ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক

স্বকৃত নোমান ১২:২৯ , ডিসেম্বর ২৭ , ২০১৭

 

গল্প-উপন্যাসের জন্ম হয় আকাশে নয়, মাটিতে, এই মাটিতেই। উপন্যাস তো সেই রচনা―আমাদের যাপিত জীবনে যা হতে পারত। এভাবেই লেখকের কল্পিত কাহিনি তার অক্ষরে অক্ষরে হয়ে ওঠে জীবনের বাস্তবতার বিবরণ।

খেলারাম খেলে যা’র পরিমার্জিত ইত্যাদি সংস্করণের ভূমিকায় উপন্যাস সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান এই কথাগুলো লিখেছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। গল্প-উপন্যাসের জন্ম যেমন আকাশে হয় না, তেমনি উপন্যাসসম্পর্কে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিও আকাশ থেকে পড়েনি, এই দৃষ্টিভঙ্গি তিনি লব্ধ করেছেন তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা থেকেই। উপন্যাস লিখতে লিখতেই তিনি পেয়েছেন উপন্যাসের এই সংজ্ঞা। তাঁর এই সংজ্ঞা অসাধারণ, কিন্তু নতুন নয়। তাঁর আগেও বহু ঔপন্যাসিক, বহু তাত্ত্বিক, বহু গবেষক, বহু লেখক উপন্যাস সম্পর্কে প্রায় একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। র‌্যালফ ফক্স যেমন বলেছেন,  ‘...উপন্যাস হলো মানুষের জীবনের গদ্য। উপন্যাস হলো মানুষকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার এবং তাকে প্রকাশ করার প্রথম নান্দনিক প্রচেষ্টা।’ ক্রিস্টফার কডওয়েল যেমন বলেছেন, ‘উপন্যাস এবং ঐকতানের জগতে মানুষের ধ্যান-ধারণায় জেগে ওঠে এক পরিবর্তমান ও প্রসারমান বিশ্বের বহু মানুষের বিভিন্ন আবেগের সমৃদ্ধ এবং বিচিত্র

সে যাই হোক, উপন্যাসের সংজ্ঞা নির্ধারণ আমার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য, উপন্যাস সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হকের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে থেকেই তিনি তাঁর উপন্যাসগুলো লিখেছেন কিনা তার সুলুক সন্ধান করা। উপন্যাস লেখকের কল্পিত কাহিনি বটে। সৈয়দ হকের উপন্যাসগুলোও তাঁর কল্পিত কাহিনি। কিন্তু সেই কল্পনা বাস্তবতাসম্ভূত। কাহিনিকে তিনি আকাশ থেকে নামিয়ে আনেননি। তাঁর জীবনের যে বিপুল-বিস্তারী অভিজ্ঞতা, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর যে চিন্তা-ভাবনা, মানুষ ও তাঁর জাতি সম্পর্কে তাঁর যে দৃষ্টিভঙ্গি, এসবের প্রতিফলনই ঘটিয়েছেন তিনি তাঁর উপন্যাসগুলোতে।

