প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ লেখা দেশি তাঁত নিয়ে পথচলা

ইশরাত জাহান ও কনক আদিত্য ১৫:০০ , মে ১৪ , ২০১৮

আমাদের শুরুর গল্পটা অন্যরকম ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয়টি ছিল ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং। মানে আমার চারপাশের সবকিছুই দেখা, ভাবা ও তার চিত্ররূপ দেওয়া। কী দেখবো, কতটুকু দেখবো ও চিত্রে তা কী রূপে দেখাবো, তা আমার ব্যক্তিগত রুচি, মেধা ও পছন্দের ওপর নির্ভর করবে। শিল্পী-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার আসরে কয়কটি বিষয় উঠে আসে। এর মধ্যে একটি হলো- পোশাক কেন আমাদের ক্যানভাস হয়ে উঠতে পারে না? আমরা ভাবছিলাম বিষয়টি নিয়ে।

ইশরাত জাহান ও কনক আদিত্য
আমাদের প্রদর্শনীর জন্য গ্যালারি ততটা জরুরি নয়, এমন ভাবনাও আমাদের মাথায় ছিল। আমরা মানুষকেই আমাদের চিত্রের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে পারি অর্থাৎ চলমান প্রদর্শনী। মানে পোশাককে আমরা আমাদের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করবো। যেহেতু আমার চিত্র নির্জীব দেয়ালে ঝুলবে না, তার বাহক বা তা ধারণ করবে জলজ্যান্ত মানুষ। তাই মানুষকে উপেক্ষা করে আমি শিল্প রচনা করবো না- এই ভাবনাটাই আমাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
আমাদের চিত্র ও মানুষ- মিলেমিশে এক নতুন শিল্পের জন্ম দেবে। এমন ভাবনাই আমাদের দেশালের মতো একটি প্রতিষ্ঠান তৈরির পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম কাজে ২০০৫ সালে ব্যবসায়ের খুঁটিনাটি কিছু না জেনেই কোনও রকম ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ছাড়াই। শুধু লাগামছাড়া, পাগলপারা আবেগকে পুঁজি করে। ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক শিক্ষাকে পোশাক পরিকল্পনায় প্রয়োগ করতে থাকলাম। পোশাকগুলো হয়ে উঠলো এক একটি কম্পোজিশন, পোশাক তৈরির গতানুগতিক সব ধারাকে অতিক্রম করে নতুন মাত্রার নতুন ধারার কিছু। প্রকৃতির খুঁটিনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেখান থেকে রং-ফর্ম নিয়ে পোশাক তৈরি চলতে থাকলো। মাছরাঙার রং, প্রজাপতির ডানার নকশা আর পোকার গায়ের আঁকিবুকিতে মানুষ সেজে উঠতে লাগলো দেশালেরই পোশাক পরে। এ তো গেলো অলঙ্করণের ব্যাপার। কিন্তু যখন কোন কোন ধরনের কাপড় নিয়ে কাজ করবো সেই ব্যাপারটির সম্মুখীন হলাম, তখন চারুকলার অ্যাকাডেমিক শিক্ষা যথেষ্ট ছিল না। এই ঘাটতিটুকু উপলব্ধি করে আমরা ঘুরতে লাগলাম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁতিদের ঘরে ঘরে। মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে গিয়ে আমরা সরাসরি কাঁচামাল সংগ্রহে মনোযোগী হলাম। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁতিদের ঘরে ঘরে চলতে গিয়েই আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হয়ে উঠলো। আমরা প্রকাশ করলাম গবেষণাধর্মী এক সংস্করণ ‘বাংলাদেশের তাঁত শিল্প’। আমাদের প্ররোচনায় আমাদেরই গবেষক বন্ধু শিল্পী শাওন আকন্দ এই বইটি আমাদের উপহার দিয়েছেন, যা কিনা বাংলাদেশের তাঁত গবেষণার ক্ষেত্রে বড় সম্পদ হয়ে থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
