাসনাবাদে জপমালা রানীর গির্জা। তাছাড়া সামসাবাদ তাঁত শিল্পসহ আলালপুরের বিখ্যাত হস্তচালিত তাঁতশিল্প তো আছেই। এর বাইরে অনেক পুরানো ভবন ও মঠ চোখে পড়বে কলাকোপা-বান্দুরায়। ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কলাকোপা-বান্দুরা থেকে।

খেলারাম দাতার বিগ্রহ মন্দির

খেলারাম দাতার বিগ্রহ মন্দির

আমরা গিয়েছিলাম শরতের শুরুতে। ভাবছিলাম শরতের কাশ দেখতে বের হব। কেউ একজন জানান দিলো কাশ ফুল এখনো ফোটেনি। তারপরই গুঞ্জন ওঠে  মৈনট ঘাট নিয়ে। মৈনট ঘাট যেতে হবে কলাকোপা-বান্দুরার উপর দিয়ে। সিদ্ধান্ত তখনই নিয়ে ফেলি। মৈনট ঘাট তো যাবই তার আগে চলে যাব কলাকোপা-বান্দুরা। বাবুবাজার পার হয়ে বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতুর ওপর দিয়ে নবাবগঞ্জ যেতে আমাদের সময় লাগে দেড়ঘন্টা। নবাবগঞ্জ চৌরাস্তায় মহাকবি কায়কোবাদ চত্বর থেকে একটি সড়ক সোজা কলাকোপা চলে গেছে। অন্য সড়কটি একটু বামে কলাকোপা হয়ে বান্দুরার পথ ধরেছে। আমরা সোজা পথে কলাকোপা চলে গিয়ে রাধানাথ সাহার বাড়ির কাজে আমাদের বাহন থামাই। কিন্তু একি! রাধানাথ সাহার বাড়িটি নেই, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আদনান প্যালেস! মনটা খুব খারাপ হল। বিষন্ন মনে খবর নিয়ে জানলাম স্থানীয় পোখরাজ নাকি বাড়িটি কিনে নিয়েছেন।

রাধানাথ সাহার বাড়িটি পেছনে ফেলে এবার একটু সামনে যাই। গন্তব্য খেলারাম দাতার বিখ্যাত বিগ্রহ মন্দিরে। মন্দিরের পাশেই বিশাল পুকুর। খেলারামকে নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে অনেক গল্প। খেলারাম দাতার মন্দির দর্শন শেষে আবার মন্দির যোগ, এবার শ্রী শ্রী মহামায়ার মন্দির। মজার ব্যাপার এখানে একটি ঘরে বিশাল গাছের গুঁড়ি রাখা আছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সে গাছের গুঁড়ির পূজা করেন। প্রচলিত আছে গাছটি আনা হয়েছিল ঘর বানানোর জন্য। কিন্তু গাছটি কাটতে গেলে তার শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়লে গাছটি আর কাটা হয়নি! ১৩৩৫ সন থেকে এখানে মন্দির গড়ে তুলে গাছের পূজা-অর্চনা চলছে।

মহামায়া দেবীর মন্দির

তেলিবাড়ি

খেলারাম দাতার বিগ্রহ মন্দির দেখা শেষে ধীর পায়ে আমরা এগিয়ে যাই আনসার ও ভিডিপি ক্যাম্প। এখানে যে বাড়িতে ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের বাস, তা তেলিবাড়ি নামে খ্যাত ছিল, অনেকের কাছে মঠবাড়ি। শোনা কথা, বাড়ির একদা মালিক বাবু লোকনাথ তেল বিক্রি করে ধনী হয়েছিলেন। সে জন্য বাড়িটির এমন নামকরণ। এখানে তিন-চারটি বাড়ি নিয়ে তেলিবাড়ির বিস্তৃতি। যে বাড়িগুলো হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখতো, সেসব বাড়ি এখন দখল হয়ে যাচ্ছে। আমরা ঘুরে ফিরে বারবার দেখি ইছামতির তীরে তেলিদের বিশাল দুটি অসাধারণ মহল। তারপর চলে আসি ইছামতির তীর ধরে একটু সামনের পাইন্নাবাড়ি। এই বাড়ির তিন মালিকের অন্যতম মধুবাবু পান বিক্রি করে ধনী হয়েছিলেন বলেই বাড়িটির পাইন্নাবাড়ি নামকরণ।