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ১৯৫৬ সালে সৈয়দ শামসুল হকের প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ প্রকাশিত হয়। তখন তাঁর বয়স কত?  মাত্র একুশ। সেই শুরু। কবিতা, গল্প, নাটক, গান, অনুবাদ, শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি পরবর্তীকালে লিখেছেন একের পর এক উপন্যাস। তাঁর রচিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে―এক মহিলার ছবি, অনুপম দিন, সীমানা ছাড়িয়ে, খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান, নীল দংশন, স্মৃতিমেধ, মৃগয়ায় কালক্ষেপ, স্তব্ধতার অনুবাদ, এক যুবকের ছায়াপথ, স্বপ্ন সংক্রান্ত, বারো দিনের শিশু, বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল, ত্রাহি, তুমি সেই তরবারী, কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, নির্বাসিতা, মেঘ ও মেশিন, ইহা মানুষ, মহাশূন্যে পরাণ মাষ্টার, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, বালিকার চন্দ্রযান, আয়না বিবির পালা, কালধর্ম, দূরত্ব, না যেয়ো না, অন্য এক আলিঙ্গন, এক মুঠো জন্মভূমি, বুকঝিমভালোবাসা, অচেনা, আলোর জন্য, রাজার সুন্দরী, ময়লা জামায় ফেরেশতারা, নারীরা, গল্প কোলকাতার, নদী কারো নয়, কেরানিও দৌড়ে ছিল, ক্ষুধাবৃত্তান্ত ইত্যাদি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় আটত্রিশ। এর বাইরে আরও থাকতে পারে। ধরা যাক চল্লিশটি। আশি বছর বেঁচেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। প্রথম তিনি ‘পদ’ লিখেছিলেন এগারো-বারো বছর বয়সে। টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কবি তাঁর বাড়ির রান্নাঘরের পাশে সজনে গাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুই লাইনের পদ ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে’ রচনা করেন। এরপর ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরে ব্যক্তিগত খাতায় ২০০টির মতো কবিতা রচনা করেন। তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালের মে মাসে, ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায়, ‘উদয়াস্ত’ নামে একটি গল্প। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লেখালেখিতে সচল ছিলেন তিনি। তার মানে প্রায় ৬৫ বছরের তাঁর লেখক জীবন। অসংখ্য কবিতা, গল্প, নাটক, অনুবাদ, আত্মজীবনী এবং শিশুসাহিত্য রচনার পাশাপাশি পঁয়ষট্টি বছরের লেখকজীবনে চল্লিশটি উপন্যাস লিখতে পারাটা চাট্টিখানি কথা নয়। চল্লিশটি উপন্যাসের মধ্যে সবকটি শিল্পমানসম্পন্ন হয়েছে কিনা, হলে কতটা হয়েছে, ভাষা আঙ্গিকে তিনি নতুনত্ব আনতে পেরেছেন কিনা, নাকি গতানুগতিক ধারায় লিখেছেন―এসব অন্য আলোচনা। বলতে চাচ্ছি, শিল্পের সব কটি শাখায় লেখালেখি করেও তিনি চল্লিশটি উপন্যাস লিখেছেন, এটা আমাদের জন্য, তাঁর উত্তরপ্রজন্মের লেখকদের জন্য বিস্ময় বৈকি।

না, আমি বলব না সৈয়দ হকের সব উপন্যাসই শিল্পমানসম্পন্ন, মহৎ। উপন্যাস বলতে আমরা যা বুঝি, বিশ্বসাহিত্যে যেসব উপন্যাস বড় বড় স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেসবের সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে সৈয়দ হকের সব উপন্যাসকে উচ্চশিল্পমানসম্পন্ন উপন্যাসের তালিকায় রাখা যায় না। কেউ বলতে পারেন উপন্যাস তো উপন্যাসই, তার মধ্যে আবার ভালো-মন্দ কী? না, উপন্যাসেরও ভালো-মন্দ আছে। পৃথিবীর কোনো ঔপন্যাসিকই তার প্রত্যেকটি উপন্যাসকে ম্যাগনাম ওপাস বা মাস্টারপিস করে তুলতে পারেননি। তলস্তয়-দস্তয়ভস্কি থেকে শুরু করে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, মানিক তারাশঙ্কর-বিভূতি―কেউই পারেননি। সৈয়দ হকও পারেননি। এমন একটা প্রশ্ন হতে পারে যে, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, বালিকার চন্দ্রযান, খেলারাম খেলে যা, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণের মতো ঔপন্যাসিক কেন লিখতে গেলেন ময়লা জামায় ফেরেশতারা, বুকঝিমভালোবাসা বা অচেনা’র মতো আরো অনেক উপন্যাস? এর উত্তর এমন হতে পারে যে, তিনি আসলে সারা জীবন একটি উপন্যাসই লিখতে চেয়েছেন। ওই একটি উপন্যাস লেখার জন্য হাত পাকাতে গিয়ে লিখেছেন আরো অনেক উপন্যাস। আসলে যেকোনো প্রকৃত ঔপন্যাসিক সারা জীবন একটি উপন্যাসই লেখেন।