নরসিংদী, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা। পাবনা প্রভৃতি অঞ্চলের তাঁতের কাপড় দিয়ে আমরা আনন্দের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিলাম। আমাদের ক্রেতারাও খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন, কিন্তু দেশের পরিবর্তনশীল আবহাওয়া তাঁতের ওপর বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিলম্বিত বর্ষার কারণে তাঁতিরা সময়মতো সুতা রং করে তাঁতে টানা তুলতে পারছিলেন না। ফলে উৎসবের সময় আমরা প্রয়োজন মতো পোশাকের জোগান দিতে অনেকাংশেই ব্যর্থ হই। এছাড়া ২০১৪ সালের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমরা অকল্পনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হই। যে ক্ষতির প্রভাব আজও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আর আছে চোরাই পোশাকে বাজার ছেয়ে যাওয়ার দুঃখ। সাধারণ ক্রেতা বিদেশি চাকচিক্যময় নিম্নমানের পোশাকের ওপর না বুঝে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। তারা বুঝে ওঠার অবকাশই পান না দেশের কাপড়, দেশের তাঁতশিল্প কতটা সমৃদ্ধ। এসব পরিস্থিতির শিকার হয়ে ২০১৫ সাল থেকে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম তাঁতের পাশাপাশি পাওয়ারলুমে বোনা কাপড়ে পোশাক তৈরি করতে। সে বড় কষ্টের।
তবে ক্রেতারা সেই কাপড়ের পোশাকও দেশালের পোশাক বলে বড় আদরের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। আর একটি কথা না বললেই নয়। যদিও দেশাল শুরুর সময় আমরা ব্যবসা বুঝি না। তবু আমরা নিজেদের মতো করেই একটি ছক তৈরি করেছিলাম। যেমন মার্কআপ কমিয়ে যতটা সম্ভব দাম কম রাখা। তাতে আমাদের টার্গেট ক্রেতা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছিলাম। নানাভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় আর খরচ কমিয়ে সেটা এখনও করতে পারছি। তাতে উৎপাদনও বেশি করে করতে হয়। লোকবল বেশি লাগে। কর্মসংস্থানও বেড়ে যায়। অন্তত এক্ষেত্রে আমরা দারুণ সফল। এই সফলতাই আমাদের তৃপ্তি, পথচলার শক্তি।
এখন আমাদের টার্গেট ক্রেতার ব্যাপ্তি বেড়েছে। শিশু থেকে বয়োজেষ্ঠ্য সবাই আমাদের ক্রেতা। নানা বয়সী ক্রেতার মেজাজ বুঝে কাজ করতে হয়। দেশি বিদেশি নকশার সমন্বয় করে স্বকীয় বিন্যাশ করার চ্যালেঞ্জ; সবকিছু নিয়ে কাজ করতে করতে কখনও কখনও হিমশিম খেয়ে যাই। কিন্তু হাল ছাড়ি না। নতুন সৃষ্টির আনন্দে আবারও শুরু করি।
ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা থেকেই আমাদের যোগ দেওয়া ‘দেশিদশ’ নামে নতুন ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে। যেখানে রয়েছে আমাদের অগ্রজ আর অনুজ ফ্যাশন হাউজগুলো। সবার সঙ্গে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতায় আমরা বাড়তে থাকি। আমাদের স্বকীয়তা বাড়তে থাকে। নিজেদের বোঝার ক্ষমতাও বাড়তে থাকে। দশজনে একসঙ্গে চলায় অনেক কিছু সহজ হয়ে ওঠে। সেই চিরন্তন প্রবাদ ‘দশের লাঠি একের বোঝা’র মতোই নির্ভার হয়ে গেলাম।
নির্ভরতা পেলেও আমাদের ব্যবসায়িক সংকট রয়েছে। এখন দেশে কমার্শিয়াল বাড়ি ভাড়া ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে ঢাকায় দোকান নিয়ে ব্যবসা করে টিকে থাকা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকার ফুঁড়ে ঠিকই একসময় আলো আসে। তেমনি করেই এলো অনলাইন বেচাকেনা। সেখানে শামিল হয়ে সেবার আরেক মাত্রা খুঁজে পেলাম। ক্রেতার ঘরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার আনন্দও উপভোগ করছি বেশ। অন্তত বাড়ি ভাড়ার চাপটা তো কমলো। জয়তু ইন্টারনেট।
আমাদের পছন্দের তৈরি করা জিনিসটি ক্রেতাদের সঙ্গে শেয়ার করা আবার ক্রেতাদের পছন্দের জিনিসটি তৈরি করার চেষ্টা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। নিজেদের ও ক্রেতাদের আনন্দের কারণ হয়ে ওঠার জন্য অনেক যত্নের সঙ্গে ভালোবেসে আমরা যে পোশাক তৈরি করি, ক্রেতারাও ভালোবেসে সেই পণ্য গ্রহণ করেন।
লেখক: কর্ণধার, দেশাল

/এনএ/

x