ফুডব্যাংক-এ রিভিউয়ের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ

সাদ্দিফ অভি ১০:৩৫ , মে ১৯ , ২০১৭

ফুডব্যাংকের অ্যাডমিন সাবিত হোসেনফুড রিভিউভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপ ফুডব্যাংকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন খাবারের দোকানের পোস্ট এখানে রিভিউ করার কথা বলা হচ্ছে। তবে সুবিধা দেওয়ার নামে এবং পোস্টগুলোতে দেওয়া বিতর্কিত কমেন্টগুলো মুছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে এই ফেসবুক গ্রুপটির অ্যাডমিনদের পক্ষ থেকে রেস্তোরাঁগুলোতে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। রাজধানীর বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও ছোট বড় খাবারের দোকানের মালিকদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ পাওয়ার পর বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানেও এর সত্যতা মিলেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি ক্যাফে ছোট পরিসরে যাত্রা করে কিছুদিন আগে। খাবার খেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এর একজন ক্রেতা তাদের খাবারের ছবিসহ পোস্ট দেন ফুড রিভিউভিত্তিক ফেসবুক গ্রুপ ফুডব্যাংকে। এটি খাবার সংক্রান্ত এটি বিশেষায়িত গ্রুপ যার রিভিউ একসঙ্গে প্রায় লাখ খানেক মানুষের নজরে আসে। তাই ওই ক্রেতার দেওয়া পোস্টটিতেও কয়েক হাজার লাইক পড়ে এবং শেয়ার হয়।

তবে ঘটনাট ঘটে এর কিছুদিন পরেই। বাসাবোর ওই ক্যাফের মালিক অভিযোগ করেন, গত ১৮ এপ্রিল বিকাল ঠিক ৫টার দিকে  সাবিত হোসেন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ফোন পান তিনি। একটি গ্রামীণফোন নম্বর থেকে ফোন করে রেস্টুরেন্টের মালিকের কাছে নিজেকে ফুডব্যাংক গ্রুপের অ্যাডমিন হিসেবে পরিচয় দেন সাবিত হোসেন তাকে বলেন, ‘আপনাদের খাবারের রিভিউতে অনেক লাইক পড়েছে। আপনারা অনেক ব্যবসা করছেন, এখন আমাদের টাকা দিতে হবে।’

সাবিত হোসেনের সঙ্গে চ্যাট
অভিযোগকারী জানান, "সাবিত তার কাছে মাসিক ১৫ হাজার টাকা দাবি করে বলেন, 'টাকা  না দিলে আপনাদের খাবারের প্রশংসার সব পোস্ট মুছে দেওয়া হবে আমাদের গ্রুপ থেকে। তবে টাকা দিলে আপনাদের নামের কোনও বিতর্কিত পোস্ট গ্রুপে এপ্রুভ হবে না। সবসময় মানুষ ভালোটাই জানবে।’’ রেস্টুরেন্টের মালিক বলেন, ‘ তার এ প্রস্তাব শুনে অবাক হয়ে যাই এবং কৌশল হিসেবে সাবিত হোসেনের কাছে শুক্রবার পর্যন্ত সময় চাই।’

এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর মালিকের ছোট ভাই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাবিতের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করেন। সাবিত তখন তার কাছে ফোন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে আলাপ করতে নিষেধ করেন।

এমন আরেকটি অভিযোগ পাওয়া যায় খিলগাঁওর একটি বেকারি অ্যান্ড ক্যাফে থেকে। ওই বেকারির মালিক জানান, ফুডব্যাংক পেজের অ্যাডমিন সাবিত হোসেন ওই বেকারির মালিককেও ফোন দিয়ে একইভাবে মাসে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে তার প্রতিষ্ঠানের সব পজেটিভ রিভিউ ফুডব্যাংক পেজ থেকে মুছে ফেলার হুমকি দেন। ঐ ক্যাফের মালিক টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় সত্যি সত্যি ওই প্রতিষ্ঠানের সব পজেটিভ রিভিউ ফুডব্যাংক পেজ থেকে মুছে ফেলে শুধু নেগেটিভ রিভিউগুলো রেখে দেওয়া হয়।