কিন্তু তিনি কি সেই একটি উপন্যাস লিখতে পেরেছেন? স্বাধীন বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে যদি ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হককে বিচার করি, তাহলে আমরা বলতে পারি, তিনি সেই ‘একটি উপন্যাস’ লিখে উঠতে পেরেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে যে কজন ঔপন্যাসিক উপন্যাস-সাহিত্যের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাদের নামগুলোকে যদি একটি সারিতে বদ্ধ করি, তাহলে সৈয়দ শামসুল হককে প্রথম সারিতেই রাখতে হবে। কিছু দুর্বল উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন কয়েকটি শক্তিশালী উপন্যাসও। শেষোক্ত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে―দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, খেলারাম খেলে যা, নিষিদ্ধ লোবান, আয়না বিবির পালা, বালিকার চন্দ্রযান, মহাশূন্যে পরান মাস্টার, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, এক মুঠো জন্মভূমি, কেরানিও দৌড়ে ছিল। সৈয়দ হকের একজন পাঠক হিসেবে এ কটি উপন্যাসকে আমি তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকায় রাখছি। ঔপন্যাসিক সৈয়দ হককে বোঝার জন্য কেউ যদি তাঁর সব কটি উপন্যাস না পড়ে এ নয়টি উপন্যাস পড়ে, তাতেই বোঝা যাবে ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর শিল্পসামর্থ্য।

ঔপন্যাসিক হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক ব্যাপকভাবে আলোচিত হন মূলত খেলারাম খেলে যা’র মধ্য দিয়ে। ১৯৭০ সালে তিনি উপন্যাসটি লেখেন, ঢাকায়। পরিমার্জনা করেন ১৯৭৩ সালে, লন্ডনে এবং ২০১১ সালে ঢাকায়। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় গাজী শাহাবুদ্দিন সম্পাদিত জনপ্রিয় পত্রিকা সচিত্র সন্ধানী’র একটি বিশেষ সংখ্যায়। বই আকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে। সচিত্র সন্ধানীতে উপন্যাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটির বিরুদ্ধে ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগ ওঠে। তথাকথিত সেই অশ্লীলতার কথা চাউড় হয়ে যায় পাঠকমহলে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায় পত্রিকাটির সব কটি কপি। তখন তরুণ-যুবক পাঠকরা উপন্যাসটি পড়েছে প্রকাশ্যে, তরুণী-যুবতীরা পড়েছে লুকিয়ে। বাবা-মায়েরা পত্রিকাটি তালাবদ্ধ করে রাখেন আলমিরাতে। মায়ের আঁচল থেকে চাবি চুরি করে মেয়েরা সেই পত্রিকায় উপন্যাসটি পড়েছে। প্রায় ৪৭ বছর পরেও উপন্যাসটি এখনো পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। এখনো মুদ্রণের পর মুদ্রণ হচ্ছে, অনাগত দিনেও হতে থাকবে। একেই বলে উপন্যাসের জনপ্রিয়তা। এই ক্ষেত্রে সৈয়দ হকও জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক বৈকি!

এই উপন্যাসের জন্য সৈয়দ হক যতটা আলোচিত হয়েছেন তারচেয়ে বেশি হয়েছেন সমালোচিত। সৈয়দ হক তাঁর এই উপন্যাসটিকে ‘এদেশের সবচেয়ে ভুল বোঝা উপন্যাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। উপন্যাসটির পরিমার্জিত ইত্যাদি সংস্করণের ভূমিকায় এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন,

‘এই সেদিন নিউইয়র্কে গিয়েছিলাম সেখানে মুক্তধারার বইমেলায়। মাঝবয়সী বহু মহিলা এসে আমার সঙ্গে আলাপিত হলেন আর ঈষৎ সলজ্জ হয়ে জানালেন তাঁদের কিশোরী বয়সে চুরি করে খেলারাম পড়বার ইতিহাস। এবং তাঁরা প্রায় সবাই বললেন, কই! এখন তো আর তেমন অশ্লীল বলে মনে হয় না খেলারাম-কে! আবার এ রকমও হয়েছে―এখনো―এই যে, মাত্রই কয়েক বছর আগে ঢাকায় ফরাসি দূতাবাসের এক পার্টিতে গেছি―খোলা বাগানে সমাবেশ, কথা বলবার মতো কাউকে না পেয়ে আমি বাগানের এক প্রান্তে একা দাঁড়িয়ে পানীয়ে চুমুক দিয়ে চলেছি, হঠাৎ এক নারীকণ্ঠ! বলছে, এই সরে আয়! ওই লোকটা অসভ্য বই লেখে! আলগোছে তখন পেছন ফিরে দেখি―শুভ্রকেশী সত্তরোর্ধ্ব এক মহিলা তাঁরই বয়সী আরেক মহিলাকে আমার থেকে নিরাপদ দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন ওই কথাটি বলে।’