পাইন্নাবাড়ি

কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ি

পাইন্না বাড়ি থেকে আমরা আবার আসি আনসার ক্যাম্পে। ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে দেখা পাই একটি ভাঙ্গা মন্দিরের, যার পেছনের বাড়িটির নাম কোকিলপেয়ারী জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়িটির অবস্থা সামনের ভাঙ্গা মন্দিরের মতই ভগ্নদশা। যেন কোনও রকমে দাঁড়িয়ে থেকে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে। তার পাশেই উকিল বাড়িটি অবশ্য ঝকঝকে-তকতকে। উকিল বাড়ির পাশেই কলাকোপার বিখ্যাত জমিদার ব্রজেন সাহার ব্রজ নিকেতন। আশির দশকের পর এক বিচারক পরিবার এখানে বসবাস শুরু করলে ব্রজ নিকেতন জজ বাড়ি নাম ধারণ করে। জজ বাড়ি এখন কলাকোপা-বান্দুরার প্রাণ। এই বাড়িকে ঘিরেই এখানে বাজার গড়ে উঠেছে। প্রচুর দর্শনার্থী আসে প্রতিদিন। রাস্তার এপাশে জজ বাড়ি, অন্যপাশে দোকান, বাজার, চা-আড্ডা। একেবারে জমজমাট পুরো এলাকা। আর জজ বাড়িতে প্রচুর গাছ-গাছালির সঙ্গে রয়েছে অনেকগুলো চিত্রা হরিণ।

জজ বাড়ি

জজ বাড়ি

উকিল বাড়ি

জজ বাড়ি থেকে পথ সোজা চলে গেছে, কিছু দূর গিয়ে পথ বিভাজন। সোজা পথে হাসনাবাদ, বামে কার্ত্তিকপুর। আমরা সোজা পথ ধরলাম। হলিক্রস স্কুলের পাশ ঘেঁষে চলে আসি জপমালা রানীর গির্জায়। এলাকাটির নাম হাসনাবাদ, সেজন্য এলাকাবাসী গির্জাটিকে বলেন হাসনাবাদ গির্জা। ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই গির্জাটি গথিক শিল্পকর্মের অনন্য নিদর্শন। পুরো গির্জাটি হলুদ রং ধারণ করে দাঁড়িয়ে। যার শরীর জুড়ে অপরূপ কারুকাজ। গির্জার ছাদে রয়েছে বিশাল একটি ঘন্টা। পুরো এলাকা গাছ-গাছালিতে ঘেরা। গির্জার সামনেই জপমালারানীর নামাঙ্কিত ফলক তার স্মৃতি ধরে রেখেছে।

জপমালা রানীর গির্জা

জপমালা রানীর গির্জা

এবার ফেরার পালা। ফিরতে ফিরতে এখানকার আলালপুর আর সামসাবাদ তাঁতপল্লী ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানকার হস্তচালিত তাঁত প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবু তাঁতিরা নানান ভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই শিল্পটিকে রক্ষা করার।

সামসাবাদ তাঁতপল্লী

কীভাবে যাবেন

কলাকোপা-বান্দুরায় দিনে গিয়ে দিনেই ফেরা সম্ভব। সে জন্য একেবারে সকালে রওনা হতে হবে। গুলিস্তান, বাবুবাজার, কেরানীগঞ্জ, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি থেকে সরাসরি কলাকোপা-বান্দুরার বাস সার্ভিস রয়েছে। তবে দলবেঁধে মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে দারুণ একটা পিকনিক হয়ে যাবে। আলালপুর তো অবশ্যই যাবেন আর যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট ঘাটের গল্প অন্যদিন!

ছবি: লেখক

/এনএ/

x