ট্রু কলবাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের যে নম্বরটি থেকে সাবিত উভয় জায়গায় ফোন করেছিলেন সেটি রিনা হোসেন নামে এক নারীর নামে নিবন্ধিত। ট্রু কলারের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা যায়, নম্বরটি সাবিত জিপি নামে সংরক্ষণ করা রয়েছে। ফোনটির নিবন্ধন তথ্যে বারিধারা ডিওএইচএস এর ঠিকানা দেওয়া।

ফুডব্যাংকের অ্যাডমিন সাবিত হোসেনের চাঁদা দাবির এমন কিছু স্ক্রিন শট কয়েকদিন আগে ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় তিনি কৌশল হিসেবে সম্মানহানির কথা বলে গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। থানায় দায়ের হওয়া ৮৭৬ নম্বর জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে চাঁদা আদায়ের মিথ্যা স্ক্রিনশট প্রকাশ করায় তার সম্মানহানি হয়েছে।

জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তার মায়ের নাম ‘রিনা হোসেন’ এবং ঠিকানা বারিধারা ডিওএইচএস-এর ৪৯২/৬ নম্বর বাসা। আর এতেই অন্যের নামে জিডি করতে গিয়ে নিজেই ফেঁসে যান সাবিত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নাম এবং ঠিকানা চাঁদা দাবি করা নম্বরটির নাম ঠিকানার সঙ্গে হুবহু এক।

এ বিষয়ে জানতে সাবিত হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনটি খোলা থাকলেও কেউ কল রিসিভ করেননি এবং ম্যাসেজ পাঠালেও সেটির উত্তর দেননি।

গুলশান থানায় সাবিত হোসেনের জিডির কপিএদিকে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, শুধু সাবিত হোসেন নন, ফুডব্যাংকের অ্যাডমিনদের বিরুদ্ধে টাকা চাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। তাদের দাবিতে বাধ্য হয়ে কোনও কোনও রেস্তোরাঁ মালিক প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসোহারা দিয়ে আসছেন, আর এটাই তাদের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অভিযোগ আছে, খিলগাঁও এলাকায় গড়ে ওঠা বেশিরভাগই ছোট কিন্তু জনপ্রিয় রেস্তোরাঁর কাছে চাঁদা দাবি করার।

এদিকে, ফুডব্যাংক নামের ফেসবুক গ্রুপটি বিভিন্ন ইভেন্ট করলেও ঠিকমতো রাজস্ব দিচ্ছে কিনা এবার তাও নজরদারিতে আনার দাবি উঠেছে। ভ্যাট নির্ণয় করা অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাপ্লিকেশন ভ্যাট চেকার এর প্রতিষ্ঠাতা জুবায়ের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাদের পক্ষ থেকে কাউন্টার টেরোরিজমের সাইবার ক্রাইম বিভাগ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই মূসক গোয়েন্দা ফুডব্যাংকের বিভিন্ন ইভেন্টে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত করবে।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফুড রিভিউ নামে খ্যাত গ্রুপ ‘ফুডব্যাংক’। এদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। প্রিয়জন অথবা পরিজন নিয়ে বাইরে কোনও রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে এসব গ্রুপে ছবিসহ রিভিউ দেওয়া বর্তমানে একটি ট্রেন্ড। ক্রেতার পজিটিভ রিভিউ অনেক রেস্টুরেন্টের ভাগ্য বদলে দেয় বলে বিশ্বাস গুটিকয়েক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর। তাই রেস্টুরেন্ট মালিকরা দিনের বেশিরভাগ সময় নজর দিয়ে বসে থাকেন এসব গ্রুপের দিকে। সারাদিনে প্রায় কয়েকশ’ পোস্ট আসে খাবার সংক্রান্ত।

/এফএএন/টিএন/

x