তার মানে উপন্যাসটির জন্য সৈয়দ হককে অনেক বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে। আসলেই কি খেলারাম খেলে যা অশ্লীল? সত্তরের দশকের বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে ‘অবিকশিত’ বাঙালি পাঠকদের কাছে হয়ত উপন্যাসটি অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিল। এই কালে, অর্থাৎ এই একুশ শতকের পাঠকদের কাছে এটি মোটেই অশ্লীল মনে হবে না। সৈয়দ হক এই উপন্যাসে বাবর আলীর মাধ্যমে যে যৌন পরিস্থিতির নির্মাণ করেছেন তাতে শেষ পর্যন্ত মূলত এক ধরনের অপ্রেম আর বিবমিষারই প্রমাণ পাওয়া যায়। উপন্যাসটির নিবিড় পাঠের পর এর কেন্দ্রীয় চরিত্র বাবর আলীকে কি লম্পট মনে হয়? মোটেই না। বাবর আলী দাঙ্গার শিকার হয়ে এই দেশে আসে। সে তার সহোদরা হাসনুকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। সেই স্মৃতি তার পিছু ছাড়ে না। উপন্যাসের শেষে ধর্ষকদের হাত থেকে জাহেদাকে বাঁচাতে চেয়েছে বাবর। সেখানেই তার প্রকৃত পৌরুষের প্রথম ও শেষ পরিচয় পাওয়া যায়। টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক বাবর আলী খানকে আমরা আপাতদৃষ্টিতে লম্পট হিসেবেই দেখি। সে অবিবাহিত কিন্তু বয়স্ক পুরুষ। কিন্তু খেলারাম খেলে যা কি অল্পবয়সী  মেয়েদের সঙ্গে বাবরের শরীরিক সম্পর্কের ধারাবাহিক কাহিনি? লতিফা, মিসেস নাফিস, বাবলি, জাহেদার মতো নারীর কাছে বাবর আলী খান কেন যায়? কিসের জন্য যায়? শুধু দৈহিক কামনার জন্য যায় না, সেই যাওয়ার পেছনে রয়েছে তার আত্মক্ষরণের সেই ইতিকথা, যা গোটা খেলারাম খেলা যা উপন্যাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে শৈল্পিকভাবে। নারী-শরীরের উত্তাপে নিজেকে শীতল করে করে বেঁচে থাকার সত্যিকারের দহন মিটিয়ে নিতে চায় বাবর। কিন্তু তা সে কতটা পারে? উপন্যাসটির মূল স্রোতটিকে এতটা সার্থকভাবে সৈয়দ হক আড়ালে রেখেছেন যে, অপরিণত অবিকশিত পাঠকের চোখে সেটি ধরা পড়ে না, আড়ালেই থেকে যায়। তাদের কাছে খেলারাম খেলে যা মানে বাবরের যৌন-অভিযান। কিন্তু আসলে তা নয়।

এই উপন্যাসের মূল বক্তব্যটা কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তাফা কামালের একটি প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করা যাক। খেলারাম খেলে যা নিয়ে তিনি যে প্রবন্ধটি লিখেছেন সৈয়দ হক সেটি সংযুক্ত করেছেন খেলারাম খেলে যা’র পরিমার্জিত ইত্যাদি সংস্করণে। আহমাদ মোস্তাফা কামাল বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে উপন্যাসটি সম্পর্কে যে মূল কথাগুলো বলেছেন তা হচ্ছে এই, ‘...বাবর বস্তুত হাসনুকেই উদ্ধার করেছে। কৈশোরে বোনকে রেখে পালিয়ে আসার ফলে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল সীমাহীন গ্লানি, অপরাধবোধ, যন্ত্রণা ও অনুতাপ; এসব ভুলে থাকার জন্য সে বেছে নিয়েছিল প্রতারণা ও লাম্পট্যের পথ, আর নিজের পরস্পরবিরোধী এই দুটো চরিত্র তাকে করে তুলেছিল দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ। কার প্রতি প্রতিশোধ নেবে বাবর তার একটি উত্তর যেন পাওয়া যাচ্ছে এবার। সে আসলে নিজের প্রতিই প্রতিশোধস্পৃহা লালন করে, নিজের সঙ্গেই নিজের নিরন্তর দ্বন্দ্ব তার, নিজের সঙ্গেই যাবতীয় বোঝাপড়া। বেদনাময়, যন্ত্রণাকাতর আর গ্লানিকর সমস্ত ঘটনার জন্য অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই দায়ী করে এসেছে সে বারবার, আর এসব ভুলে থাকার জন্য, জীবনের বর্ণ-গন্ধময় স্বপ্নীল আয়োজনে শরীক হবার জন্য নিজের ভেতরে তৈরি করেছে ভিন্ন আরেকটি চরিত্র―সে মাতাল, লম্পট, কামুক, প্রতারক। বাবর হয়তো পুরোপুরি ‘সুস্থ’ মানুষও নয়। কৈশোর থেকে বয়ে বেড়ানো আত্মপীড়ন, ক্ষরণ, দ্বন্দ্ব ও দহন তাকে পরিণত করেছে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এক অসহায়-ভাসমান-বীতশ্রদ্ধ মানুষে। এবার আপনিই বলুন পাঠক, উপন্যাসটিকে কি আর স্রেফ একজন কমোত্তেজনায় উন্মাদ লোকের অদ্ভুত কীর্তিকলাপের রসালো বর্ণনা―বা পর্নোগ্রাফি―বলে ভাবার কোনো অবকাশ থাকে?”

