খুলনার ‘অরিজিনাল’ চুইঝাল

ফাতেমা আবেদীন ২০:০৭ , আগস্ট ১১ , ২০১৭

কোনও শহরে গেলেই, সেই শহরের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি যে জিনিস আমার আগ্রহে থাকে সেটি হচ্ছে আঞ্চলিক খাবার। জরুরি কাজে হুট করে খুলনা যেতে হলো। এত জরুরি সংকট যে খাবার বা সৌন্দর্য খোঁজার মন মানসিকতাই ছিল না। ফেরার পথে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে শুনলাম বাস দেরি হবে। কিছু খাওয়া দরকার তাই মনে মনে মনে খুঁজলাম এই শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাবারের দোকান। মনে পড়ে গেল আমি চুইঝালের শহরে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায় ফোন, ফুড ব্লগার বন্ধুকে। ‘খুলনায় চুইঝাল দেওয়া মাংস কোথায় পাওয়া যায় রে?’ উত্তর এলো জিরো পয়েন্টে কামরুলের দোকানে।

যাত্রা জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। বেলা ১টা বাজতে চললো। রিকশাওয়ালাকে বললাম যাবেন কামরুলের দোকানে জিরো পয়েন্টে? ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। রিকশাওয়ালা জানালেন পর্দা নেই, এভাবেই যেতে হবে। পেটে ছুঁচো ডন দিচ্ছে কী আর করা রয়েলের মোড় থেকে রওনা হলাম জিরো পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। সঙ্গের সঙ্গীর খাবারে তীব্র অনিহা। আমার সঙ্গে আছেন বলে চোখমুখ বন্ধ করে সহ্য করছেন।

ওরে বাবা জিরো পয়েন্ট শহরের আরেক মাথায়। মেশিন চালিত উড়োজাহাজ রিকশায় যেতেও পাক্কা ২৫ মিনিট। জিরো পয়েন্টে ঢুকে জিজ্ঞাসা করতেই সবাই কামরুলের হোটেল দেখিয়ে দিলো।

হোটেলে ঢোকার মুখে রিকশাওয়ালা বললো, খেয়ে নেন, আমি বসলাম। আবার নিয়ে যাব। আথিতিয়তা বেশ ভালো লাগলো। কোমল পানীয়ের স্টিকারে দোকান ঝকমক করছে। সার দেওয়া টেবিল আর প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা। আমরা যখন ঢুকলাম তখনও দুপুরের খাবারের সময় হয়নি তাই ভীড় একটু কম।

ভাত অর্ডার করতেই জিজ্ঞাসা করলো গরু নাকি খাসি খাবেন। দুজনেই গরু বলে মাথা নাড়লাম। ডাল খাব কিনা জানতে চাইলো, চুই ঝাল থাকতে ডাল কে খায়। ভেতরে উঠানের কোণ ঘেষে বিশাল রান্নাঘর। চার/পাঁচজন লোক বসে বিভিন্ন টেবিলে খাচ্ছে।

ভাত, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দেওয়ার পর চুইঝাল দিয়ে কষা মাংসের বিশাল বোল নিয়ে এলেন দোকানের কর্মচারী। মাংসের সাইজ দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। প্রায় ২০০ গ্রাম ওজনের একেকটা পিস। মন মতো মাংস বেছে নিয়ে খাওয়া শুরু করলাম।

মুখে দিতেই টের পেলাম অরিজিন্যাল চুইঝালের মাহাত্ম্য। ঝাঁজে চোখ বন্ধ হয়ে আসলো। ভাতেরও একটা সুন্দর গন্ধ। আমরা খেতে বসার পরপরই কিলবিল করে লোকজন ঢুকতে লাগলো। পেটপুরে খেয়ে কাউন্টারে বিল দিতে গিয়ে দাম জেনে আরেক দফা অবাক হলাম। মাত্র ৯৫ টাকা প্রতি পিস মাংস!

জিজ্ঞাসা করলাম, ৫০০ টাকা কেজি গরুর মাংসের আমলে ২০০ গ্রাম মাংস ৯৫ টাকা দিয়ে পোষায়? হেসে দিলেন। নিজেরাই গরু জবাই করেন। নিজেদেরই সব তাই ক্ষতি নেই ব্যবসায়।

মালিক-কর্মচারী মিলে মাত্র চার/পাঁচজন লোক।

আহামরি কোনও হোটেল নেই। তাই যারা ফাইভ স্টার রেস্তোরাঁয় খেয়ে অভ্যস্ত তারা সেই পথ মাড়াবেন না। কারণ খুবই সাধারণ গড়-পড়তা মফস্বলের ভাতের হোটেল। তবে স্বাদ অতুলনীয়। খাবার নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার করতে ভালোবাসলে এই স্বাদ আপনার অনেকদিন মনে থাকবে। খুলনা থেকে খেয়ে এসে ঢাকার দোকানগুলোর চুইঝাল পানসে মনে হবে নিশ্চিত। কারণ ১৩০ টাকায় এর চেয়ে দেড়গুণ ছোট মাংসের টুকরা আর বাড়তি আড়ম্বর আপনাকে হতাশই করবে। অরিজিন্যাল স্বাদ আর পাবেন না।

খুলনা শহরে ঘুরতে গেলে কামরুলের চুইঝালে কষা মাংস মিস না করার অনুরোধ থাকলো।

ও হ্যাঁ, খেতে ৩০ মিনিট লেগেছিল। সেই রিকশাওয়ালা বসেই ছিলেন। আবার শহরের এই মাথা থেকে ঐ মাথায় আমাদের পৌঁছে দিয়ে গেলেন।

/এফএএন/     

এফএএন

x