না, থাকে না। খেলারাম খেলে যা’র একজন পাঠক হিসেবে আমি অগ্রজ আহমাদ মোস্তাফা কামালের অভিমতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। বাবর সত্যিকারার্থেই বাংলা সাহিত্যের এক আশ্চর্য জীবন্ত চরিত্র, সবচেয়ে আধুনিক ও প্রগতিশীল, দার্শনিক ও দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ ট্রাজিক এক চরিত্র। খেলারাম খেলে যা বাংলা সাহিত্যের অসামান্য এক আধুনিক উপন্যাসের নাম। অথচ এই আধুনিক উপন্যাসটিকে সৈয়দ শামসুল হক তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন! তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে, বিদ্যাপ্রকাশ থেকে। সেখানে খেলারাম খেলে যা ছিল। কিন্তু উনিশ বছর পর, ২০০৯ সালে অনন্যা থেকে তাঁর যে শ্রেষ্ঠ উপন্যাস প্রকাশিত হয় সেটিতে খেলারাম খেলে যা নেই। কেন নেই? কেন তিনি শ্রেষ্ঠ তালিকা থেকে উপন্যাসটিকে বাদ দিলেন? উপন্যাসটি অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত সেজন্যে? উপন্যাস হিসেবে পরবর্তীকালে এটি তাঁর কাছে দুর্বল মনে হয়েছে, সেজন্যে?  আমরা ঠিক জানি না। সৈয়দ শামসুল হক বেঁচে নেই। থাকলে এই প্রশ্ন তাকে করা যেত। কে জানে, হয়ত এমনও হতে পারে, এই উপন্যাসকে তিনি একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র জায়গায় রাখবার মনস্থির করেছেন। অর্থাৎ এটি আলাদা গ্রন্থ হিসেবে থাকবে, সমগ্রেও যেতে পারে, কিন্তু অন্য কোনো সংকলনে থাকবে না। যদি এমনটা হয়, তাহলে বলা যায়, উপন্যাসটিকে লেখক নিজেও গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন।

সৈয়দ শামসুল হক তাঁর লেখালেখিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গভীরভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন। ১৯৭৫ পরবর্তীকালে ইতিহাস-বিকৃতির যে বিধ্বংসী স্রোত প্রবাহিত হতে শুরু করে, সৈয়দ হক সেই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আবহমান বাঙালির ইতিহাসের উৎসমূল-লগ্ন করে দিয়েছেন। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের মধ্য দিয়ে যে মহৎ চেতনা ১৯৭১ সালে বাঙালির রক্তশিরায় প্রবাহিত হয়েছিল এবং যা  ’৭৫-এর ১৫ আগস্টে চুরমার করে দেওয়া হয়েছিল, সেই চেতনার প্রতিবাদী শিল্পী সৈয়দ শামসুল হক। তিনি সেই চেতনায় পুনর্নির্মাণকারী। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অধিকাংশ উপন্যাস তিনি লিখেছেন ’৭৫-এর পরে। তাঁর নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসটি প্রথমে ছাপা হয় সামরিক সরকারের আমলে সাপ্তাহিক বিচিত্রায়। তখন শহীদের রক্তেভেজা মাটিতে পাকিস্তানপন্থি রাজনীতি শুরু হয়েছে, পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান উঠছে, ডান-বাম এক হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কুৎসা রটাচ্ছে। তেমনি একটি সময়ে সৈয়দ শামসুল হক নিষিদ্ধ লোবান ও নীল দংশন উপন্যাস লিখে বাঙালি জাতির সামনে তুলে ধরলেন পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর পৈশাচিকতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তিনি বাঙালির ঐতিহ্যের ধারাবাহিক একটি মহোত্তম পরিণতি বলে চিহ্নিত করেছেন তাঁর বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ উপন্যাসে। এ উপন্যাসের চরিত্র এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জবানিতে তিনি বলেছেন, কুতুব উদ্দিন আগ্রাসন করেছিলেন রাজা ধনদেবের রাজ্য, যুদ্ধ করে যে ভূমি তিনি অধিকার করেছিলেন সে ভূমি তার নিজের ছিল না। তার উত্তর পুরুষ আমি কিন্তু অধিকার করতে চাইছি আমারই জন্মের অধিকার, আমি যুদ্ধ করছি আমার জন্মভূমি মুক্ত করতে। কারণ এই ভূমিতে আমার জন্মনাড়ি পোঁতা। এর ইতিহাস ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ সব আমার, বিশ্বে আমার ঠিকানা আছে এখানে। আমার পূর্বপুরুষ কুতুব উদ্দিন ধর্ম আর রাজনীতি এক করে দেখেছেন, ধর্মকে ব্যবহার করেছেন যুদ্ধের কারণ সৃষ্টি করতে, আর আমি তার উত্তমপুরুষ রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা রাখার জন্য আজ করছি যুদ্ধ। কী অসাধারণ বক্তব্যই না তুলে ধরেছেন সৈয়দ হক তাঁর বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ উপন্যাসে।

বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, নীল দংশন, নিষিদ্ধ লোবান-এর পর সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি উপন্যাস হচ্ছে দ্বিতীয় দিনের কাহিনী। এটি তিনি লেখেন ১৯৭৪ সালে, লন্ডনে। বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বাঙালি জীবনের বিপ্লবাত্মক রূপান্তর সৈয়দ শামসুল হকের মধ্যেও নবচেতনার সঞ্চার করে। বাঙালির রাষ্ট্রসত্তা অর্জন সামগ্রিকভাবে কতটা ইতিবাচক ছিল, সেই প্রশ্ন অনেকের মতো তাকেও আলোড়িত করেছে প্রবলভাবে। স্বাধীন ভূখণ্ড, মানচিত্র, স্বতন্ত্র পতাকা আর বহিঃশত্রু বিতাড়নই যে যথেষ্ট ছিল না, তা সৈয়দ হক অনুভব করেছেন গভীরভাবে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অনেক লেখায় জাতীয় জীবনের এই গভীরতর সংকটের প্রতিফলন ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চমৎকারভাবে চিহ্নিত করেছেন তিনি দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে। বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার কথা পরম মমতায় তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটির পটভূমি সৈয়দ হকের সেই জলেশ্বরী। মানে কুড়িগ্রাম। জলেশ্বরী যে সৈয়দ হকের জন্মভূমি কুড়িগ্রাম, তা আমরা তাঁর লেখাপত্র পড়েই বুঝতে পারি। উপন্যাসটির মূল চরিত্র একজন প্রধান শিক্ষক, তাহের উদ্দীন খন্দকার। তাহেরের আত্মোপলব্ধি, অন্বেষণ ও স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে এই উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধে জলেশ্বরীর ভূমিকার কথা। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা জলেশ্বরীর সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে তাহের মাস্টারের স্মৃতিচারণায়। তাহেরের অভিজ্ঞতাসূত্রে ঔপন্যাসিকের স্মৃতিদংশন, নব-অভিজ্ঞতা ও আত্মোপলব্ধি এক অনিঃশেষ ও গূঢ়সঞ্চারী তাৎপর্যে শিল্পরূপ লাভ করেছে উপন্যাসটিতে।

দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে জলেশ্বরীকে আসলে তিনি বাংলাদেশের প্রতীক করে তুলেছেন। মুক্তিযুদ্ধে জলেশ্বরীর গৌরবময় অবদানের কথা বিবেচনা করে তাহেরউদ্দিন সুদূর ঢাকা থেকে জলেশ্বরীতে আসেন। তিনি জলেশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। তিনি জলেশ্বরীতে পা রেখেই জানতে পারেন, লেখাপড়ার চেয়ে অন্যপ্রকার শক্তি অর্জনই জীবনের পরাকাষ্ঠা বলে বিবেচিত হচ্ছে এখানে। সেই শক্তি হয় আগ্নেয়াস্ত্রের অথবা অর্থের। কতিপয় তরুণ আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে প্রশাসনের বিকল্প শাসন চালাচ্ছে। তারা মনে করছে মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলমান। এই তরুণদলের নেতা ক্যাপ্টেন মজহার। আরেক দলের নেতা স্থানীয় এমপি হাফেজ মোক্তার। চোরাচালানসহ নানা উপায়ে সম্পদ সংগ্রহ করায় ব্যস্ত হাফেজ মোক্তারের বাহিনী। হাফেজ মোক্তার স্বয়ং স্বাধীনতার মূল্যবোধবিরোধী এ অপকর্মের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি। জলেশ্বরীর গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ক্যাপ্টেন মজহারের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মধারায় সুস্পষ্ট হতে থাকে যে, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পরও মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। বিশাল গোরস্তানে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া জলেশ্বরীতে ক্যাপ্টেন মজহারের পদচারণা থেকে শিক্ষক তাহেরউদ্দিন উপলব্ধি করেন, ‘সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই দেশ থেকে এক লহমায় অশুভ শক্তিসমূহ অন্তর্হিত হয়নি; এখনও অস্ত্র ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সম্ভবত আগের চেয়ে, মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ের চেয়ে, এখনই প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি রয়েছে।’ কিন্তু চাকরি, স্ত্রীসঙ্গ ও বৈষয়িক স্বার্থচিন্তা পেছনে ফেলে ক্যাপ্টেন মজহারের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বিপন্ন হয়ে পড়ে সামাজিক অপশক্তিগুলোর সংঘবদ্ধ আঘাতে। হাফেজ মোক্তারের দলের হাতে ক্যাপ্টেন মজহারের নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে তার স্ত্রী উচ্চারণ করে, ‘বাহ্, এই তবে স্বাধীনতা, এরই জন্য স্বাধীনতা?’ মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত ঘটনা ও প্রতিক্রিয়ার রূপায়ণে সৈয়দ শামসুল হকের জীবনবোধের সদর্থকতা এ উপন্যাসকে ব্যাপ্ত সমগ্র ও দূরসঞ্চারী চেতনায় উদ্ভাসিত করেছে।

স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের উপন্যাস-সাহিত্যে যে কটি উপন্যাসকে আমরা ‘স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী তার মধ্যে একটি। এই উপন্যাস পড়া না হলে বাংলা উপন্যাসের পাঠ খণ্ডিত থেকে যাবে বলে আমার মনে হয়। এই উপন্যাস সর্বোচ্চ রাজনৈতিক চেতনা, সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের জায়গা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লিখেছেন তিনি। তাঁর অন্য কোনো উপন্যাস, যেমন বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ, খেলারাম খেলে যা, বালিকার চন্দ্রযান, মহাশূন্যে পরান মাস্টার―পড়ে যদি কেউ মুগ্ধ না-ও হন, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী পড়ে নিশ্চিতভাবেই অগ্রসর পাঠক মুগ্ধ হবেন। আঙ্গিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহগন্ধী এবং ভাষায় কাব্যগন্ধী এক দুর্দান্ত সৃষ্টি তিনি রেখে গেলেন আমাদের জন্য।

পরিশেষে, ঔপন্যাসিক হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক তুমুল জনপ্রিয় হতে চাননি, আবার খুব বেশি সিরিয়াসও হতে চাননি। একটা নিজস্বতা বজায় রেখে তিনি তাঁর উপন্যাসগুলো রচনা করেছেন। বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে সৈয়দ হকের নাম সহজে মুছে যাবার নয়। অনাগত দিনেও যে তাঁর উপন্যাস বিপুলভাবে পঠিত হবে, তার ইশারা এখনই পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের তাঁর কাছে যেতেই হবে। কারণ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম অমোচনীয় কালিতে লেখা।

 

 

 

 

//জেডএস//

x